স্বামী-স্ত্রী হিসেবে এখন তাঁরা প্রাক্তন। সুদীপা আর উজান। অজানা কলকাতাকে জানতে এসে অচেনা মানুষকে ভালবেসে কলকাতাতেই থেকে যাওয়া একটি মেয়ে, সুদীপা (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) আর শহর কলকাতার ইতিহাস যাঁর বর্ণনায় ট্যুরিস্টদের কাছে প্রতিদিন জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই উজান (প্রসেনজিত্ চট্টপাধ্যায়) নিজের প্রেম, নিজের সংসারে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন ব্যর্থ হচ্ছে সে! কেরিয়ার আর ভালবাসার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পেরে, নিজের ইগো আর নিজের বিশ্বাসের মধ্যে ভারসাম্য না রাখতে পেরে একটু একটু করে একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছে গল্পের সুদীপা আর উজান। এই ভাবে একটা সময় তাঁরা একে অপরের কাছে ‘প্রাক্তন’ হয়ে গিয়েছে।

ছবির পরিচালক নন্দিতা রায় আর শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁদের নতুন এই চিত্রনাট্যে মানুষের জীবনের সাদা আর কালো, ভাল আর মন্দকে অদ্ভুত ভাবে পাশাপাশি এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাই মুম্বই থেকে কলকাতামুখী ট্রেনের কামরায় শুধু দুই প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রী মুখোমুখি হয়নি। আসলে এই গল্পে যেন হঠাত্ মুখোমুখি একটি জীবনের অতীত এবং বর্তমান, মুখোমুখি আসলে দুই নারী— মালিনী আর সুদীপা।

নন্দিতা আর শিবপ্রসাদের এই ছবিতে ট্রেনের একেকটা কামরা যেন হয়ে উঠেছে একেকটা আলাদা আলাদা সময় এবং সংসারের আলাদা আলাদা দৃশ্যপট।

গল্পে রয়েছে এক বর্ষীয়ান দম্পতির সম্পর্ক, যাঁরা আজও নিজেদের আঁকড়ে রয়েছেন অবলীলায়, আঁকড়ে থাকার অভ্যাসে। অন্য দিকে সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি, যাঁদের সম্পর্ক সবে শুরু হচ্ছে একরাশ স্বপ্ন আর ভাললাগা নিয়ে। আর রয়েছে গানের ‘ফেরিওয়ালা’ চার বন্ধু, যাঁদের মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে প্রাক্তন প্রিয় বন্ধুকে হারানোর বেদনা!

এ ছবিতে প্রায় পনেরো বছর পর ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় আবার একে অপরের মুখোমুখি। এতগুলো বছর পেরিয়েও এই দু’জনের জুটির সেই রসায়ন আজও যেন কোনও এক জাদুবলে অপরিবর্তিত যা মুগ্ধ করেছে তাঁদের অসংখ্য ভক্ত থেকে ফিল্ম সমালোচকদেরও। তাই গল্পের সুদীপা আর উজানের মনের লড়াইটা কখনই নাটকীয় বলে মনে হয়নি। তবে দু’জনের মনমালিন্যের দু-একটা জায়গা অকারণেই  বড্ড চড়া দাগের বলে মনে হয়েছে। ছবির চিত্রনাট্যের চেয়ে ছবির অভিনেতাদের গুণে ‘প্রাক্তন’ দর্শকদের অনেক বেশি তৃপ্তি দেবে বলে আমার বিশ্বাস।
সদ্য বিবাহিত দম্পতির চরিত্রে বিশ্বনাথ আর মানালি গল্পের গুমোট বাঁধা বাস্তবের মধ্যে একটু স্বস্তির সুযোগ এনে দেবে। স্বস্তি মিলবে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জুটির অংশতেও। ওঁদের দু’জনকে দেখে মন তৃপ্তিতে ভরে উঠবে।

ভাল লাগবে চার ‘গানওয়ালা’ বন্ধুদেরও। ‘ভূমি’র  সুরজিৎ, ‘চন্দ্রবিন্দু’র অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় আর উপল সেনগুপ্ত এবং সঙ্গে অনুপম রায়। গল্পে এঁদের নাম পাল্টায়নি। অকারণ অভিনয়েরও দরকার পড়েনি তাই। ‘প্রাক্তন’ তাই গানে-গল্পে জমজমাট হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন, জীবনের জন্য ছবি বানাতে হলে অনিন্দ্য

কিন্তু, সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন মালিনীর চরিত্রে অপরাজিতা আঢ্য। তাঁর সাবলীল অভিনয় আপনাকেও ওই ট্রেনেরই একজন যাত্রী করে তুলবে। আসলে অপরাজিতা হয়তো অভিনয়ই করেননি। তিনি হারিয়ে গিয়েছেন মালিনীর চরিত্রেই। তাই ছবির পর্দা জুড়ে সৌমিত্র-সাবিত্রী, প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা থাকা সত্ত্বেও বার বার সবার নজর কেড়েছেন অপরাজিতা আঢ্য। কিন্তু ‘প্রাক্তন’-এর বেশিরভাগ পোস্টারেই নেই তিনি। প্রচারের আলো কেন যে তাঁর উপর সে ভাবে পড়ল না তা বুঝলাম না। অপরাজিতা ছাড়াও মালিনী-উজানের মেয়ে পুতুলের চরিত্রে ছোট্ট অভীপ্সা বসাক নজর কেড়েছে সকলের।

তবে যে যাই বলে বলুক, ভুল তো মানুষমাত্রেই হয়ে থাকে! ভুল করতে করতেই মানুষ পরিণত হয়। যেমন, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হওয়া ব্যাটসম্যান তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার সময় মনে প্রাণে চান প্রথম ইনিংসের ভুল ভ্রান্তিগুলো শুধরে নিতে। অনেকে শুধরে নেনও। এই গল্পের উজানও নিজের বিবাহিত জীবনের প্রথম ইনিংসের ভুল শুধরে নিয়ে অনেক বেশি পরিণত হয়েছে মালিনীর সঙ্গে সম্পর্কে। আর মালিনীর সহজ সরল জীবন দর্শনের মুখোমুখি হয়ে সুদীপাও নিজের ভুল বুঝতে পারে শেষ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে ‘প্রাক্তন’ দেখতে খারাপ লাগবে না!

ছবিটা দেখার পর থেকে কবীর সুমনের একটা গানের লাইন বার বার খুব মনে পড়ছে!...অনেক দিন পর, আবার চেনা মুখ...আর ‘প্রাক্তন’ কেমন তা দর্শকই বলুক!