পঞ্চমদার গান শুনতাম শৈশব থেকেই। মনে আছে ‘তিসরি মনজ়িল’ নামে একটি ছবিতে ওঁর সুরে গান ছিল। আমি গানগুলো শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই ক্রমশ মানুষটার ভক্ত হয়ে গেলাম। রাহুল দেব বর্মন ও শচীন দেব বর্মন— দু’জনের গানেরই একনিষ্ঠ শ্রোতা ছিলাম আমি।
রাহুল দেব বর্মনের গান মানেই নতুন কিছু। পঞ্চমদার সঙ্গে প্রথম আলাপের ঘটনার কথা বলতেই হয়। সেই স্মৃতি আজও অমলিন। তখন আমি মুম্বইয়ের হোটেলে গান গাইতাম। সেখান থেকে যে পারিশ্রমিক পেতাম, তা দিয়ে গান রেকর্ড করতাম। পঞ্চমদার গানও ‘কভার’ করেছিলাম। সেই রেকর্ড নিয়ে স্টুডিয়োপাড়ায় ঘুরতাম। সমস্ত স্টুডিয়োয় গিয়ে নিজের গানের রেকর্ড দিয়ে আসতাম। এই ভাবেই এক দিন পঞ্চমদার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ওঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি। বুঝেছিলেন, আমি বাঙালি। তাই বাংলাতেই বলেছিলেন, ‘বসো বসো। রেকর্ডিং দ্যাখো বসে।’
সেই প্রথম আলাপ। এর পর থেকে ওঁর কোনও গানের রেকর্ডিং হলেই আমি স্টুডিয়োয় চলে যেতাম। বেঞ্চে বসে ওঁর রেকর্ডিং-এর অভিজ্ঞতা চাক্ষুষ করতাম। স্টুডিয়োর মধ্যে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের কাজও দেখতাম। পঞ্চমদা আমাকে উৎসাহ দিতেন। দেখে দেখে শিখতে বলতেন। স্টুডিয়োয় রেকর্ডিংয়ের সময়ে শিল্পীদের মধ্যে অনেক সময়ে জড়তা থাকে। সেই জড়তা যাতে আমার মধ্যে না থাকে, পঞ্চমদা হয়তো সেই জন্যই রেকর্ডিং-এর সময়ে থাকতে বলতেন।
আরও পড়ুন:
এই ভাবেই প্রথমে আমাকে একটি হিন্দি গানে সুযোগ দিয়েছিলেন পঞ্চমদা। জিতেন্দ্রের ছবির সেই গানের দুই-তিনটি পংক্তি গাইতে হয়েছিল আমাকে। পঞ্চমদার সুরের পরিধি বলতে গেলে তা শেষ করা যায় না। গানগুলো জনপ্রিয় তো হতই। সেই সঙ্গে গানের মধ্যে যন্ত্রসঙ্গীতের অংশগুলিও সাড়া ফেলত। তাল ও ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা করতে ভালবাসতেন। আসলে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে হইহই করে একজোটে গান বাঁধতেন পঞ্চমদা। এক দিকে খাওয়াদাওয়া, অন্য দিকে গান বাঁধা— দুটোই চলত।
বাঙালির প্রতি ওঁর ভালবাসা ছিল অগাধ। আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে খুব আনন্দ পেতেন। তা ছাড়া বাঙালি খাবারও খুব পছন্দ করতেন। মানুষ হিসাবে মনখোলা মানুষ ছিলেন। সব সময়ে হাসিখুশি থাকতেন। আশপাশের মানুষকে খাওয়াতেও খুব ভালবাসতেন। নিজে রেঁধে খাওয়াতেন। ওঁর রান্না করা মটনের স্বাদ আজও আমার মুখে লেগে আছে। যে মানুষ আদর করে অন্যদের খাওয়ান, তাঁর মন কেমন, তা তো বোঝাই যায়। পঞ্চমদাও ছিলেন তেমনই। আমি যখনই যেতাম, আগলে নিতেন। হৃদ্যতা ছিল আমার সঙ্গে। শুধু আমি না। সকলকেই আপ্যায়ন করতেন। এই জন্যই তিনি সকলের চেয়ে আলাদা।
প্রত্যেক শিল্পীর কণ্ঠের ধরন বুঝে তিনি গান গাওয়াতেন। তিনি বুঝতেন কার কণ্ঠে কোন গান ভাল লাগবে। বলা ভাল, আজকের যুগের সঙ্গীত পরিচালকেরাও পঞ্চমদার পদ্ধতি অনুসরণ করেই সঙ্গীতশিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ান। ‘১৯৪২: আ লভ স্টোরি’-তে ওঁর সুরে গেয়েছিলাম।
‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লগা’ গানটি বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিল। গানের রেকর্ডিং-এর সময়ে পঞ্চমদা বলেছিলেন, “গানের একাধিক জায়গায় ‘জ্যায়সে’ শব্দটি রয়েছে। প্রত্যেকটি ‘জ্যায়সে’ ভিন্ন কায়দায় গাইবি।” সেই পরামর্শ মেনেই আমি গানটি গেয়েছিলাম। আজও সমস্ত অনুষ্ঠানে সেই গান গাইতে হয়। প্রতিটা অনুষ্ঠানেই ওঁকে স্মরণ করি ওই গানের মাধ্যমে। শ্রদ্ধা জানাই।
একটাই আক্ষেপ ‘১৯৪২: আ লভ স্টোরি’র গান কতটা জনপ্রিয় হয়েছিল, তা তিনি দেখে যেতে পারলেন না। পঞ্চমদা বেঁচে থাকলে, সঙ্গীতজগতের আরও কিছুটা অগ্রগতি হত। ওঁর এই ইন্ডাস্ট্রিকে আরও গান উপহার দেওয়ার ছিল। আজ পঞ্চমদার জন্মদিন। আজ ওঁর সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই আলিঙ্গন করতাম আর তার পরে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম। জন্মদিনের কেকও খাইয়ে দিতাম।
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)