খুব কষ্ট হচ্ছে। এটা কি চলে যাওয়ার বয়স? তবু চলে যেতে হল রাহুলকে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রয়ে গেলেন তাঁর বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, ১২ বছরের একমাত্র সন্তান। থেকে গেল ওকে ঘিরে সবার শোক, স্মৃতি...।
শুটিং করতে যাওয়ার আগে বা সময়েও কেউ ভাবতে পারেননি, এ রকম কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রাহুল নিজেই কি বুঝতে পেরেছিল? কেউ যেমন বুঝতে পারেননি, আমার বিশ্বাস, কেউ চাননি এরকম কিছু ঘটুক। তবু ঘটল। এখন মেনে না নিয়ে উপায় কী বলুন?
মাত্র ৪৩ বছর বয়স। তরতাজা একটা প্রাণ। ভীষণ ভদ্র, রুচিসম্পন্ন, উচ্চশিক্ষিত ছেলে। খুব মাটির কাছাকাছি। ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-তে রাহুল আমার নাতি। বাস্তবে ততটা না হলেও যথেষ্ট আন্তরিকতা তৈরি হয়েছিল আমাদের মধ্যে। ভালবেসে ফেলেছিলাম ছেলেটিকে। নানা কথা, নানা আড্ডা। কথায় কথায় বলত, “তোমার একটা সাক্ষাৎকার নেব।” ওই যে, ‘সহজ কথা’য় ও সবার সাক্ষাৎকার নিত, সেখানেই আমাকেও ডাকবে বলেছিল। সে সব ফেলে রেখেই চলে গেল।
ওর কথা বলতে গিয়ে নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। ছবির নাম বলব না। কারণ, ছবিটি জাতীয় পুরস্কারজয়ী। আমার সঙ্গে ছিলেন অঞ্জনা ভৌমিক। আমরা পুরীতে মাঝসমুদ্রে নেমে শট দিচ্ছি। আচমকা পায়ের নীচে চোরা স্রোত। আমরা সেই স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছিলাম! এখন মনে হচ্ছে, আমার পরমায়ুর জোর ছিল। তাই বেঁচে ফিরেছি। রাহুলের হয়তো সেটা ছিল না। তাই ওর আর ফেরা হল না। ভাগ্য, নিয়তি বা প্রকৃতির খামখেয়াল—যেটা বলবেন, রাহুলের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে।
আপাতত আমাদের শুটিং হচ্ছে না। জানি না, ধারাবাহিকের শুটিং আদৌ আর হবে কি না। হলে রাহুলের জায়গায় কি নতুন কেউ আসবেন? না কি ‘উজান’ চরিত্রটাই বাদ যাবে? বিশ্বাস করুন, কিচ্ছু জানি না। আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কারও কথা হয়নি। রাহুলের জায়গায় অন্য কেউ এলে তাঁকে মেনে নিতে পারব? রাহুলের জন্য কি তখন আরও বেশি করে কষ্ট হবে?
এই প্রসঙ্গে বলি, ধারাবাহিকের শুরু থেকে অভিনয় করছি। এর আগে নীল ভট্টাচার্য আমার নাতির চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। চিত্রনাট্য অনুযায়ী, একটা সময় তিনি বিদায় নিলেন। ধারাবাহিক থেকে নীল যখন বাদ পড়ল, মনখারাপ হয়েছিল। রাহুল তো জীবন থেকেই ‘বাদ’ পড়ে গেল! কষ্ট হবে না? মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে। একসঙ্গে ওঠাবসা, খাওয়াদাওয়া, মজা করতে করতে কাজ— কী করে এখনই সব ভুলে যাব? একা আমি কেন! ইন্ডাস্ট্রির বাইরেও রাহুলের জন্য শোক সবার। যাঁরা ওঁকে গভীর ভাবে চিনতেন, তাঁরা যেমন আছেন, যাঁরা কম চিনতেন বা হয়তো জানতেনই না তাঁকে, তাঁরাও সমব্যথী।
তার পরেও বলব, সময় সব ব্যথার প্রলেপ। আমি কি রোজ উত্তমকুমারকে মনে করি? কেউ করেন?
কেউ করেন না। আমিও করি না। অথচ, উত্তমবাবুর সঙ্গে কত ছবিতে কাজ করলাম! উনি গোপনে কত জনের উপকার করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। রাহুলও তেমনি মনে থেকে যাবে। আজ উত্তমবাবুর স্মরণে কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলে যাই। আগামী দিনে একই ভাবে রাহুলকে মনে করে হয়তো অনুষ্ঠান হবে। ডাক পেলে মন না চাইলেও যেতে হবে সেখানে। যাব। এটাই তো অভিনেতাদের জীবন! মাথার উপরে সেই অর্থে ছাতা নেই, ছাদ নেই। আকাশ থেকে ঝড়, বজ্রপাত যা-ই নেমে আসুক, তার সঙ্গে মোকাবিলা করে জীবনপথে এগিয়ে যেতে হবে।
মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার বাইরে তো জীবন নয়! আর, স্টুডিয়ো আমার কাছে মন্দির। অভিনয় সেই মন্দিরের নিত্যপুজো। ওটা না করে তো বাঁচতে পারব না। তাই শত আঘাত সয়েও শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয় করেই যাব।