আমি কিন্তু মৃগাঙ্কের ছবি আমার ফোন নম্বরের ‘ডিপি’তে দিইনি। কারণ, দেখনদারি ভালবাসায় আমি নেই। অথচ অনেকেই বলেন, ওর ছবিই নাকি দেখা যায়। এটা নির্ঘাৎ ঈশ্বরের কারসাজি! সুখী দাম্পত্য এ ভাবেই প্রকাশ করিয়ে দিয়েছেন। মৃগাঙ্ক নিশ্চয়ই মনে মনে খুশি। ওর হয়তো ব্যাপারটা চোখে পড়েছে। ভেবেছে, আমিই ওর ছবি ফোন নম্বরের ‘ডিপি’তে দিয়েছি।
না, ২৬ বছর পরে দাম্পত্যের প্রথম বেলার সেই উদ্দামতা, ভাললাগা, ভালবাসা নেই। বদলে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে মায়া, এত বছরের অভ্যাস। আর সন্তানেরা। আমাদের জীবন, সম্পর্ক এখন সন্তানকেন্দ্রিক। এই যেমন, আজ সকালে মেয়ের গানের পরীক্ষা। মৃগাঙ্ক ওকে পরীক্ষা দেওয়াতে নিয়ে গিয়েছে। দুপুরে তার মধ্যেই খাবার টেবিলে কিছু না কিছু চমক থাকবে। রাতে আমরা সপরিবার খাওয়াদাওয়া করতে কোথাও যাব। ২৬ বছর পরে বিয়ের জন্মদিন এমনই।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় শতাব্দী-মৃগাঙ্ক। ছবি ফেসবুক।
তার মানে কি আমাদের মধ্যে মান-অভিমান নেই? সম্পর্কে টানাপড়েন, ওঠাপড়া নেই? অবশ্যই আছে। ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। সেই সময়ে ঠান্ডা মাথায় নিজেকে বুঝিয়েছি, দ্বিতীয় বিয়ে যে খুব সুখের হবে, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? বরং এই মানুষটা তো অনেক বেশি চেনা! আমার ভালমন্দে জড়িয়ে।
প্রথমে অভিনয়ের ব্যস্ততা। তার পরে রাজনৈতিক। এই যে পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারি না, মৃগাঙ্ক সব সামলে দেয়। ও খুব মিশুকে। আমার পরিচিতদের সঙ্গে খুব সহজে মিশে গিয়েছে। রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে অনেক অনুষ্ঠানে যেতে পারি না। মৃগাঙ্ক উপস্থিত থেকে দিব্যি সামলে দেয়। শ্বশুরবাড়ির সকলের সমর্থন না থাকলে, আমি এত কাজ কি করতে পারতাম? এ ভাবেই আমরা পরস্পরের ঢাল হয়ে রয়ে গিয়েছি। ভাঙনের কালেও।
রেস্তরাঁয় সপরিবার রায়-বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি ফেসবুক।
এই প্রজন্মের অনেকে জানতে চান, কোন ম্যাজিকে আমি আর মৃগাঙ্ক এতগুলো বছর বেঁধে বেঁধে কাটিয়ে দিতে পারলাম? আসলে আমাদের সময়ে দেখা করা বা প্রেম করার সময় খুবই অল্প ছিল। ফলে, একসঙ্গে সময় কাটানোর তাগিদ আমরা ভিতর থেকে অনুভব করতাম। বিয়ে করলে একসঙ্গে থাকতে পারব, কাছাকাছি আসতে পারব— এ রকম অনেক অনুভূতি কাজ করত। সে সব নিয়েই প্রথম কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। এখনকার দিনে আর সেই লুকোচুরি বা বাড়়ির শাসন নেই। প্রেমের সঙ্গে একত্রবাস আছে। বাড়ির লোকেরাও এখন আর আটকান না বা শাসন করেন না। ফলে, কোনও লুকোচুরি নেই। বিয়ের আগেই একসঙ্গে বেড়াতে চলে যাচ্ছেন প্রেমিক-প্রেমিকা। এর পরে আর আকর্ষণ থাকে?
তাই ১৪ বছরের প্রেম বিয়ের কয়েক মাস কাটতে না কাটতেই ভেঙে যাচ্ছে! একই ভাবে আগে অল্প বয়সে বিয়ে হত। ওই বয়সে একটি মেয়ের স্বাধীন মতামত জানানোর বয়স বা মানসিকতা তৈরি হত না। নারীরা উপার্জনও করত না। ফলে, সে মুখ বুজে অনেক কিছু সহ্য করেছে। এখন আর সেটা হয় না। নারী পরিণতমনস্ক হওয়ার পর বিয়ে করছে। উপার্জনও করছে। ফলে, সে দাম্পত্যের ঝক্কি পোহানোর চেয়ে স্বাধীন জীবন কাটাতে বেশি ভালবাসছে।
ছুটিতে বেড়ানোর ফাঁকে। ছবি ফেসবুক।
মৃগাঙ্কের আরও একটা বড় গুণ, প্রচণ্ড রসিক। অনেক কিছু রসিকতার মোড়কে মুড়ে হাল্কা করে দিয়েছে। যেমন, আমার অল্পবয়সের প্রেমের ছবি টিভিতে দেখানো হচ্ছে। দেখতে দেখতে হয়তো বলে উঠল, “আহা, এত প্রেম কোথায় ছিল!” কিংবা, কোনও নায়ককে দেখিয়ে হয়তো বলেছি, “দেখো! কত রোম্যান্টিক।” সঙ্গে সঙ্গে মৃগাঙ্ক উত্তর দিয়েছে, “ওরা প্রেম করার জন্য টাকা পায়। আমি পেলে, আরও বেশি রোম্যান্টিক হতাম!” মানুষ দোষেগুণে তৈরি। খারাপ সময়ে যদি তার ভালটুকু দেখার চেষ্টা করা যায়, তা হলে বোধহয় সম্পর্ক টিকে যায়। বেঁচে যায় বিয়ে। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করেছি। ফলাফল, বিয়ের ২৬ বছরেও আমরা একসঙ্গে, এক ছাদের নীচে।