বিতর্কের অপর নাম কঙ্গনা? কখনও নিশানায় হৃতিক, কখনও কর্ণ! ‘মন্তব্যে’র জেরে জুটেছে চপেটাঘাতও!
কখনও অভিনেত্রী, কখনও তিনি পরিচালক। দুই ময়দান ঘুরে তিনি আজ রাজনীতিক। তবে রাজনীতি নিয়েও মাঝেমধ্যে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেন তিনি। তবে কোনও ঘটনায় মতামত জানাতে পিছপা হন না কঙ্গনা রনৌত। তাই তাঁর জীবনে বিতর্কেরও শেষ নেই। রইল তাঁরই কিছু বিতর্ক-খতিয়ান।
তিনি কথা বললেই বিতর্ক তৈরি হয়। বিষয়টি এ ভাবেও বলা যায়, দেশে যে কোনও বিতর্ক বা ঘটনা হোক না কেন, তিনি তা নিয়ে বা তাতে যুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে কিছু না কিছু অবশ্যই বলবেন। এবং সেটা অনেক ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই বলেন। যথারীতি তা নিয়ে তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। তবে তাঁর নিজের জীবন নিয়েও বিতর্ক কম নেই। তিনি অভিনেত্রী তথা বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রনৌত।
এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি নিজে থেকে কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াই না। প্রথমে আমাকে আক্রমণ করা হয়। তার পর সেই ঝামেলার নিষ্পত্তি আমিই করি।”
বলিউডে ‘নেপোটিজ়ম’ বা স্বজনপোষণ নিয়ে একটা অভিযোগ বরাবরের। বিষয়টি নিয়ে কঙ্গনা এক বার মন্তব্য করেছিলেন, যা অনেকের মনে থাকতে পারে। ২০১৭ সালে ‘কফি উইথ কর্ণ’ অনুষ্ঠানে কর্ণ জোহরকে সরাসরি কঙ্গনা বলেছিলেন, “তুমি হলে স্বজনপোষণের ধ্বজাধারী।”
বলিউডে তারকাদের বেশি সুযোগ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন অভিনেত্রী। বহিরাগত শিল্পীদের ইচ্ছাকৃত ভাবে সুযোগ দেওয়া হয় না। কঙ্গনার এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন বলিউড নায়িকাদের একাংশ।
কঙ্গনার ‘নেপোটিজ়ম’ বিতর্ক টেনে এক সাক্ষাৎকারে অনন্যা পাণ্ডের উদ্দেশ্যে অভিনেতা সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী বলেছিলেন, “আমাদের স্বপ্ন যেখানে পূরণ হয়, সেখান থেকে স্টারকিডদের পরিশ্রম শুরু হয়।”
আরও পড়ুন:
কঙ্গনার জীবনে বিতর্কের শুরু এক যুগেরও আগে। ২০১৩ সাল থেকে হৃতিক রোশন ও কঙ্গনার মধ্যে সম্পর্কের গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। যদিও বিবাহিত হৃতিক সেই সম্পর্ককে কোনও দিনই মান্যতা দেননি। কঙ্গনা পরে দাবি করেছিলেন, হৃতিকের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
২০১৬ সালে দু’জনেই পরস্পরকে আইনি নোটিস পাঠান। হৃতিকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ আনেন কঙ্গনা। অন্য দিকে, হৃতিকের দাবি ছিল, কঙ্গনা তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে শত শত আপত্তিকর ই-মেল পাঠিয়ে মানসিক ভাবে হেনস্থা করছেন এবং তাঁর নামে একটি ভুয়ো ই-মেল আইডি ব্যবহার করছেন। যদিও পরবর্তীকালে এই তদন্ত তেমন এগোয়নি।
২০২০ সালে সুশান্ত সিংহ রাজপুতের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরেও বিতর্কে উঠে আসে কঙ্গনার নাম। আবার ‘স্বজনপোষণ’ এবং ‘মুভি মাফিয়া’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেন নায়িকা। কঙ্গনার দাবি ছিল, সুশান্তের মৃত্যু ‘পরিকল্পিত হত্যা’। অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কর্ণ এবং আদিত্য চোপড়ার মতো প্রভাবশালী প্রযোজকেরা তারকা-সন্তানদের সুযোগ দিয়ে বাইরের প্রতিভাবান শিল্পীদের ইন্ডাস্ট্রি থেকে কোণঠাসা করে দেন।
সুশান্তের মৃত্যুর তদন্তে মাদকযোগও উঠে এসেছিল। কঙ্গনা তখন অভিযোগ করেন, বলিউডের প্রথম সারির অনেক তারকাই মাদক-চক্রে যুক্ত। তিনি মুম্বই পুলিশের তদন্তের তীব্র সমালোচনা করেন এবং সিবিআই তদন্তের দাবি তোলেন।
আরও পড়ুন:
এতে শিবসেনা নেতার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডাও হয়। এর পরে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে কঙ্গনার মুম্বইয়ের অফিসটি ভেঙে দেয় মুম্বই পুরসভা। সুশান্তের মৃত্যু-পরবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে কঙ্গনার মন্তব্য ঘিরে গীতিকার জাভেদ আখতার তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। কঙ্গনার পাল্টা অভিযোগ ছিল, তিনি যা বলেছেন তা প্রমাণ করতে না পারলে নিজের পদ্মশ্রী পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন।
২০২০-’২১ সালে কেন্দ্রের বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে দিল্লির সীমান্তে চলা কৃষক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কৃষকদের একাংশকে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সন্ত্রাসবাদী’ ও ‘খলিস্তানি’ বলে কটূক্তি করেন কঙ্গনা।
সেই বিতর্ক বড় আকার নিয়েছিল। কৃষি বিলের প্রতিবাদে পথে নামা কৃষকদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে অভিহিত করায় মামলা দায়ের হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
কর্নাটকের একটি আদালতে কঙ্গনার বিরুদ্ধে অপরাধ আইনের ৪৪ (মর্যাদাহানি), ১০৮ (অপরাধমূলক কাজে মদত দেওয়া), ১৫৩ (দাঙ্গায় উস্কানি), ১৫৩এ (ভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতায় ইন্ধন জোগানো) এবং ৫০৪ (সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হয় এমন অবমাননাকর মন্তব্য করা) ধারায় মামলা দায়ের হয়েছিল। কঙ্গনা দরিদ্র কৃষকদের চরম অপমান করেছেন বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করে চারদিকে। যদিও তিনি কখনও কৃষকদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলেননি বলে পাল্টা দাবি করেছিলেন।
২০২৪ সালে চণ্ডীগড় বিমানবন্দরে মহিলা নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও জড়িয়ে যায় কৃষক আন্দোলনের ঘটনার সঙ্গে। চণ্ডীগড় থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময়ে ওই ঘটনায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। বিকেল ৩টে নাগাদ বিমানে ওঠার কথা ছিল তাঁর। সেখানেই নিরাপত্তাজনিত কারণে তল্লাশির সময়ে ওই মহিলা নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে অভিনেত্রীর বচসা হয়। সেখানেই ওই নিরাপত্তারক্ষী নাকি কৃষক আন্দোলনের বিরোধী মন্তব্যের জন্য চড় মারেন কঙ্গনাকে।
তবে সেই সময় অন্য একটি সূত্রে শোনা গিয়েছিল, বিমানবন্দরে তল্লাশির সময়ে নিজের মোবাইল ফোনটি নির্দিষ্ট ট্রে-তে রাখতে রাজি হননি কঙ্গনা। তাতে আপত্তি করেন ওই নিরাপত্তারক্ষী। তিনি অভিনেত্রীকে জানান, বিমানবন্দরের নিয়ম অনুযায়ী, মোবাইলটি ট্রে-তে রাখতে হবে। তার জেরেই ঝামেলা শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, কঙ্গনা ওই মহিলা নিরাপত্তারক্ষীকে ধাক্কা মারেন। এর পরেই ওই রক্ষী তাঁকে চড় মারেন।
কঙ্গনা নিজে অবশ্য ধাক্কাধাক্কির কথা মানতে চাননি। এ প্রসঙ্গে একটি ভিডিয়োবার্তায় কঙ্গনা বলেন, ‘‘আমার কাছে অনেক ফোন আসছে। প্রথমেই জানাই, আমি ভাল আছি। আজ চণ্ডীগড় বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশির পর আমি যখন বেরোলাম, পাশের একটি কেবিন থেকে এক মহিলা নিরাপত্তারক্ষী বেরিয়ে এসে পাশ থেকে আমার গালে মারেন। আমাকে গালিগালাজও করেন। আমি ওঁকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, কেন উনি এমন করলেন, উনি বললেন, উনি কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করেন। আমি নিরাপদে আছি। কিন্তু পঞ্জাবে যে ভাবে আতঙ্কবাদ এবং উগ্রবাদ বেড়ে চলেছে, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’’
২০২১ সালে একটি সংবাদমাধ্যমের অনুষ্ঠানে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করেছিলেন কঙ্গনা। বলেছিলেন, ‘‘১৯৪৭ সালে যে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, তা আসলে ভিক্ষা। ২০১৪ সালে ভারতীয় নাগরিকেরা আসল স্বাধীনতা পেয়েছেন।’’
২০২২ সালে ‘ঢাকাড়’ ছবির প্রচারে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের মতো ‘অখণ্ড ভারত’-এর দাবি তুলেছিলেন তিনি। কোভিড টিকা নিয়ে বিরোধীদের কটাক্ষ করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, যে টিকার বিরুদ্ধে প্রচার করেছিলেন বিরোধীরা, এখন প্রাণ বাঁচাতে সেই টিকা নিতেই ছুটছেন। কোভিড মানুষেরই ‘কাজের ফল’ বলেও দাবি করেছিলেন।
বেফাঁস মন্তব্যের জন্য টুইটার (বর্তমানে এক্স) কঙ্গনার প্রোফাইল ‘নিষিদ্ধ’ করে দেয়। তাতেও দমেননি তিনি। বোন রঙ্গোলী তখন তাঁর হয়ে পোস্ট দিতে থাকেন। অভিযোগ ছিল, বোনের প্রোফাইল থেকে বকলমে পোস্ট দেন অভিনেত্রীই।
বক্সঅফিসে সফল কঙ্গনা। রণবীর কপূর অভিনীত ‘অ্যানিম্যাল’ তকমা পেয়েছিল ‘নারীবিদ্বেষী’ ছবির। এক সাক্ষাৎকারে ‘অ্যানিম্যাল’-এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন কঙ্গনা। প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে ছবিতে এত হিংসা প্রদর্শন করা হয়, সেই ছবি দেখতে মানুষ কী ভাবে ভিড় জমায়! রণবীরের ছবিকে কটাক্ষ করে কঙ্গনা বলেছিলেন, “এই ধরনের পুরুষতান্ত্রিক ছবি বক্স অফিসে ঝড় তোলে। পুরুষেরা অস্ত্র নিয়ে বেরোচ্ছে এবং রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে, এই দেখে মানুষ হাততালি দিচ্ছে। কোনও আইনের বালাই নেই। প্রশাসনকে জবাবদিহি করার বিষয়ও নেই।”
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সাংসদ হওয়ার পর, গোমাংস খাওয়া নিয়ে কঙ্গনার মন্তব্য তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। কংগ্রেস, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের নেতা বিজয় ওয়াদেত্তিওয়ার দাবি করেন, অতীতে কঙ্গনা নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় গোমাংস খাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন।
এই প্রেক্ষিতে কঙ্গনা লেখেন, ‘‘আমি গোমাংস বা কোনও রেড মিট খাই না। আমার বিষয়ে কিছু ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যা লজ্জাজনক। দশকের পর দশক আমি যোগীর মতো জীবনযাপন করছি। আয়ুর্বেদে বিশ্বাসী। এ সব কৌশল আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারবে না। আমার মানুষজন আমাকে চেনেন এবং তাঁরা জানেন, আমি এক জন গর্বিত হিন্দু। এ সব রটনা ওঁদের ভুল পথে চালনা করতে পারবে না।’’