Advertisement
E-Paper

দর্শক-মঞ্চ সখ্যেই বাড়ে বিজ্ঞাপন

শীতের সন্ধ্যাগুলোয় নাটক দেখা ক্রমশ একটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন মফস্সলের দর্শকেরা। সাত-দশ দিনের নাট্যমেলা কিংবা এক-দু’দিনের নাট্য সন্ধ্যা যাই হোক না কেন—মঞ্চে মজে আছে কল্যাণী থেকে কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ থেকে শান্তিপুর। কিন্তু এই নাট্য উৎসবের টাকার সংস্থান হচ্ছে কী করে?

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৪৫

শীতের সন্ধ্যাগুলোয় নাটক দেখা ক্রমশ একটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন মফস্সলের দর্শকেরা। সাত-দশ দিনের নাট্যমেলা কিংবা এক-দু’দিনের নাট্য সন্ধ্যা যাই হোক না কেন—মঞ্চে মজে আছে কল্যাণী থেকে কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ থেকে শান্তিপুর। কিন্তু এই নাট্য উৎসবের টাকার সংস্থান হচ্ছে কী করে?

উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, নাট্য সংস্থার সদস্যদের চাঁদা, দর্শকদের অনুদান, বিজ্ঞাপন, স্মরণিকা—প্রধানত এই চারটিই উৎসবের অর্থ সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র। এর সঙ্গে কোনও ক্ষেত্রে যোগ হয় সরকারি সাহায্য। তবে সব থেকে বড় কথা হল, দর্শকদের আগ্রহ। যা দেখেই এগিয়ে আসেন বেসরকারি সংস্থাগুলিও।

সেই আগ্রহ এতটাই যে, কোথাও টিকিট বিক্রি শুরুর আগের পুরো রাতটাই চাঁদোয়ার নীচে চেয়ারে বসে কাটিয়ে দিচ্ছেন নাটক পাগল দর্শক। কোথাও প্রিয় নাটকের অতিরিক্ত ‘শো’-এর জন্য দাবি। কোথাও প্রথম দিনেই নাট্যমেলার টিকিট বিক্রি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার। সকলকে নাটক দেখার সুযোগ না দিতে পেরে প্রকাশ্যে মার্জনা চাইছেন উদ্যোক্তারা। কোথাও হলে ঢুকতে না পেরে নাট্যমেলা চত্বরেই সারা সন্ধ্যে ঘোরাফেরা করে দুধের সাধ ঘোলে মেটাচ্ছেন নাটক প্রিয় মানুষ।

Advertisement

চলতি শীতে ইতিমধ্যেই নদিয়ার কল্যাণীতে কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের নাট্য উৎসব, শান্তিপুরে রঙ্গপীঠের নাট্যমেলা, রানাঘাটে অভূত নাট্যমেলা, নবদ্বীপে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমির নাট্য উৎসব শেষ হয়েছে। কৃষ্ণনগরে চলছে পরম্পরার দ্বাদশ বর্ষ নাট্যমেলা। এ ছাড়াও বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একক নাট্যসন্ধ্যা বা দু’তিন দিনের ছোট নাট্য উৎসব।

কেন এই উৎসাহ? প্রথম কথাই হল, কলকাতায় না গিয়েও সমকালীন সময়ের নামী দামি নাটক নিজের শহরে বসেই নিয়মিত দেখার সুযোগ কোনও মতেই হাত ছাড়া করতে রাজি নন মানুষ। ফলে বেশির ভাগ নাটকে উপচে
পড়া ভিড়। শো ভাঙ্গলে শীতের রাতেও বিতর্কে তেতে উঠছে হলের
সামনের চায়ের দোকান। নাটক নিয়ে চায়ের ভাঁড়ে তুফান।

বিতর্কের আর দোষ কী? নিজের শহরে বসে যদি প্রতিদিন সন্ধ্যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অশোক মুখোপাধ্যায়, বিমল চক্রবর্তী, দেবশঙ্কর হালদার, গৌতম হালদার, রজতাভ দত্ত, দেবেশ রায়চৌধুরি, কৌশিক সেন, সোহিনী সেনগুপ্ত, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, সুরঞ্জনা দাশগুপ্তদের অভিনয় দেখতে পাওয়া যায়, যদি এই সময়ের বাংলা নাটকের তা বড় তা বড় দল নিয়ম করে নবদ্বীপ কৃষ্ণনগর শান্তিপুর কল্যাণী মঞ্চ দাপাতে পারে, তা হলে নাটক নিয়ে তর্কাতর্কি বিলক্ষণ হবে।

কিন্তু তারকাখচিত এই নাট্য উৎসবের খরচের বহরও বিরাট। এর মধ্যে কিছু উৎসবে খরচের বেশির ভাগটাই সাহায্য হিসাবে আসে দিল্লির সংস্কৃতি মন্ত্রক থেকে। কিন্তু যাঁদের সেই সাহায্য মেলে না তাঁরা কী ভাবে সামাল দেন নাট্য উৎসবের এই বিপুল খরচ?

ধরা যাক কৃষ্ণনগর পরম্পরার কথা। শীতকালীন নাটকের এই ব্যস্ত মরসুমে নদিয়ার অন্যতম আকর্ষণ জেলা সদরের এই নাট্য উৎসব, যা এ বার দ্বাদশ বর্ষে পা দিল। কৃষ্ণনগর রবীন্দ্রভবন সংস্কারের জন্য গত দু’বছর পরম্পরার নাট্য উৎসব বন্ধ থাকলেও সেই ২০০২ থেকে ধারাবাহিক ভাবে জেলা সদরে এই নাট্য উৎসবের আয়োজন করে চলেছেন উদ্যোক্তারা। এবার ‘দ্বাদশে দ্বাদশ নাটকের মেলা’ শিরোনামে ৩১ ডিসেম্বর থেকে কৃষ্ণনগরে নবসাজে সজ্জিত রবীন্দ্রভবনে শুরু হয়েছে উৎসব। চলবে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ‘ফেরা’ ‘বোমা’ ‘নাচনী’ ‘আন্তিগোনে’ ‘শের আফগানের টিনের তলোয়ারের’ মতো নাটক এ বারের মেলায় মঞ্চস্থ হচ্ছে।

বছরের শেষ দিন থেকে প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে চলা এই উৎসবে নাটক দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন মানুষ। ফলে সদস্যপত্র নিয়ে হাহাকার। ৬২৫ আসনের প্রেক্ষাগৃহ কবেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাতে কি উৎসবের খরচ উঠে আসে? পরম্পরার কর্ণধার শিবনাথ ভদ্র জানিয়েছেন এবারের উৎসবে সব মিলিয়ে বাজেট প্রায় সাত লক্ষ টাকা। বলা বাহুল্য ৬২৪ আসনের কৃষ্ণনগর রবীন্দ্রভবনে টিকিটের অর্থে আর যাই হোক নাট্য উৎসব হয় না। মফস্সলে সেই অর্থে স্পনসরও নেই। তা হলে ?

শিবনাথবাবুর কথায়, ‘‘নাট্য উৎসবের জন্য আমরা কোনও অনুদান পাই না। ফলে সারা বছর ধরে আমরা আমাদের মতো করে অর্থের সংস্থান করি। অনেকটা একটা নাটক মহলা দিয়ে ঘষে মেজে তৈরি করার মতো। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে এই বিরাট অঙ্কের নাট্য উৎসব। তবে বারো বছর ধরে এক টানা চর্চার ফলে এখন অবশ্য অর্থ সংগ্রহের প্রতিটি ক্ষেত্রই স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে উঠছে। সংস্থার নানা ধরনের সদস্যদের চাঁদা, দর্শকদের অনুদান, বিজ্ঞাপন, স্মরণিকা প্রধানত এই চারটিই উৎসবের অর্থ সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র।’’

শিবনাথ ভদ্র জানিয়েছেন এখন পরম্পরার সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াইশো। এদের মধ্যে সব থেকে ছোটদের দলটি, যারা সংখ্যায় জনা কুড়ি, তারা নিজেদের হাতখরচ, টিফিনখরচ বাঁচিয়ে উৎসবের জন্য ষোল হাজার টাকা দিয়েছে। পরের গ্রুপ যারা কেউ কলেজে পড়ে কেউ চাকরি করে, তাঁরা এ বারের উৎসবের জন্য দিয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। বাকি থাকলেন সাধারণ সদস্য, যাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ হয়েছে প্রায় লাখ দুয়েক টাকা। বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ আসে প্রধানত স্মরণিকা, ফ্লেক্স, গেট ইত্যাদির মাধ্যমে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দিয়ে সহায়তা করেন। শিবনাথবাবু জানিয়েছেন, এবারের উৎসব তাঁরা খালেদ চৌধুরির নামে উৎসর্গ করেছেন। উৎসবের পরে তাঁরা খালেদ চৌধুরিকে নিয়ে একটি বিশেষ স্মরণিকা করবেন। উৎসবের ঘাটতি মেটাতে তাঁরা স্মরণিকার বিজ্ঞাপনের সাহায্য নেবেন।

শুধু তাই নয়, পরম্পরার শুভানুধ্যায়ীরা বিদেশ থেকে সাহায্য পাঠান নাটকের এই বার্ষিক মেলার জন্য। সব মিলিয়ে উঠে আসে খরচ। তবে শুরু থেকেই বিষয়টা এত সহজ ছিল না। শিবনাথবাবুরা মনে করেন, এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ২০০২ সালে পরম্পরার প্রথম বছর নাট্য উৎসবে ২২৬ জন দর্শক ছিলেন। অথচ সে বছর শোভা সেন, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিমল চক্রবর্তীর মতো নাট্য ব্যক্তিত্ব তাঁদের প্রযোজনা নিয়ে এসেছিলেন। পরের বছর দর্শক সংখ্যা কিছুটা বেড়েছিল। সেবারেও ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’, ‘খোয়াবনামার’ মতো নাটক ছিল। রুদ্রবাবুরা তো ছিলেনই। একটা সময়ে উদ্যোক্তারা ভেবে ছিলেন, হয়ত নাট্যমেলা করা আর সম্ভব হবে না।

কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ ভিড় জমিয়েছেন নাটকের মেলা প্রাঙ্গণে। নাট্য সংস্থার কর্ণধারেরা জানাচ্ছেন, আসলে এটা একটা দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া। যেখানে দর্শক এবং আয়োজক একটা বোঝাপড়ায় পৌঁছতে পারে। দর্শক জানেন, অমুক সংস্থার নাট্য উৎসব মানেই সমকালীন নাটকের সেরা কাজগুলি দেখার সুযোগ মিলবে। ফলে তারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। উৎসব সফল হয়। সেই বিশ্বাস অর্জনের কাজটি একদিনে হয় না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy