পর্দায় নায়ক-নায়িকার গভীর প্রেম, মাখোমাখো দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য অনেক ধরনের কারুকার্য করা হয়। একটা সময়ে বড়পর্দার ক্ষেত্রে দেখানো হত অভিনেতা-অভিনেত্রী বাস্তব থেকে সোজা পৌঁছে গিয়েছেন কোনও পছন্দের জায়গায়। আর নেপথ্যে চলছে গান। সেই রোমান্স যখন ছোটপর্দায় ঢুকে পড়েছে তখন দেখা গিয়েছে কখনও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের মাঝে চলে এসেছে ফুল। বা একে অপরের দিকে চেয়ে স্থির হয়ে গিয়েছে। আর চলছে চেনা গান।
একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। সেই সময় ছোটপর্দায় দেখা যেত ‘বৌ কথা কও’, ‘দূর্গা’ বা ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র মতো কিছু ধারাবাহিক। তখন মূলত নায়ক-নায়িকার প্রেমের দৃশ্যের নেপথ্যে শোনা যেত ‘প্রেমের জোয়ারে’ বা ‘ভালবাসি ভালবাসি’র মতো কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত। এমনকি, তার অনেক পরে সম্প্রচারিত হয়েছিল ‘মোহর’ ধারাবাহিকটি। সেখানে শোনা মোহর আর শঙ্খের ফুলশয্যার দৃশ্যের নেপথ্যে বেজেছিল নজরুলগীতি ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’। সময়ের সঙ্গে ছোটপর্দায়ও গল্প বলার ধরন তেমনই দৃশ্যে তৈরিতেও এসেছে অনেক বদল।
এমনকি, অন্যতম আলোচিত ধারাবাহিক ‘বোঝে না সে বোঝে না’র জন্য তৈরি হয়েছিল আলাদা গান। সেই নিজস্ব বাংলা গান ব্যবহৃত হত বিভিন্ন দৃশ্যে। এই ধারায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। ইদানীং রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুলগীতি নয়, বলিউডের আলোচিত গানই হল নতুন ‘ট্রেন্ড’। নায়ক-নায়িকার মাখোমাখো দৃশ্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সহজ উপায় কি হিন্দি গানের সংযোজন?
ধারাবাহিক পরিচালক অনুপম হরি বললেন, “হিন্দি গানের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বা সাহানা দত্তের ধারাবাহিকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আধিক্য দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে, দর্শক হিন্দি গানের সঙ্গে প্রেমের দৃশ্যকে সহজে গ্রহণ করছে। তাই হয়তো অপেক্ষাকৃত ভাবে ব্যবহার বেড়েছে।”
যদিও সঙ্গীতশিল্পী রূপঙ্কর বাগচীর কাছে বিষয়টি খুবই হতাশার। তিনি নিজেও বেশ কিছু ধারাবাহিকে টাইটেলট্র্যাক গেয়েছেন। গায়ক বললেন, “বাংলা ধারাবাহিকে হিন্দি গান ঢোকানোর কী মানে, সত্যি বুঝতে পারি না। বরং আমার খারাপই লাগে। কষ্ট হয়। হিন্দিভাষী চরিত্র হলে তাও ভাবা যেতে পারে। কিন্তু আদ্যোপান্ত বাঙালি চরিত্রের যদি এমন কোনও দৃশ্য তৈরি হয় সে ক্ষেত্রে বাংলা গানকে যুক্ত করাই বাঞ্ছনীয় বলে আমার মনে হয়।”
আরও পড়ুন:
যদিও অভিনেত্রী অলিভিয়া সরকারের মতে, রোমান্টিক দৃশ্যে গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বত্বের একটা বড় অংশ থাকে। তিনি যোগ করেন, “যত বেশি পরিমাণ হিন্দি গান তৈরি হচ্ছে, সেই পরিমাণে কি বাংলা গান তৈরি হচ্ছে এখন এখানে? একটু কি ভেবে দেখা যায় না?” তবে রূপঙ্কর জানিয়েছেন, স্বত্বাধিকারের বিধিনিষেধ তো হিন্দি গানের ক্ষেত্রেও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে, প্রযোজক স্নিগ্ধা বসু বললেন, “এটা আসলে ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের ব্যাপার। এখন তো রিলের যুগ। কেউ ১০ সেকেন্ডের বেশি ভিডিয়ো দেখে। হিন্দি গানের চাহিদাও সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে।”
অভিনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায় জানালেন, বাংলা গানের সম্ভার বিরাট। সুরের ভান্ডারও তাই। তিনি যোগ করেন, “আমি যে ধারাবাহিকে অভিনয় করছি সেখানে মূলত রবীন্দ্রসঙ্গীতই শোনা যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা হয় না। সেটা তো কাম্য নয়। আমার মনে হয় এই ধারাও আসতে আসতে বদলাবে।” সম্প্রতি, ‘মিলন হবে কত দিনে’ ধারাবাহিকে শোলাঙ্কি রায় এবং গৌরব চট্টোপাধ্যায়ের একটি প্রেমের দৃশ্যের নেপথ্যে হিন্দি গান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এটা কি যুগের হাওয়া নাকি সবটাই ব্যবসার নিরিখে তৈরি হিসেব, তা বোঝা খুব কঠিন।