বরাবরই শাসক-বিরোধী মত প্রকাশ করে এসেছেন তিনি। তা সে রাজ্যের হোক কিংবা কেন্দ্রের। কিন্তু গত এক বছর ধরে অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যেন ‘বদল’ দেখতে পাচ্ছিলেন অনেকে। টলিপাড়ায় এমন গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন পরমব্রত। যদিও তেমন কিছুই হয়নি। তবে ভোটপ্রচারের একেবারে শেষের দিকে তৃণমূল প্রার্থীদের হয়ে হয়ে হুডখোলা গাড়িতে চেপে প্রচার করেছেন পরমব্রত। কখনও আবার তৃণমূলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। কিন্তু এমন পালাবদল যে হবে, তা ভাবতে পারেননি অভিনেতা। শাসক দলের এমন পরাজয়ের পর তাঁর কি আর আস্থা রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে? আনন্দবাজার ডট কমকে কী জানালেন পরমব্রত?
আরও পড়ুন:
এমন একটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতই ছিলেন অভিনেতা। এই নির্বাচন যে খুব কঠিন একটি নির্বাচন হতে চলেছে এটা জানা ছিল । এমনই মত অভিনেতার। তিনি বলেন, ‘‘একটা সরকার যখন ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী একটা হাওয়া তৈরি হয়। এই সরকারের যেমন বেশ কিছু ভাল কাজ, ভালো প্রকল্প ছিল, ঠিক তেমনই তাদের এক শ্রেণীর কর্মীদের ঔদ্ধত্য, কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি, মানুষের জীবনে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা, একই সঙ্গে চুরি-দুর্নীতি— এ গুলো তো অস্বীকার করা যায় না। কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি মানুষের কাছে মমতা বন্দোপাধ্যায়র ভাল কাজকে গৌণ করে দিয়েছে।’ এটা তৃণমূলের অতি বড় সমর্থকও স্বীকার করবেন। সেখানে আমি তো তৃণমূল পার্টির সদস্যও নই, কর্মীও নই।’’ পরমের আরও বক্তব্য, ‘‘আসলে মানুষের মধ্যে একটা রাগ ছিল। সেই রাগটা থাকা স্বাভাবিক। আসলে তৃণমূলের কিছু নেতামন্ত্রী এই সব জুলুম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাল কাজকে ছাপিয়ে গিয়েছে।’’ অভিনেতা একই সঙ্গে এও মনে করেন, হারের যে অভিঘাত এতটা হবে সেটা তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিল না।
তৃণমূল সরকারের এই সব খারাপ দিক সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন তাদের হয়ে প্রচারে নামলেন? অভিনেতার যুক্তি, ‘‘আমি আর্দশগত ভাবে বিজেপির উল্টোদিকের মানুষ । আমি এসআইআর প্রক্রিয়াটি যেভাবে হয়েছে ,সেটি সমালোচনা করার মতো বলেই প্রথম থেকে মনে হয়েছে | এবং প্রক্রিয়াটা বেশ গোলমেলে। আমার মনে হয়েছে, এই প্রক্রিয়াটার বিরুদ্ধে কথা বলা দরকার। প্রথমে বেশ কয়েক লক্ষ ভোটারের নাম বাতিল হয়। পরে যে ভাবে ৩৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ল সেটা আমার কাছে অসাংবিধানিক মনে হয়েছে। আর একটা গণতন্ত্রে একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের বিরোধিতা করার অধিকারও আমার আছে। সেই সময় এই অন্যায়গুলোক প্রতিবাদ করার রাস্তা হিসেবে তৃণমূলকেই দেখতে পেয়েছি। কারণ বামেরা কোথাও নেই, কংগ্রেসের তো অস্তিত্বই নেই।’’
অভিনেতা জানতেন, নির্বাচনের আগে থেকে তাঁকে নিয়ে বিস্তর জল্পনা হয়েছে। তিনি হয়তো তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন। পরমব্রতের কথায়, ‘‘আমার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল ও আছে। সেই কারণেই উনি জানতেন, আমি এসআইআর-এর বিরোধী। তাই শেষের দিকে কয়েকটা নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়েছিলাম।’’ এর পাশাপাশি পরমব্রত শোনালেন, ‘‘আমি বিজেপির দর্শনের বিরোধী হলেও বিজেপির কিছু জিনিসের বিরোধী নই। সেটা হল, তাদের পার্টির মজ্জায় রয়েছে , ব্যবসা, উন্নয়ন ও শিল্প।। সেই উন্নয়ন যদি পশ্চিমবঙ্গে হয়, তা হলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুশি হব। সে ক্ষেত্রে দল-রং কিছুই দেখব না।’’
তৃণমূলের ভোট প্রচারের রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
শিল্প ও উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি যেমন নতুন সরকারকে নিয়ে আশাবাদী, তেমনই চলচ্চিত্র শিল্প নিয়েও আশা রয়েছে নতুন সরকারের উপর। একই সঙ্গে টলিউডের ক্ষেত্রে তৃণমূলের সব চেয়ে ‘বড় ভুল’ প্রসঙ্গে পরমব্রত বলেন, ‘‘তৃণমূল আসলে চলচ্চিত্র শিল্প়টা এমন কিছু লোকের হাতে তুলে দিলেন ,যিনি কোনও ভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বছরের পর বছর এক ধরনের ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করেছিলেন, যার বিরুদ্ধে গত বছর একটা লড়াইয়ে নেমেছিলাম আমরা। প্রথম থেকেই এই লড়াইয়ে প্রথম সারিতে ছিলাম আমি। কিন্তু আমার উপরে আমার কোম্পানির অনেক দায়িত্ব থাকে | যখন আমার এবং আমাদের সব কাজ ‘নিষিদ্ধ’ করে দেওয়া হয়, তখন একটা সময়ের পরে অব্যাহতি চাইতেই হয় আমাকে। সেই লড়াইকে রাজনৈতিক রং লাগানো হয়। এবং এ ক্ষেত্রে কেউই আমাদের উপকারে আসতে পারেননি।’’
একটা সময় সমাজমাধ্যমে এসে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয় অভিনেতা প্রযোজক, পরিচালক পরমব্রতকে। পালাবদলের পর, মঙ্গলবার অভিনেতা জানান, ফেডারেশন সংক্রান্ত ঘটনা ও ক্ষমা চাওয়ায় তাঁর ভাবমূর্তিতে একটা আঘাত এসেছে সেটা তিনি জানেন | পরমব্রতের কথায়, ‘‘আমার তখন আর কোনও উপায় ছিলো না। এবং আরও অনেকের মতই আমাকে অপমান হজম করতে হয়েছে | ফেডারেশনের কাজকর্মে যে উনিশ-বিশ হয়েছে সেটা জায়গায় গিয়েছে সেটা যখন তৃণমূল নেতৃত্ব যতদিনে বুঝতে পেরেছেন, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।’’ একই সঙ্গে পরমব্রত বলেন, ‘‘নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে হাজারও রাজনৈতিক কাঁটাছেড়া হতে পারে, কিন্তু ভোটের এই ফলে যদি সিনেমা শিল্প এবং ফেডারেশন রাজনৈতিক খবরদারি মুক্ত হয় তাহলে সেটা স্বস্তিদায়ক হবে সবার জন্যে। এটা হওয়ার দরকার ছিল।’’
নির্বাচনী প্রচারে পরমব্রত ও জুন মাল্য।
সেইসঙ্গে পরমব্রত আরও এক বার বলেন, ‘‘মানুষ যখন পরিবর্তন করে তখন কিছু আশা নিয়েই করে। তাই ওই ‘ব্যান কালচার’ ও ‘থ্রেট কালচার’— এগুলো আগামী সরকার এখনই করবে না বলেই প্রত্যাশা করি। তারা যদি এর সমাধান করতে পারে অবশ্যই তাদের প্রশংসা করব। এবং যেটা উল্লেখযোগ্য শিল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিনেমার কোনও লোক থাকা দরকার, যিনি হাতে কলমে কাজ টা করেছেন এবং জানেন |’’
দেড় দশক আগে এক ‘পালাবদলের কান্ডারি’ সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’! এখনও কি তাঁর উপর আস্থা রয়েছে অভিনেতার? পরমব্রতের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৪৫ বছর রাজনীতি করছেন। অনেক কিছু দেখেছেন, অনেকে ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছেন। ওঁর প্রতি আমার ব্যক্তিগত সম্মান নিশ্চয় থাকবে। উনি লড়াকু মানুষ। নিশ্চয় নিজের মতো করে রাজনীতিতে নিজের জায়গা রাখতে পারবেন।’’