এটা কি দেজাঁ ভ্যু?
সেই চারজন যুবক। সেই ব্রিটেন। সেই পাগলামো। শুধু বছর তিরিশের ফারাক।
জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন, আর রিঙ্গো স্টার — ‘বিটলস’।
ক্রিস মার্টিন, জনি বাকল্যান্ড, গাই বেরিম্যান, আর উইল চ্যাম্পিয়ন — ‘কোল্ডপ্লে’।
এবং যে দিন থেকে ঘোষণা হয়েছে ‘কোল্ডপ্লে’ মুম্বইতে শো করবে ১৯ নভেম্বর, আমরা, মানে যাদের কাছে ‘ইয়েলো’ এক সময়ের ‘তোমাকে চাই’ বা ‘নীলাঞ্জনা’র সমকক্ষ, তারা শুধুই ওয়েবসাইট খুলে বসে আছি দু’টো টিকিট পাওয়ার আশায়। পাগলামি এমন পর্যায়ে গেছে যে, মা-বাবারা আমাদের দেখলেই পালিয়ে যাচ্ছেন টিকিটের দাম শুনে। সেটা নিয়েও চলছে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। কেউ বলছে ২৫ হাজার টাকা একটা টিকিট। কেউ বলছে দশ হাজার। কেউ বলছে ফ্রি।
এখানে আপনাদের বলে দিই, আমরা মানে, কিন্তু শুধু কলেজের স্টুডেন্টরা নেই এই ‘অ্যাডমিরেশন ক্লাব’য়ে। আমাদের দলে রয়েছেন প্রচুর ‘বিটলস’ কী ‘আব্বা’র ফ্যান যাঁরা তাঁদের কলেজের দিনের উন্মাদনা খুঁজে পান ‘কোল্ডপ্লে’র গানে।
কিন্তু কী আছে সেই গানগুলোয়? আছে দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো কষ্ট। আছে অভাবনীয় সাইকোডেলিক রোমাঞ্চ। আছে রেজিমেন্টেড এস্টাব্লিশমেন্টের প্রতি ক্ষোভ। আছে ভালবাসার টকমিষ্টি স্বাদ। সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ইলেকট্রনিক প্যাচ, অপূর্ব ব্যাকগ্রাউন্ড স্ট্রাকচারিং আর লিরিক্সের ইন্দ্রজাল। ঠিক ‘বছর কুড়ি আগে’ চারজন বন্ধু মিলে লন্ডনের স্যাঁতসেঁতে কুয়াশার গভীরে তৈরি করে এই অতুলনীয় ব্যান্ডটি।
তাঁদের নিয়ে পাগলামি কলকাতায় কোন পর্যায়ে গেছে জানতে চান?
যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ক্লাসের বাইরে, করিডরে সবাই মোবাইলে হটস্পট খুলে বসে আছে। সবাই ওয়াইফাই-তে দেখছে টিকিটের ‘কিউ’তে তারা কোথায়? শুধু কী তাই! এ ছাড়াও রয়েছে ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ-এর অ্যাপ ডাউনলোড করার তাড়াহুড়ো। ‘কোল্ডপ্লে’র টিকিট যদি পেয়েও গেলাম, ট্রেনের টিকিটটাও তো লাগবে। বাবা-মা তো আর অম্বানী নন, যে প্লেনের টিকিট কেটে দেবেন। অগত্যা সবার নজর দুরন্ত কী বোম্বে মেল-এর টিকিটের দিকে।
পাগলামি ভাবছেন এখানেই শেষ! ধুর, সবে তো শুরু। এখন ফেসবুকের মাধ্যমে আমরা প্রায় ভারতের সব কলেজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কানেক্টেড। সেখান থেকেই জানতে পারলাম, দিল্লি থেকে নাকি একটা গ্রুপ টিকিট পেয়ে গেছে হাতে। তাদের সঙ্গে সমানে চলছে হোয়াটসঅ্যাপ কল। মুম্বইতে কোথায় থাকা হবে? দু’দিন লোনাভলা ঘুরে আসব কি না? এই নিয়ে চলছে আলোচনা। ‘কোল্ডপ্লে কনসার্ট’ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলছে আড্ডা। কেউ বাজি রাখছে প্রথম গানটা কী হবে নিয়ে, কেউ বলছে ‘ইয়েলো’ দিয়ে শেষ করবে। পুজোর আগেই দুর্গাপুজোর মতোই জমজমাট ‘কোল্ডপ্লে’ নিয়ে উচ্ছ্বাস।
তবে এটা কিন্তু ‘কোল্ডপ্লে’র প্রথম ভারতসফর নয়। এর আগে চুপিচুপি তাঁরা দু’বার ভারত ঘুরেও গেছেন। একবার দিল্লিতে এসে হঠাৎ গান গেয়েছিলেন ক্রিস মার্টিন। তারপর মুম্বইয়ের ওরলিতে মিউজিক ভিডিয়ো শ্যুট করে গিয়েছেন কাউকে না জানিয়ে।
কিন্তু তাতে কি আর আমাদের মন ভরেছে? একেবারেই ভরেনি। কারণ আমাদের কাছে ‘কোল্ডপ্লে’ ইজ আ ওয়ে অব লাইফ। কখনও তাঁদের আমরা শুনেছি রেডিয়োর খসখসে কণ্ঠে। কখনও সেনহাইজারের ডলবি সারাউন্ডে। কখনও ‘ফিক্স ইউ’ বেজেছে ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রীর সাদা ইয়ারপিসে। কখনও কোনও বন্ধুর ব্রেক আপের পর তার আইপডে বেজেছে ‘ভিভা লা ভিডা’।
এ রকম যেখানে নস্টালজিয়া, সেখানে আমি এবং বাকিরা ব্যাকুল ‘কোল্ডপ্লে’ দর্শন করার জন্য। কিন্তু ভগবানের দর্শন কি সহজে হয়? গ্রাউন্ড রিয়েলিটি যে বড়ই নিষ্ঠুর।
নিষ্ঠুর বলতে মনে পড়ে গেল ‘কোল্ডপ্লে’ কনসার্টের টিকিটের আকাশচুম্বী দামের কথা। প্রথমে ঘোষণা করা হল সব থেকে ‘সস্তা অউর আচ্ছা’ টিকিট মাত্র ২৫ হাজার টাকায়। আর সব থেকে বেশি দামের টিকিটের মূল্য আর একটু বেশি, ৫ লাখ টাকা। আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনটা তো আর এয়ারটেল ইন্টারনেট ফ্যামিলি প্যাকের অ্যাড নয়, যে ছেলে বাবার গাড়ি সাবানজল দিয়ে ধুয়ে দেবে আর ড্যাডি মারাত্মক খুশি হয়ে ছেলেকে দেবে সারা মাসের জন্য আনলিমিটেড থ্রিজি। জীবনটা কঠিন। তাই আমরা, বঙ্গ বা ভারতীয় ছাত্রদল, বাবা-মায়ের কাছে কাকুতিমিনতি করে বা ছোটবেলার পোর্সেলিন পিগি ব্যাঙ্ক ফাটিয়েও সেই টেরিফায়িং টাকার অঙ্ক জোগাড় করতে পারব না — এটা প্রথম দিনেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
তারপর? তারপর এই টিকিট ব্যবসার বিরুদ্ধে টুইটারে শুরু হল বিক্ষোভ। বানানো হল হাস্যকর ‘মেমে’। যা-ই বলুন, তখনও আমাদের রাগ হয়নি। আরে, স্বপ্ন পূরণের রাস্তায় পথভ্রষ্ট হয়েছি। কী করা যাবে?
তারপর হঠাৎ করে একদিন, মধ্যরাতের হোয়াটসঅ্যাপ জানালো ৫ হাজার টাকায় টিকিট বিক্রি হবে। আমার মতো অনেকেই ঘুমচোখে সেটা দেখে, হোক্স বা চক্রান্ত ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন কলেজ গিয়ে জানতে পারলাম যে আমার এক হুঁশিয়ার বন্ধু টিকিট হাত করতে পেরেছে। ষড়যন্ত্র নয়। ক্লাস থেকে বাইরে ছুটে গিয়ে, জেইউ-এর নেট জ্যামারকে ভেদ করে সাইট খুলে দেখলাম ৩১৫৬০ আমার আগে ওয়েটিং লিস্টে। দ্য গ্লোবাল সিটিজেন, এই চ্যারিটি শো-য়ের হর্তাকর্তারা আমাদের আশার আলো দেখিয়েছেন। আপনি যদি ভাবেন এটা কোনও স্প্যাম অ্যাডভার্টাইজমেন্ট, তা কিন্তু নয়।
মোডাস অপারেন্ডি হচ্ছে এই! টিকিট অর্জন করার জন্য খাটতে হবে। লগ ইন করে অ্যকাউন্ট খুলতে হবে গ্লোবাল সিটিজেনের সাইটে। কৌতূহলী ফ্যানদের দেওয়া হবে মিশন। সেই মিশনগুলো লোকালিটিতে, শহরে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বা সোশ্যাল সার্কেলে সম্পূর্ণ করলে পাওয়া যাবে পয়েন্ট। মিশনগুলো কী? মিশন হল টুইটার বা ইন্সটাগ্রামে অ্যাওয়ারনেস মেসেজ শেয়ার করা। ফেসবুক পোস্টের দৌলতে অনলাইন পিটিশন সাইন করানো। এ রকম সৎ, জনকল্যাণমূলক কাজের বিনিময়ে পাওয়া যাবে সেই গোল্ডেন টিকিট!
এবং আপনার যদি স্কোর কার্ড ২৮ হয়, আপনার নাম লটারি লিস্টের মতো বেরোবে ওদের সাইটে। তারপর কপালে থাকলে টিকিট।
এই মুহূর্তে আমি আর আমার বন্ধুরা লেগে পড়েছি পিটিশন সাইন করতে। পয়েন্টের জন্য। ফ্রি টিকিটের জন্য।
আর চলছে স্বপ্ন দেখা। ট্রেনে করে মুম্বই যাওয়ার। ১৯ নভেম্বর স্টেজের সামনে দাঁড়ানোর। ক্রিস মার্টিনকে চাক্ষুষ করার। আর পরের প্রজন্মকে বলতে পারা, যে আমি ‘ইয়েলো’ গানটা লাইভ শুনেছি।
‘লুক অ্যাট দ্য স্টারস,
লুক হাউ দে শাইন ফর ইউ,
অ্যান্ড এভরিথিং ইউ ডু,
ইয়া, দে ওয়ার অল ইয়েলো...’