Advertisement
E-Paper

রবীন্দ্রনাথকে আমরা কেবলই বাঙালি করে রাখতে চেয়েছি! কিন্তু তিনি সমস্ত গণ্ডির অনেক ঊর্ধ্বে

শিল্পী কমলিনী মুখোপাধ্যায় বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে রবীন্দ্রসঙ্গীত তুলে ধরছেন। তার সঙ্গে বাজছে নানা দেশবিদেশের বাদ্যযন্ত্র। কী ভাবে বিদেশের শ্রোতারা যোগ তৈরি করছেন তাঁর গানের সঙ্গে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করলেন গায়িকা।

কমলিনী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৫৪
আন্তর্জাতিক মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করা নিয়ে কী লিখলেন কমলিনী মুখোপাধ্যায়?

আন্তর্জাতিক মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করা নিয়ে কী লিখলেন কমলিনী মুখোপাধ্যায়? ছবি: সংগৃহীত।

আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমার প্রতিটা দিন জুড়েই থাকেন তিনি। তাঁর গান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার কাজ কয়েক বছর ধরে উ‌ৎসাহের সঙ্গে করছি। রবীন্দ্রনাথের গানের মাধ্যমে বিদেশের বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও শ্রোতাদের সঙ্গে যোগ তৈরি করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম।

সাহিত্যের ছাত্রী আমি। তাই বিদেশের শিল্পীদের রবীন্দ্রনাথের গান বোঝানোর পদ্ধতি আমার কাছে কিছুটা সহজ হয়েছে। এখন আমি নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। কর্মসূত্রে জার্মানিতে যাতায়াত। এখানে অর্কেস্ট্রাশিল্পী বা ধ্রুপদী শিল্পীরা ‘রিটেন ফরম্যাট’-এ তৈরি করা নোটেশন (স্বরলিপি) দেখেই যে কোনও গান বাজান। আমাদের দেশে পদ্ধতিটা অন্যরকম। আমাদের দেশের শিল্পীরা সহজাত। অনেকে স্রেফ শুনে শুনেই গান তুলে নেন। মঞ্চে হয়তো আমার গানের চলন বুঝে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী বাজাচ্ছেন, এমনও হয়। অবশ্যই তার মধ্যেও প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু বিদেশের ধ্রুপদী শিল্পী যাঁরা, তাঁরা লিখিত ব্যাকরণ মেনে বাজান। বিদেশে কাজ শুরু করার পরে, এই পার্থক্যের মুখোমুখি হই সবার আগে।

এখানে এসে উচ্চমানের বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁদের নতুন করে সুর-তাল এই সব বোঝানোর কিছু নেই। তবে এখানে আমার মূল কাজটি হল, তাঁদের রবীন্দ্রনাথ বোঝানো। রবীন্দ্রনাথের লেখা, দর্শন— এগুলি আমাকে ওঁদের সামনে তুলে ধরতে হয়। শুধু স্বরলিপি পড়েই রবীন্দ্রনাথের গান বোঝানো বা বোঝা সম্ভব নয়। ওঁর গানের ক্ষেত্রে কাব্যটাই মূল বিষয়। সেগুলি শুধুই সুরের সমষ্টি নয়। এই পদ্ধতি আমি নিজেও খুব উপভোগ করি। আমি দ্বিভাষিক। জানি, রবীন্দ্রনাথের সব গানেরই বেশ কিছু ভাল অনুবাদ রয়েছে। কিন্তু নিজে অনুবাদ করে ওঁদের বোঝাই। এতে নির্দিষ্ট গানে আমার দৃষ্টিকোণ অনুধাবিত হয়।

ছবি: সংগৃহীত।

এক দিকে রবীন্দ্রনাথের গান, আর এক দিকে বিদেশের বাদ্যযন্ত্র। এই দুইয়ের মেলবন্ধন কিন্তু বেশ সূক্ষ্ম একটা বিষয়। আমি গানের কথা প্রকাশ করি গানটা গেয়ে, ওঁরা যন্ত্রের মাধ্যমে সেই গানের ভাবনা তুলে ধরেন। তাই গানটির মূল বক্তব্য বোঝা ওঁদের জন্য খুবই জরুরি। না হলে গানের যে নির্যাস, সেটা বদলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

জার্মানিতে অর্কেস্ট্রাশিল্পীদের সঙ্গে গত দেড় বছর ধরে আমি কাজ করছি। ডুইসবার্গ ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রার জন্য এই কাজ আরও সহজ হয়েছে। পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও শিল্পীরা আমন্ত্রিত থাকেন। সম্প্রতি স্পেনের এক শিল্পীর সঙ্গে একটি কাজ করেছি। ‘আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা’র সঙ্গে বেজেছে ফ্ল্যামেঙ্কো গিটার। সেই শিল্পী গানটিকে স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করে দিতে বলেছিলেন। একজন অনুবাদক আমাকে সাহায্য করেন। অন্য এক সংস্কৃতির মানুষ রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য বুঝে তা যন্ত্রের মাধ্যমে তুলে ধরছেন, এই পুরো পদ্ধতিটা সত্যিই এক সৃজনশীল সন্তুষ্টি দিয়েছিল। ‘কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি’ গানটির সঙ্গে বাঁশি বাজিয়েছিলেন এক বাঙালি শিল্পী। সঙ্গে ইউক্রেনের এক স্যাক্সোফোনবাদক তাঁর যন্ত্রের মাধ্যমে গানটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। গানের যে বক্তব্য ও ভাব, তাতে কোনও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ ঠিক বার্তাই তাঁর কাছে প্রেরিত হয়েছে। আজকের যুদ্ধ ও সংঘাতের বিশ্বেও এক জন ইজ়রায়েলি ও এক জন ইরানীয় সুরকার একসঙ্গে কাজ করছেন এবং সেই যৌথ প্রয়াসে আমি রবীন্দ্রনাথের গান গাইব— এমন সম্ভব হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানের মাধ্যমেই।

তাই ভাষা বা সংস্কৃতি কোনও ভাবেই শিল্পের পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে না, এটা আমি ক্রমশ বুঝেছি। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে কোনও সংঘাত নেই। শুধু সেগুলির মেলবন্ধন ঠিক ভাবে ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছে আমার সাহিত্যচর্চা। আবার বিদেশের মঞ্চে একেবারে সাবেক ঘরানায় রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়েছি। গানের সঙ্গে শুধুই বেজেছে তবলা, খোল, বাঁশি ও এসরাজ। সেটাও শ্রোতারা গ্রহণ করেছেন। ভিন্ভাষী শ্রোতাদের জন্য ইংরেজিতে অনূদিত সংস্করণ দেওয়া থাকে প্রত্যেকের আসনে। ফলে গানের বক্তব্য তাঁরা বুঝতে পারেন।

ছবি: সংগৃহীত।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে বিদেশের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হলেও, মূল বক্তব্য ও উৎস অক্ষত থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন। তাই আমি মনে করি যে, সঙ্গীতের ভাব অক্ষত রেখে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তা আজ তিনিও সমর্থন করতেন। তবে আমি সব সময়ে একটি বিষয় মাথায় রাখি, রবীন্দ্রনাথের গান যেন তাঁর গানই মনে হয়। সেখানেই সার্থকতা। গানের বক্তব্যের বিচ্যুতি ঘটানো যাবে না।

জার্মানিতে আমি বর্তমানে একটি সঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করছি। সঙ্গীত সমস্ত রকমের সীমানার ঊর্ধ্বে, এটাই এই উৎসবের মূল বার্তা। আমরা বর্তমানে সীমা, গণ্ডি নিয়ে খুব ভাবি। রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত ক্ষেত্র, ভাষা, জাতি, ধর্ম, সব কিছুর মধ্যে ব্যবধান নিয়ে আমরা আজকাল খুব ভাবি। শিল্পী হিসাবে আমাদের কাজ হল, এই গণ্ডিগুলিকে মিলিয়ে দেওয়া। রবীন্দ্রনাথের গানও তো সেই উদারতার কথাই বলে। মঞ্চে গান গাওয়ার সময়ে সেই উপলব্ধিই হয়। ভিন্ন ভাষার মানুষ হয়েও তাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে গুনগুন করেন, কিছু গানে তাঁদের চোখও ছলছল করে ওঠে। এটাই তো প্রাপ্তি। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এমন আরও নানা পরিকল্পনা রয়েছে। এ বার ভেনিস বিয়েনেল-এ রবীন্দ্রনাথের গান গাইব। অর্কেস্ট্রার সঙ্গে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কিছু গানের কথা আমরা ভেবেছি। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এ সব করার কী দরকার? আমি মনে করি, অবশ্যই দরকার। যত বৃহৎ সংখ্যক শ্রোতার কাছে এই গান পৌঁছে দেওয়া যাবে, ততই তো তাঁর উদার দর্শনের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হবে।

আমরা ভাবিনি, আমাদের এত যুদ্ধ, হানাহানি দেখতে হবে। ভাবিনি একটা অতিমারির সাক্ষী হতে হবে। তা হলে রবীন্দ্রনাথকে কেন আমাদের সীমিত ভাবনার বেড়াজালে বদ্ধ করে রাখব? তিনিই তো বলেছেন, ‘চারিদিকে দেখো চাহি, হৃদয় প্রসারি, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি’। রবীন্দ্রনাথ মানেই তো খোলা আকাশ। তাঁর মানবিকতার খুব প্রয়োজন বর্তমান সমাজে। অতিমারিতে আমরা সকলে অনেক হারিয়েছি। গত চার-পাঁচ বছরে আমিও মা-বাবা সমেত অনেককেই হারিয়েছি। এই জীবনে কি সত্যিই যুদ্ধ, হানাহানি, ভেদাভেদের কোনও মূল্য আছে! দুঃখ-হানাহানি ছেড়ে তাই এই পৃথিবীর যেটুকু রয়েছে, তাতেই শান্তি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি। তবেই তো জীবন সার্থক। রবীন্দ্রনাথের গানই তো রয়েছে, ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন।’

শেষে একটা কথা বলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি। অবশ্যই বাঙালি হিসাবে আমরা তাই গর্বিত। কিন্তু, আমরা যেন রবীন্দ্রনাথকে কেবলই বাঙালি করে রাখতে চেয়েছি। আসলে রবীন্দ্রনাথ এ সবের অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। সাহিত্য থেকে সঙ্গীত, সারা বিশ্বে তাঁর অবদান রয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথকে বৃহৎ বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারার অনুভূতি সত্যিই আমার কাছে মূল্যবান।

Rabindranath Tagore Rabindrajayanti
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy