লক্ষ্য ছিল স্ত্রীর খুনের বিচার, ২৬ বছর ধরে ভাড়া গুনেছেন রক্তমাখা শূন্য ঘরের! বিজ্ঞানের দৌলতে প্রকাশ্যে আসে অভাবনীয় সত্য
১৯৯৯ সালে জাপানের নাগোয়ার ভাড়াবাড়িতে খুন হন সাতোরু তাকাবার স্ত্রী নামিকো তাকাবা। ছিলেন না কোনও প্রত্যক্ষদর্শী। মামলাও এগোয়নি। কিন্তু হাল ছাড়েননি সাকোরু। ২০২৫-এর শেষে এসে বিচার পেলেন মৃতা।
২৬ বছর। রক্তমাখা শূন্য ঘর। আততায়ীর হাতে স্ত্রীকে হারানোর শোকে সন্তানকে নিয়ে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে আসেন। থাকা শুরু করেন অন্য একটি বাড়ি ভাড়া করে। কিন্তু যে বাড়িতে স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে সেই বাড়িও ছাড়েননি। স্ত্রীর মৃত্যুর বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে ফাঁকা বাড়িরও ভাড়া দিয়ে গিয়েছেন সাতোরু তাকাবা।
সাল ১৯৯৯। জাপানের নাগোয়ার ভাড়াবাড়িতে খুন হন সাতোরুর স্ত্রী নামিকো তাকাবা। সেই সময় বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না সাতোরু। উপস্থিত ছিল তাঁদের ছোট্ট সন্তান। কিন্তু পুলিশকে কোনও রকম ভাবে সাহায্য করতে পারেনি সেই খুদে।
আততায়ী নামিকোকে ছুরি দিয়ে ছিন্নভিন্ন করলেও তাঁর ছোট্ট সন্তানের কোনও ক্ষতি করেনি। তার গায়ে একটি আঁচড়ও দেখতে পাওয়া যায়নি। সেই বিষয়টি সাতোরুর মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছিল। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে কোনও ব্যক্তিগত কারণ। তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো পরিচিত বৃত্তের কেউ এ কাজ করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী না পাওয়ায় তদন্ত করার কোনও সূত্রই হাতে আসেনি পুলিশের। সেই সময় জাপানে ফরেন্সিক বিজ্ঞান অত উন্নত হয়নি। তাই রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষারও উপায় ছিল না। তাই নামিকোর খুনের মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়।
কিন্তু সাতোরু হার মানার পাত্র ছিলেন না। স্ত্রীকে হারানোর শোক মনে নিয়ে তিনি সন্তান-সহ বাড়ি ছাড়েন। কিন্তু ছেড়ে গিয়েও বাড়িটিকে তিনি ‘ধরে’ রাখেন।
আরও পড়ুন:
নাগোয়ার সেই ভাড়াবাড়িটিই ছিল নামিকোর খুনের একমাত্র প্রমাণ। খুনের পর তাঁদের সাজানো ঘর পরিণত হয়েছিল ইতিউতি রক্তের দাগ লেগে থাকা অপরাধস্থলে। পুলিশ থেকে সেই ঘর সিল করে দেওয়া হয়েছিল।
বাকি পাঁচজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমনটা হলে তাঁরা হয়তো সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতেন। সুরাহা পাওয়ার কোনও রাস্তা নেই ভেবে জীবনের পথে এগিয়ে যেতেন। নতুন করে সব কিছু শুরু করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সাতোরু সেই দলে ভিড়ে যাননি।
নাগোয়ার ভাড়াবাড়িটি ছেড়ে আসার পরও সাতোরু প্রতি মাসে সেই বাড়িটির ভাড়া দিতেন। মনের কোণে বিশ্বাস রেখেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীর খুনি একদিন না একদিন ঠিকই পুলিশের হাতে ধরা পড়বে। এই ঘটনার বিচার তাঁরা পাবেন।
সাতোরুর সেই বিশ্বাসই ২৬ বছর পর বাস্তবে পরিণত হয়। ২০১০ থেকে উন্নত হওয়া শুরু করে জাপানের ফরেন্সিক বিজ্ঞান। ২০২০-র পরে তা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা শুরু করে।
আরও পড়ুন:
ফরেন্সিক বিজ্ঞান উন্নত হওয়ার পর থেকে অতীতে চাপা পড়ে যাওয়া পুরনো নানা মামলার ফাইল পুনরায় খোলা শুরু করে জাপানের গোয়েন্দা বিভাগ। জোরকদমে তদন্ত শুরু করা হয়।
ধুলোজমা পুরনো ফাইলগুলির মধ্যে উঠে আসে সাতোরুর স্ত্রী নামিকোর ফাইল। পুনরায় শুরু হয় তদন্ত। আশার আলো জ্বলে ওঠে সাতোরুর মনে।
তদন্তের জন্য ছেড়ে আসা ভাড়াবাড়িতে সব কিছুই অক্ষত রাখা হয়েছিল। সেই কারণেই এত দিন ধরে ভাড়া গুনছিলেন সাতোরু। নাগোয়ার ঘরে থাকা রক্তের দাগ থেকে পায়ের ছাপ, সব কিছুই ঠিক যেমনটা ছিল, তেমনটাই রেখে চলে এসেছিলেন স্ত্রীর খুনের বিচারের আশায় থাকা সাতোরু।
সেগুলি সব কাজে লেগে যায়। সেই ঘর থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলি তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখা শুরু করেন। এর জন্য তাঁরা কয়েক দশক পুরনো জৈবিক নমুনা পরীক্ষা করা যাবে এমন কৌশল প্রয়োগ করেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাওয়া যায় এক অভাবনীয় তথ্য।
নাগোয়ার ঘরে থাকা রক্তের দাগে পাওয়া যায় এক ডিএনএ নমুনা, যা সাতোরু বা নামিকোর ডিএনএ-র সঙ্গে মিলছিল না। সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকা সকলের ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা শুরু হয়।
সাতোরুর ছোটবেলার সহপাঠী কুমিকো ইয়াসুফুকুর ডিএনএ-র সঙ্গে সেটির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে কোনও রকম আলোচনা এড়িয়ে চললেও, ২০২৫ সালে কুমিকো নিজে এসে ডিএনএ নমুনা প্রদান করেন। সাদৃশ্য পাওয়ার বিষয়টি সামনে এলে তিনি খুনের কথাও স্বীকার করে নেন।
অনেকে মনে করছেন যে, সাতোরুর প্রতি কুমিকোর মনে থাকা সুপ্ত অনুভূতি এবং নামিকোর প্রতি থাকা ঈর্ষা থেকেই তিনি এই পথ বেছে নেন। যদিও পুলিশকে দেওয়া বয়ানে কুমিকো এমন কোনও বিষয়ের উল্লেখ করেননি কুমিকো। তিনি শুধু জানান যে, নামিকো এবং সাতোরু, উভয়কেই তিনি ছোট থেকে চিনতেন।
২৬ বছরের পুরনো একটি ঘটনায় দোষীর ধরা পড়া কোনও সাধারণ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে সাতোরুর রক্তমাখা শূন্য ঘরের ভাড়া বয়ে চলার বিষয়টি অবশ্যই নজিরবিহীন। যাঁরা এত দিন সাতোরুর এই সিদ্ধান্তকে নিছক ছেলেমানুষি মনে করতেন, সত্যিটা সামনে আসার পর তাঁরাই সাতোরুকে বাহবা জানিয়েছিলেন।
অপরাধস্থল অক্ষত রেখে বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে সাতোরু এই ২৬ বছরে প্রায় এক লক্ষ ৪৫ হাজার ডলার খরচ করেছেন। কিন্তু তাঁর এই বিপুল খরচ বিফলে যায়নি। সাতোরুর বিশ্বাস জিতেছে। সাহায্য করেছে বিজ্ঞান। সময় বেশি লাগলেও তাঁর আন্তরিক ইচ্ছার যোগ্য ফল সাতোরু বিজ্ঞানের কল্যাণে পেয়ে গিয়েছেন।