Advertisement
E-Paper

‘আয়োজকদের বলতেন আমাকে নিতে, ওঁর গানের আগে আমি গাইলে নাকি মান্নাদার মেজাজ ভাল থাকবে’

১ মে মান্না দে-র জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে প্রয়াত গায়কের স্মৃতিতে কলম ধরলেন শিল্পী হৈমন্তী শুক্ল।

হৈমন্তী শুক্ল

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৯:০২
সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে-এর স্মৃতিতে ডুব দিলেন হৈমন্তী শুক্ল।

সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে-এর স্মৃতিতে ডুব দিলেন হৈমন্তী শুক্ল। ছবি: সংগৃহীত।

১ মে তো মান্নাদার জন্মদিন। কতগুলো বছর হয়ে গেল চলে গিয়েছেন মান্নাদা। আমার সঙ্গে ওঁর প্রথম আলাপ হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। তার আগে দেখা হয়েছিল অনেক বার। কিন্তু ভাল ভাবে আলাপ ছিল না। পুলকদা (বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রথম আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। সালকিয়ায় পুলকদার বাড়ির সামনে একটা অনুষ্ঠান ছিল। সেখানেই গান গেয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে যখন আমি গাইছি, তখনই এসে উপস্থিত হন। তখন ভয়ই পেয়েছিলাম। মান্নাদাকে দেখে গান বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তার পর সেই ভয় কাটান দাদা নিজেই। সেই মান্নাদার সঙ্গে আমার প্রথম কথা। তার পর তো কত কত স্মৃতি। একসঙ্গে কাজ।

আমার তো অনেক দিনের বাসনা ছিল মান্নাদার সঙ্গে গান গাওয়ার। পুলকদাই প্রথম আমার ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন দাদাকে। সেই সময় তো পুজোর গান মানে বিশাল বড় ব্যাপার। সেখানে মান্নাদার সঙ্গে নাকি আমি পুজোর গান রেকর্ড করব। এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। সেই সূত্রেই প্রথম মান্নাদার কলকাতার বাড়িতে যাওয়া।

শুধু গান নয়, কথা বলতেও ভালবাসতেন মান্না দে।

শুধু গান নয়, কথা বলতেও ভালবাসতেন মান্না দে। ছবি: সংগৃহীত।

ভীষণ আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। সেই বছরেই পুজোর সময়ে মান্নাদার সুরে চারটে গান রেকর্ড করেছিলাম। তার মধ্যে একটা তো খুব জনপ্রিয় হয়েছিল— ‘আমার বলার কিছু ছিল না’। তার পর থেকেই মান্নাদার সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল আমার। দাদা কলকাতায় এলেই আমি তাঁর বাড়ি চলে যেতাম।

কত কী যে শিখেছি। খুব বকুনি দিতেন মাঝে মাঝেই। বলতেন, কেন আমরা হিন্দি বলতে পারি না? কেন হিন্দি শিখি না? মান্নাদাকে দেখলে আসলে অনেকেই রাগী ভাবতেন। কিন্তু মানুষটা ছিলেন একেবারে ছেলেমানুষ। ভীষণ গল্প করতে ভালবাসতেন। কত বার হয়েছে সকালবেলা গান শিখতে গিয়েছি আমরা দাদার বাড়িতে। তার পরে তিনি এমন গল্প জুড়েছেন বেলা গড়িয়ে দুপুর আড়াইটে বেজে গিয়েছে, তাঁর খেয়ালই নেই। মান্নাদা কথা বলতেন আর আমরা শুনতাম। বৌদিও খুব ভালমানুষ ছিলেন। শিক্ষিত, মার্জিত মানুষ। সে সব কাছের মানুষেরাও হারিয়ে গিয়েছেন। সময়গুলোও চলে গিয়েছে।

প্রচুর অনুষ্ঠানে গান গাইবার সুযোগ করে দিয়েছেন মান্নাদা। অনেকেই তো আসতেন দাদার কাছে অনুষ্ঠান করার আবদার নিয়ে। তখনই তিনি আয়োজকদের কাছে জানতে চাইতেন আর কাকে নিচ্ছেন তাঁরা। সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতেন হৈমন্তীকে নাও। বলতেন, “আমার আগে হৈমন্তী গান গাইলে আমার মেজাজ ভাল থাকবে। গলাও খুলবে।” কী করে ভুলি ওই দিনগুলো! ওইরকম মানুষও আমি দেখিনি। কোনও দিন মেয়েদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন না।

গানের রেওয়াজের মুহূর্তে সঙ্গীতশিল্পী।

গানের রেওয়াজের মুহূর্তে সঙ্গীতশিল্পী। ছবি: সংগৃহীত।

অভিভাবকের মতো ছিলেন। মান্নাদার সঙ্গে গেলে তিনি সবকিছুর খেয়াল রাখতেন। সবাই ঠিক মতো খেয়েছেন কি না, কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না— সবকিছু থাকত দাদার নজরে।

মান্নাদার মুম্বইয়ের বাড়িতেও গিয়েছি বেশ কয়েক বার। বৌদি রান্না করে খাইয়েছিলেন। খুব ঝাল ছিল মাংস। খুব যে ভাল লেগেছিল তা নয়, কিন্তু কিচ্ছুটি বলিনি। আদর করে, এত যত্ন করলে কি আর কিছু বলা যায়!

এক বার খুব অভিমান হয়েছিল আমার। আসলে আমি তো খুব মান্নাদার বাড়িতে যেতাম। দাদার এক আত্মীয় বলেছিলেন, “ছিনেজোঁকের মতো বসে থাকে হৈমন্তী।” এ কথাটা আমার কানে খুব লেগেছিল। দাদাকে বলেছিলাম। এ কথা শুনে খুব রাগ করেছিলেন। এই ঘটনার অনেক দিন পরে মান্নাদা আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, এই কথা আমার কানে কী ভাবে গিয়েছিল? দাদারও খুব খারাপ লেগেছিল। ছেলেমানুষের মতো করছিলেন। শেষে বৌদি, মান্নাদাকে বোঝান। আসলে মানুষটা তো খুব সরল মনের ছিলেন।

বাংলা গানকে চেনা গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল গায়কের।

বাংলা গানকে চেনা গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল গায়কের। ছবি: সংগৃহীত।

বাংলা গানকে চেনা গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল মান্নাদার। একটাই আফসোস রয়ে গিয়েছে আমার। শেষ দেখাটা করতে পারিনি দাদার সঙ্গে। ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর মান্নাদা চলে গেলেন। তার ঠিক ১০-১২ দিন আগেই বেঙ্গালুরু গিয়েছিলাম আমি। দুর্গাপুজো ছিল তখন। আমার গানের অনুষ্ঠান ছিল। মান্নাদাকে ফোন করে বলেছিলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, বাড়ির ঠিকানাটা বলুন। মান্নাদা উত্তরে বলেছিলেন, “আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। মেয়েরা তো আমাকে তালা দিয়ে অফিসে চলে যায়।” খুব কষ্ট হয়েছিল এই কথাটা শুনে। মনখারাপ হয়েছিল। তার কিছু দিন বাদেই দাদার চলে যাওয়ার খবর পাই। এই আফসোসটা সারা জীবন রয়ে যাবে আমার।

Singer Tollywood News music
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy