আকাশ যখন চক্ষু বোজে/অন্ধকারের শোকে/তখন যেমন সবাই খোঁজে/সুচিত্রা মিত্রকে.../তাঁরই গানের জোৎস্নাজলে/ভাসাই জীবনখানি,/তাই তো তাঁকে শিল্পী বলে/বন্ধু বলে জানি।

শুধু আজ তাঁর জন্মদিন বলে নয়। গানের মধ্যে মন দেখতে আজও খুঁজে বেড়াই আমরা সুচিত্রা মিত্রকে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এই কবিতা সত্যি হয়ে বাজে আমাদের জীবনে।
কিন্তু কেন? যে সময়ে তিনি গান গাইতে এলেন সে সময় হেমন্ত, সতীনাথ, উৎপলা, সন্ধ্যা বাঙালির সমস্ত আবেগে। বাংলা ছবির গান, এমনকি উত্তম-হেমন্ত, সুচিত্রা-সন্ধ্যা জুটির গান বাঙালির রোমাঞ্চে ছড়িয়ে আছে।

এত কিছুর মাঝে সুচিত্রার কণ্ঠ এত মানুষকে আবিষ্ট করে রাখল কেমন করে?

এর উত্তর একটাই। রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানকে গীতবিতানের বাইরে এনে ব্যক্তির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া, এই কাজটা করেছিলেন সুচিত্রা মিত্র সারা জীবন দিয়ে। বাংলা গানের ইতিহাস তাঁর কণ্ঠকে আজও কুর্ণিশ জানায়। তাঁর মধ্যে দিয়ে ধরা থাকল পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের একটানা গায়নের রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাস। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সুধীর চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথকে সামগ্রিকভাবে জানবার চির উৎকণ্ঠা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতর দিয়ে উন্মোচিত বিস্ময় পরিকীর্ণ বিশ্বকে বোঝার আবেগ মাঝখানে জীবনের একটা পর্যায়ে যেমন ব্যক্তিগত জীবনের সংকট ও অভিজ্ঞতা তাঁর গানের জগতকে সমৃদ্ধ করেছে তেমনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের অনিবার্য গণসংযোগ সুচিত্রা গায়নে এনেছে এক পার্থিব ঋজুতা।’’

গায়নের ঋজুতা কি জীবনের আঘাত থেকে পেয়েছিলেন সুচিত্রা? নিজের মরমের যন্ত্রণা কি তাই অন্যের বেদনায় মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তিনি?তাঁর গান শুনে

কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখলেন, ‘কুয়াশার ঘন অভিমানে/ডুবে আছে, অকূল ক্রন্দন/আচ্ছন্ন করেছে চরাচর,/তবুও ঋজুতা দিল প্রাণে/সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠস্বর।’
ইতিহাস যে সত্যকে ছুঁয়ে থাকে!

নয়তো আজকের সময়ের হানাহানিতেও তো সেই ‘একলা চল রে’-র সুচিত্রা আমাদের শক্ত রাখেন। সেই ঋজুতা! দীপ্তির মাঝে দৃপ্ততা!তাঁকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে দেয়।

আশাপূর্ণা দেবী লিখেছিলেন, ‘শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র তাঁর সাধনার শক্তিটি নিয়ে আরো সুদীর্ঘকাল বাঙালি হৃদয়কে সুরের সুরধুনীতে প্লাবিত করে চলুন।’
লেখক সামনের পথটা দেখতে পান আগে থেকেই। সুচিত্রা মিত্র-র গান এই লেখকের উপলব্ধিকে পূর্ণতা দিয়েছে।

কিন্তু ঋজুতার সঙ্গে যে বেদনার কথা, ব্যক্তিগত জীবনের কথা তাঁর ক্ষেত্রে বার বার উঠে আসে, কেন?

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের আশ্রম শূন্য করে চলে গেছেন। ঠিক তার পরেই এসেছিলেন সুচিত্রা। ছিপছিপে। বুদ্ধিমতী। সপ্রতিভ। চঞ্চল।তাঁর গান, আবৃত্তি আর অভিনয়ে মুখরিত আশ্রম। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’রসরস্বতী তিনি। আবার ১৯৪৬-এর অগস্টে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় যখন কলুষিত হল কলকাতা, তখন চিন্মোহন সেহানবীশের কথায়, ‘মনে পড়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখক ও শিল্পীদের সেই অপূর্ব অভিযান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যখন সে মিছিল পৌছাচ্ছিল, নিমেষের মধ্যে মিছিলের গাড়িগুলিকে ঘিরে ফেলছিল হাজার হাজার শব্দাতুর মানুষ।তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে ট্রাকের উপরে দাঁড়িয়ে সুচিত্রা মিত্র গান ধরলেন,‘সার্থক জনম আমার...।’

শান্তিদেব ঘোষ, রমা মণ্ডলের সঙ্গে সুচিত্রা মিত্র।

দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ। পারতেন সুচিত্রা!দাঙ্গা থামিয়ে দিতে, নিকারাগুয়ার মুক্তিসংগ্রামের জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে গান গেয়ে টাকা তুলে দিতে। কিন্তু নিজের জীবন? নিজের ঘর?

সুচিত্রা মিত্র এমন এক মানুষ যাঁকে পুরুষ ঠিক অধিকারে আনতে পারেনি। তাই বিবাহবিচ্ছেদ। ছেলেকে একা মানুষ করার লড়াইয়ে তিনি বিজয়িনী। পারিবারিক সূত্রে জেনেছি, তাঁর জীবনের মন্ত্র ছিল একলার। একলা লড়াইয়ের। তিনি নিজেই বলে গেছেন, ‘অপরকে আনন্দ দেবার জন্য গান আমি গাই না। আমি নিজে আনন্দ পেলে নিশ্চিত জানি অপরকে তা আনন্দ দেবে। রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গান আমাকে অভিভূত ও আকর্ষণ করে বেশি কারণ সে দুঃখ তো দুঃখ নয় এক আশ্চর্য উত্তরণ।রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গান আমাকে জীবন চিনতে শেখায়, মনকে সুদৃঢ় করে তোলে। এ এক আশ্চর্য শিক্ষা।’

সুচিত্রা মিত্র যে ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তা রবীন্দ্রসঙ্গীত রূপায়ণে বিশিষ্ট সম্পদ। ‘দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হল’গানের ‘পার হল’-তে সামান্য ঝোঁকের গায়নে সুচিত্রা তাঁর শ্রোতাদের দুঃখের উত্তরণের বিষয় সুনিশ্চিত করেন। গায়নরীতির ব্যতিক্রম আছে আরও। বিষণ্ণতাকে দৃপ্ততায় ছুঁয়ে যাওয়ার উদ্যম। তাঁর খুব কাছের মানুষ, রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ পার্থ বসুর লেখায় পাওয়া যায় এই বাঁধন ছেঁড়ার গল্প।

‘তৃপ্তি মিত্র-র স্মরণসভা হল। নিশ্চয়ই মৃত্যুর গান গাইবেন সুচিত্রা।তাঁর এই বহুকালের বন্ধুর জীবনও ছিল লড়াইয়ের নামান্তর। তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা হোক গানে গানে। সুচিত্রা গেয়েছিলেন, ‘ওরে জাগায়ো না, ও যে বিরাম মাগে’, আরেকটি গান আরও চমকে দিয়েছিল, ‘বনে যদি ফুটল কুসুম।’
সব কনভেনশন ভেঙে বেরিয়ে এল শোক।

জীবনের পথ কখনওই সোজা ছিল না। গানের ঐশ্বর্যে যখন ঘিরে আছেন তখন বলছেন তিনি,‘গানকে এ ভাবে বিক্রি করতে চান না!’কী অসীম সাহস তাঁর! খ্যাতির সুচিত্রা মিত্র আত্মগরিমায় ভরে উঠছেন না তো!বরং শেষবেলায়নিজের সমালোচনা করতে শুনেছি তাঁকে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, ‘এই সেজেগুজে এ ভাবেই কি গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করতে চেয়েছিলাম আমি?’

দেখেছি শেষবেলায় মঞ্চে গান গাইতে গিয়ে তাই কেঁদে ফেলতেন তিনি। নাহ! এই কান্নার মধ্যে কোনও গ্লানি ছিল না।

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ সুভাষ চৌধুরী লিখছেন, ‘তিনি জানতেন সাধনা যে শেষ হবে মোর সে ভাবনা যে নাই। সহজাত প্রতিভার অধিকারিণী হয়েও সুচিত্রা মিত্রকে চিনে নিতে ভুল হয় কী?’
হয়তো হয়। সংসারের দাবি মিটিয়ে। ফরমাসি গান গেয়ে। ছাত্রদের গান শিখিয়ে। স্তাবকদের ইচ্ছে মিটিয়ে তারার আলোর সঙ্গে কথা বলা একলা সুচিত্রা...সেখানে আলো ফেললে দেখা যাবে প্রেম তাঁকে নিঃস্ব করেছে। আগুন তাঁকে দগ্ধ করেছে। মৃত্যু তাঁকে গান এনে দিয়েছে।

আর তিনি আজও চলেছেন...রক্তমাখা চরণতলে একলা!

কৃতজ্ঞতা
গুণীজনের উদ্ধৃতি সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গীতজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইন্দিরা সঙ্গীত শিক্ষায়তন ও সাউন্ড উইং রেকর্ড কোম্পানি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রকাশিত স্মারক পুস্তিকা থেকে গৃহীত।

ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।