সালটা ২০২০। তখন দেশ জুড়ে কোভিড অতিমারী চলছে। এর মাঝে আসে অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের আত্মহত্যার খবর। সেই ঘটনার জেরে অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে পুলিশি জেরা। তার পরে জেলবাসও হয় তাঁর। ওই সময়েই উত্তরপ্রদেশের হাথরস এলাকায় ঘটে যায় একটি দলিত নারীর ধর্ষণের ঘটনা। অভিযুক্ত সেই গ্রামের ঠাকুর বংশোদ্ভূত পরিবারের চার জন পুরুষ। মূল অভিযুক্ত ছিল সন্দীপ সিসোদিয়া। নির্যাতিতা নিজে স্বীকার করেছিলেন, তাঁকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের গ্রামে ধর্ষণের ওই ঘটনার আঁচ এসে পড়ে দিল্লিতে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। ছ’বছর কেটে গিয়েছে সেই ঘটনার পরে। কেমন আছে সেই নির্যাতিতার পরিবার? ঠিক কী হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বরের রাতে? সেই সব অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখা যেতে পারে ‘হাথরস ১৬ ডে’ ডকু-সিরিজ়টি। গত ১৫ মে মুক্তি পেয়েছে এই সিরিজ়টি।
আরও পড়ুন:
সত্যি ঘটনা অবলম্বনে একাধিক সিরিজ় আগেও হয়েছে দেশে। ধর্ষণ কিংবা খুনের মতো ঘটনা, কোথাও আবার ‘অনার কিলিং’ বা সম্মানরক্ষার্থে খুনের বিষয় নিয়ে ওটিটি-র পর্দায় ছবি বা সিরিজ় জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু হাথরসের গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে তৈরি এই সিরিজ় নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। আইএমডিবি-র রেটিং অনুযায়ী, পয়লা নম্বরে রয়েছে এই ডকু-সিরিজ়টি। পরিচালক প্রতীক গ্রাহামের কাছে ২০২৪ সালে সিরিজ়টি বানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তার পর থেকে শুরু প্রস্তুতি। প্রতীক একা নন, এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেন দিল্লিনিবাসী সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে। এই গণধর্ষণের ঘটনার পরে পুলিশি পাহারায় নির্যাতিতার মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার খবর যিনি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন এই তনুশ্রীই। ঘটনার পরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী এবং তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েনরা হাথরসের দিকে রওনা দিলেও তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছিল। মাঝ রাস্তায় আটকে দেওয়া হয় তাঁদের।
ছবির পরিচালক প্রতীক জানান, এই সিরিজ়টা করতে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে যান অভিযুক্তের বাবার কথা শুনে। অভিযুক্তের বাবা বলেছিলেন, মেয়েটির দাদা ও বাবাই নাকি পরিবারের সম্মানরক্ষায় তাঁকে খুন করেছেন। প্রতীকের কথায়, ‘‘আসলে এই সিরিজ়টা করতে গিয়ে বুঝেছিলাম, আমাদের সমাজটা আজও কতখানি পিছিয়ে রয়েছে। ওই গ্রামে আধুনিক কোনও মেয়ের দেখা পাইনি। যাঁদের দেখতে পেয়েছিলাম তাঁরা সবাই ঘোমটা দিয়ে রাস্তায় বেরোন।’’
এই সিরিজ়ে রয়েছে নির্যাতিতার স্বীকারোক্তির ভিডিয়ো, যেখানে তিনি ধর্ষণকারীদের নাম বলেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের তদানীন্তন এডিজি (আইনশৃঙ্খলা)-র বক্তব্য রয়েছে। যদিও আদালত রায় দিয়েছিল, এটা কোনও ধর্ষণের ঘটনাই নয়। হাথরস এলাকার বুলগারির গ্রামে নির্যাতিতার ওই বাড়িতে এখনও পুলিশ পাহারা। সময় যেন থমকে গিয়েছে সেখানে। উত্তরপ্রদেশ সরকারের তরফে ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে ওই পরিবারটি। তবে নির্যাতিতার মায়ের মুখে একটাই কথা, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ করে কিছুই হবে না। তাঁর কথায়, ‘‘মেয়েরা বাঁচবেই না তো পড়াশোনা কী করবে?’
এই ঘটনার জেরে নির্যাতিতার পরিবারের দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ। এমনকি, পরিবারটিকে গ্রাম থেকে চলে যাওয়ারও নাকি ফতোয়া দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই সবও দেখানো হয়েছে এই সিরিজ়টিতে।