Advertisement
E-Paper

ভরসা ছিল শুধুই বিপ্লবে! ভোটে বিশ্বাস ছিল না, নিজে নির্বাচনে যোগ দিয়েই ‘প্রথম’ ভোট দিই

এক ভোট নিয়ে আসে আরও বহু ভোটের স্মৃতি। সে সব সময়, সে সময়ের রাজনীতি কেমন ছিল? পুরনো সে সব ভোটের কথা ফিরে এল তারকার কলমে।

কবীর সুমন

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৯
ভোটের স্মৃতি নিয়ে কবীর সুমন।

ভোটের স্মৃতি নিয়ে কবীর সুমন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কটক থেকে কলকাতায় আসার পরে ভোট নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে। কিন্তু সে সব স্মৃতিতে আজ মরচে ধরেছে। ভোটের স্মৃতি বলতে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে সে সময়ের কিছু স্লোগানের কথা।

‘ভোট দেবেন কিসে, কাস্তে ধানের শিসে’— সিপিআইয়ের স্লোগান ছিল। এই স্লোগানগুলো খুব আকর্ষণ করত। পাড়ার বড়রা এই স্লোগান বলতে বলতে যেতেন। আমরা ছোটরা তাঁদের পিছু নিতাম আর সেই স্লোগান তুলতাম। তখন এক মেশোমশাই-স্থানীয় ব্যক্তি বলেছিলেন, “একদম ওদের এই স্লোগান তোরা দিবি না। ওরা ভগবানে বিশ্বাস করে না।”

প্রথম ভোট কবে দিয়েছিলাম, বিধানসভা না কি লোকসভা নির্বাচন— সে সব আজ কিছুই মনে নেই। মনে আছে, আমি তখন বৈষ্ণবঘাটা লেনের বাড়িতে থাকতাম। প্রথম ভোট দিতে গিয়ে অপ্রীতিকর এক পরিস্থিতি দেখেছিলাম। প্রবল চেঁচামেচি, হই-হুল্লোড়। আমার আঙুলে ভোটের কালিও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভোটিং বুথ পর্যন্ত আর পৌঁছোতে পারছিলাম না। এত ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল যে, আমি সেখান থেকে ‘ধ্যাত্‌তেরিকা’ বলে চলে এসেছিলাম।

Advertisement

রাজনীতি নিয়ে কিন্তু আমার বাড়িতে প্রায়ই নানা আলোচনা হত। বাবা-মায়ের মধ্যে প্রবল বাগ্‌বিতণ্ডা হত। এক বার আমার মা-বাবা ও দাদা ভোট দিতে গিয়েছিলেন। মনে আছে, আমি দাদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “কোথায় যাচ্ছিস রে?” ও তখন বলেছিল, “হাত রুখতে।” হাত অর্থাৎ কংগ্রেসকে রুখতে। কংগ্রেসের প্রতীক হাত, তাই দাদা সেই দিন মজা করে এটাই বলেছিল। নিশ্চয়ই ও সিপিএম সমর্থক ছিল। তাই এমন মন্তব্য করেছিল। তবে আমার বাবা প্রবল কংগ্রেস সমর্থক ছিলেন। জওহরলাল নেহরুকে পছন্দ করতেন বাবা। আমার মা কিন্তু কট্টর সিপিআইএম সমর্থক ছিলেন। বাবা প্রবল বিরোধিতা করতেন। এই নিয়েই চলত বাগ্‌যুদ্ধ। মা-বাবা দু’জনেই কর্মরত ছিলেন। বাবার বিরোধিতা করতে গিয়ে মা তখন বলতেন, “তুমি একটা কংগ্রেসি আমলা।’’ বাবাও উত্তর দিতেন। তবে কে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে কোনও ঝগড়াঝাঁটি ছিল না। রাজনৈতিক মতবিরোধ, ঝগড়াঝাঁটি হত ঠিকই। কিন্তু তার মধ্যে পারিবারিক ছোঁয়া ছিল।

রাজনীতির মঞ্চে!

রাজনীতির মঞ্চে! ছবি: সংগৃহীত।

আমি কিন্তু কোনও পক্ষ নিতাম না ওঁদের এই বাগ্‌বিতণ্ডায়। ওঁদের দেখে শুধু হাসতাম। আসলে ভোট বিষয়টায় আমার কোনও বিশ্বাসই ছিল না। মনে হত, ভোট দিয়ে কোনও দিন কোনও ফয়সালা হবে না। আমার মধ্যে কিন্তু একটা নকশাল ভাব ছিল! একটাই কথা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, “ভোট দিয়ে কিচ্ছু হবে না। বিপ্লব দরকার। অভ্যুত্থান দরকার। গণঅভ্যুত্থানের উপর ভরসা তৈরি হয়েছিল।”

পরবর্তী কালে সেই ভাবনা বদলেছে। অস্বীকার করব না, আমি নিজে প্রথমে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার পরেই ভোট দেওয়াকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলাম। বলা ভাল, তখনই আমার প্রথম ভোট দেওয়া। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছিলাম। তার আগে মনে হত, ভোট বয়কট করা উচিত। ছাত্রজীবনে নকশালপন্থী মনোভাব ছিল, সেই দিকে কিছুটা এগোনোর কথাও মাথায় আসে। তবে শেষপর্যন্ত কোনও দলে যোগ দিইনি। কোনও প্রচারেও অংশ নিইনি।

ভোট নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন।

ভোট নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন। ছবি: সংগৃহীত।

তবে আজ ভোটের স্মৃতি বলতে তেমন কিছুই মনে পড়ে না। একটা ঘটনা না বললেই নয়! আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। আমরা দুই কামরার এক ছোট বাসায় থাকতাম। এক বার তিনি ‘পোলিং অফিসার’ হওয়ার সুযোগ পান। গাড়িতে করে অনেকগুলি ব্যালট বাক্স পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেই ব্যালট বাক্স থেকে অদ্ভুত এক গদের আঠার গন্ধ বেরোচ্ছিল। সেই গন্ধ আজও নাকে ভাসে। তবে তা নিয়ে আলাদা কোনও উচ্ছ্বাস আমাদের মধ্যে ছিল না।

আসলে বাবা খুবই চুপচাপ থাকতেন। মুখে হাসি লেগে থাকত। একবার বাবা ভোট দিতে গিয়েছেন। অনেক ক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরে বাবা দু-’তিনটে ব্যালট পেপার নিয়ে তার উপর নিমেষে স্ট্যাম্প মেরে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন রে-রে করে উঠে বলেছিলেন, “আরে দাদা, এ কী করলেন! আপনার ভোটটা তো নষ্ট হয়ে গেল।” বাবা তখন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আমি ইচ্ছে করেই ভোটটা নষ্ট করলাম।” ঠিক কী কারণে বাবা এমন করেছিলেন তা যদিও আমার আজও জানা নেই।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

Kabir Suman Assembly Election
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy