দুর্ঘটনার আশঙ্কা সত্ত্বেও বছরের পর বছর কেন ‘বুড়ো’ কপ্টারে সওয়ার ভারতীয় ফৌজ? ‘চিতা’-নিজস্বী কি পাল্টে দেবে ছবি?
লাদাখের লেহ সংলগ্ন এলাকায় ভারতীয় সেনার ‘চিতা’ কপ্টারটি ভেঙে পড়তেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। কেন ৫০ বছরের পুরনো কপ্টার ওড়াচ্ছে সেনা? কবে বাহিনীতে সামিল হবে হ্যালের ‘প্রচণ্ড’ বা রাশিয়ার ‘কামোভ’?
ফের দুর্ঘটনার কবলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘চিতা’ হেলিকপ্টার। গত ২০ মে লাদাখের লেহ সংলগ্ন টাংস্টেতে ভেঙে পড়ে সেটি। কপ্টারে ছিলেন তৃতীয় পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল সচিন মেহতা-সহ মোট তিন জন। দুর্ঘটনায় সামান্য আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে যান তাঁরা।
লাদাখের পাহাড়ে ভেঙে পড়া ‘চিতা’ কপ্টারের পাশে বসে নিজস্বী তোলেন মেজর জেনারেল সচিন। সেখানে অবশ্য সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা তিনি ও তাঁর সঙ্গীদের চোখে মুখে ধরা পড়েনি কোনও ভয়ের চিহ্ন। উল্টে বেশ চনমনে ছিলেন তাঁরা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কপ্টার ভাঙার পর শীর্ষ সেনাকর্তার এ ভাবে নিজস্বী তোলার ঘটনা ফৌজে বেশ বিরল।
বর্তমানে স্থল ও বিমানবাহিনী মিলিয়ে ৩৫০টি ‘চিতা’ ও ‘চেতক’ কপ্টার ব্যবহার করছে এ দেশের ফৌজ। কিন্তু, ‘বুড়ো’ হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে সেগুলি। ফলে বহু ক্ষেত্রেই মৃত্যু হচ্ছে যোদ্ধা পাইলটদের। জীবনহানি এড়ানো যাচ্ছে না তাঁদের সঙ্গে থাকা সৈনিকদেরও।
ভারতীয় সেনা ও বায়ুসেনার হাতে থাকা ‘চিতা’ ও ‘চেতক’ কপ্টারগুলির নির্মাণকারী সংস্থা হল ‘হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড’ বা হ্যাল। ফ্রান্সের ‘ইউরোকপ্টার’-এর নকশার উপর ভিত্তি করে এগুলিকে তৈরি করে ওই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষের দিকে তা সামিল হয় এ দেশের স্থল ও বিমানবাহিনীর বহরে।
‘ইউরোকপ্টার’-এর ধাঁচে ফৌজের জন্য উড়ন্ত হাতিয়ার তৈরি করতে ১৯৬২ সালে একটি ফরাসি সংস্থার জন্য চুক্তি করে হ্যালে। ১৯৬৫ সালে ‘চেতক’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে তারা। সংশ্লিষ্ট কপ্টারটিকে হাতে পেতে ভারতীয় বিমানবাহিনীকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও চার বছর।
আরও পড়ুন:
১৯৬৯ সালে এ দেশের বায়ুসেনাকে প্রথম ‘চেতক’ কপ্টারটি সরবরাহ করে হ্যাল। ১৯৭৬-’৭৭ সালে শুরু হয় ‘চিতা’ কপ্টারটির বাণিজ্যিক উৎপাদন। টানা কয়েক দশক কাজ করার জেরে এগুলি যে বর্তমানে বেশ ‘বুড়ো’ হয়ে গিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর তাই দ্রুত সংশ্লিষ্ট কপ্টারগুলিকে বদলে ফেলতে চাইছে ফৌজ।
২০০২ সালে হ্যালের তৈরি হালকা ওজনের অত্যাধুনিক ‘ধ্রুব’ কপ্টারটি হাতে পায় ভারতীয় ফৌজ। ২০১০ সালে এর উন্নত সংস্করণ তৈরি করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। হালকা ওই লড়াকু কপ্টারটির পোশাকি নাম ‘প্রচণ্ড’। গত বছরের (২০২৫ সাল) মার্চে ১৫৬টি ‘প্রচণ্ড’র জন্য হ্যালকে ৬২,৭০০ কোটি টাকার বরাত দেয় কেন্দ্র।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, ‘চিতা’ ও ‘চেতক’-এর মতো ‘বুড়ো’ কপ্টারগুলিকে বানপ্রস্থে পাঠিয়ে সেই জায়গা নেবে হ্যালের ‘প্রচণ্ড’। এর সিংহভাগকে স্থলবাহিনীর ‘আর্মি অ্যাভিয়েশন কোর’-এর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকিগুলি পাবে এ দেশের বায়ুসেনা। তবে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কেন্দ্রের হাতে আছে আরও একটি বিকল্প।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রুশ সফরকালে মস্কোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ঠিক হয়, যৌথ উদ্যোগে ক্রেমলিনের ‘কামোভ কেএ-২২৬’ নামে হালকা ইউটিলিটি কপ্টার তৈরি করবে ভারতের হ্যাল। সমঝোতায় দু’দেশের বাহিনীর জন্য কমপক্ষে ২০০টি ‘কামোভ’ তৈরিতে সম্মত হয় নয়াদিল্লি।
আরও পড়ুন:
মাত্র তিন টন ওজনের ‘প্রচণ্ড’র সঙ্গে রুশ কপ্টারটির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে হ্যালের তৈরি কপ্টারটি ঘণ্টায় ২২০ কিমি বেগে উড়তে পারে। তা ছাড়া ৪০০ কেজি পর্যন্ত গোলা-বারুদ বহন করার ক্ষমতা রয়েছে তার। দুই ক্রু ও চার যাত্রী মিলিয়ে এতে সর্বাধিক ছ’জনের বসার জায়গা রয়েছে।
অন্য দিকে ‘প্রচণ্ড’র তুলনায় আকারে এবং ওজনে ‘কামোভ’ বেশ কিছুটা বড়। এর ওজন ৩.৬ টন। রুশ কপ্টারটির লেজের অংশে নেই কোনও রোটার বা পাখা। শুধু তা-ই নয়, এর মাথার পাখাও উল্টো দিকে ঘোরে। ঘণ্টায় ২২০ কিমি বেগে উড়তে পারে ‘কামোভ’। এক থেকে দু’জন ক্রু এবং ছয় থেকে সাত জন যাত্রী নিয়ে উড়তে পারে মস্কোর কপ্টার।
‘চিতা’ বা ‘চেতক’-এর দুর্ঘটনা এড়াতে হ্যাল নির্মিত ‘প্রচণ্ড’ কপ্টারগুলি খুব দ্রুত বহরে সামিল করা যাবে বলে আশাবাদী ছিল ফৌজ। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। এর নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হল প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে অন্যতম হল রোটার বা পাখা তৈরি এবং শব্দ ও কম্পনজনিত সমস্যা।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ‘প্রচণ্ড’তে ফরাসি সংস্থা স্যাফরনের তৈরি ‘অটোমেটিক ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম’ ব্যবহার করছে হ্যাল। কোভিড অতিমারি এবং তার পরবর্তী সময়ে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে এর সরবরাহ বন্ধ রেখেছে প্যারিস। এর জেরে সংশ্লিষ্ট কপ্টারের বহুল পরিমাণে উৎপাদন যে ব্যাহত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (২০২৫ সাল) মোট ১২টি ‘প্রচণ্ড’ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেয় হ্যাল। যদিও তার মধ্যে মাত্র ন’টি তৈরিতে সক্ষম হয় তারা। তার পরেও প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতার কারণে সেগুলি ফৌজের হাতে তুলে দিতে পারেনি এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। ২০২৬ সালের শেষ দিকে সংশ্লিষ্ট কপ্টারগুলি ফৌজের বহরে সামিল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে রুশ ‘কামোভ’ কপ্টারের উৎপাদন নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা। দিল্লি-মস্কো চুক্তির সময়ে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারে ফ্রান্সের তৈরি ‘আরিয়াস ২জি১’ নামের একটি ইঞ্জিন ব্যবহার করছিল মস্কো। ২০২২ সালে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বাধলে এর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় প্যারিস।
ফরাসি ইঞ্জিন আসা বন্ধ হলেও ‘কামোভ’-এর উৎপাদন বন্ধ করেনি রাশিয়া। কারণ, সংশ্লিষ্ট কপ্টারের জন্য ৬৫০ হর্সপাওয়ারের নতুন ইঞ্জিন রাতারাতি বানিয়ে ফেলেন মস্কোর প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। যৌথ ভাবে তৈরির সময় সেই প্রযুক্তি ভারতকে দিতে নারাজ ক্রেমলিন। এই জাঁতাকলে রুশ কপ্টারের চুক্তি আটকে থাকায় আতান্তরে পড়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
‘কামোভ’-এর জন্য তৈরি ইঞ্জিনটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, প্রয়োজনে একে ড্রোনে ব্যবহার করা যায়। সেই কারণেই ইঞ্জিনের প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে চাইছে না মস্কো। তবে সংশ্লিষ্ট চুক্তিকে এখনই ঠান্ডা ঘরে পাঠাতে নারাজ ক্রেমলিন। কারণ, যৌথ উৎপাদনের লাভ ঘরে তুলতে চাইছে তারা।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে ‘ব্রিকস’ সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফর করবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সামরিক বিশ্লেষকদের অনুমান, ওই সময় ‘কামোভ’ কপ্টার চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন করে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি কেন্দ্র।
ফলে স্থল এবং বিমানবাহিনীর কপ্টার সমস্যা যে এখনই মিটে যাচ্ছে, এমনটা নয়। আগামী আরও কয়েক মাস বুড়ো ‘চিতা’ এবং ‘চেতক’-এর সওয়ারি হতে হবে তাদের। সে ক্ষেত্রে লাদাখের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বা কোনও দুঃসংবাদ পাওয়ার আশঙ্কা বাড়ল বলেই মনে করছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।