ভাল আছ? বিবিধ ভালমন্দের জটিল ছন্দে লুকিয়ে থাকে এ প্রশ্নের সদুত্তর। কিন্তু সবচেয়ে আগে আসে শরীর আর মন। যে দু’টি মিলিয়ে স্বাস্থ্য।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ‘স্বাস্থ্য’ কেমন? কেমন ছিল? এখনই বা কেমন হয়েছে? গতিক কোন দিকে?
সরকারি এবং বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন নজর এড়ায় না। শরীরের চিকিৎসার পাশাপাশি মনের চিকিৎসার প্রসার নজর কাড়ার মতো। কিন্তু এর পরেও সার্বিক ভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘স্বাস্থ্যবান’ বলার জায়গা নেই। সমস্যা অনেক। দুর্বলতাও। আরজি করের ঘটনার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন সরকারি রোগী পরিষেবার বেশ কিছু পরিকাঠামোগত সমস্যা তুলে ধরেছিল। খোদ নবান্ন তার অধিকাংশকে নীতিগত ভাবে মেনেও নিয়েছিল। ভিন্রাজ্য বা ভিন্দেশ থেকে এখানে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর দেখা মেলে ঠিকই, কিন্তু এ রাজ্যের চিকিৎসায় ভরসা রাখতে না-পেরে চেন্নাই, ভেলোর বা হায়দরাবাদে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
করমণ্ডল এক্সপ্রেস হোক বা হামসফর এক্সপ্রেস বা চেন্নাই এক্সপ্রেস— কলকাতা থেকে দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার ট্রেনগুলির টিকিট কাটতে গেলে প্রায়শই বেগ পেতে হয়। টিকিট পাওয়াই দায় হয়ে যায় মাঝে মাঝে। কারণ, রোগীদের ভিড়। সারা বছরই প্রায় একই ছবি ট্রেনগুলিতে।
কেউ চোখের চিকিৎসার জন্য যান চেন্নাই, কেউ হার্টের চিকিৎসার জন্য যান বেঙ্গালুরুতে, আবার কেউ পেটের চিকিৎসার জন্য হায়দরাবাদে। ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য অনেক রোগী মুম্বইয়েও যান। আবার যাঁরা কিছুটা বিত্তবান, সেই উচ্চবর্গের অনেকে সিঙ্গাপুরে বা অন্য কোনও ভিন্দেশে চলে যান চিকিৎসা করাতে।
আরও পড়ুন:
চিকিৎসায় ‘দাক্ষিণাত্য অভিযান’
রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু পরিষেবা? তার কি যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ আদৌ হয়েছে? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে জেলার হাসপাতালগুলিতে। আর বেসরকারি হাসপাতাল? সেখানেও রয়েছে ‘গলাকাটা’ বিলের চাপ। দুইয়ের ঠেলায় লাগাম টানা যাচ্ছে না চিকিৎসার জন্য বাঙালির ‘দাক্ষিণাত্য অভিযানে’। কম খরচে ভাল চিকিৎসা জন্য বাঙালি আজও ছুটছে ভিন্রাজ্যে।
কেন এখনও চেন্নাই, ভেলোর বা হায়দরাবাদের ছুটতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে? এর নেপথ্যে রয়েছে পরিষেবায় সুনির্দিষ্ট কিছু গাফিলতি। রয়েছে চিকিৎসকদের একাংশের মানসিকতার ফারাক। অনেকেরই অভিযোগ, ভেলোরের চিকিৎসকেরা যে ভাবে রোগী বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, খুঁটিনাটি বিষয়গুলি বুঝিয়ে দেন, তেমনটা এ রাজ্যে হয় না। পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসকদের বেশির ভাগই রোগীদের সঙ্গে কথা বলাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে মনে করেন— এমন অভিযোগও রয়েছে।
জন্ম থেকেই এক চোখে সমস্যা ভবানীপুরের বাসিন্দা স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গত ১০ বছর ধরে তিনি চেন্নাইয়ে দেখাচ্ছেন। তার আগে কলকাতায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পাঁচজন চিকিৎসককে দেখিয়েছেন। কিন্তু স্রবন্তীর কথায়, কেউ পরিষ্কার করে বলেননি এটি কী সমস্যা। সকলেই বলেছেন, এটি মারাত্মক সমস্যা। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে স্বচ্ছ ভাবে কেউ কিছু জানাননি। উল্টে তাঁদের কথা কিছুটা ভয়ই ধরিয়েছে স্রবন্তীকে। এক সময়ে চোখে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা হয়। সেটিও কী ভাবে হয়েছে, তা জানাতে পারেননি চিকিৎসক। শেষে বন্ধু এবং পরিবারের পরামর্শে চেন্নাইয়ে যান। স্রবন্তীর কথায়, “সেখানে সবচেয়ে বড় যে পার্থক্য চোখে পড়েছে তা হল, ওনারা বুঝিয়ে বলেছেন। ছোট ছোট বিষয়গুলি বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনকি লেন্স পরার সঠিক পদ্ধতিও শিখিয়ে দেন। এখন অস্ত্রোপচার হয়েছে। আগের চেয়ে ভাল আছি।”
কেন ভেলোরমুখী, খামতি কোথায়
রাজ্যে হাসপাতাল রয়েছে। সেগুলির বাহ্যিক ‘সৌন্দর্যায়নও’ হয়েছে। কিন্তু ভিন্রাজ্যে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার প্রবণতায় রাশ টানা যায়নি। ভেলোরযাত্রীদের কাছে পরিচিত স্টেশন কাটপাডি। ভেলোর ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজে (সিএমসি) যেতে এই স্টেশনে নামতে হয়। এত পরিমাণ রোগী এ রাজ্য থেকে ভেলোরে যান যে, ভেলোর সিএমসি-তে বুকিং করানোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে বালিগঞ্জের এক ঠিকানায়। রোজই সেখানে একাধিক ফোন আসে। কেন এখনও রাজ্যবাসীকে ছুটতে হয় দক্ষিণে চিকিৎসা করাতে? বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সমস্যা শুধু খরচে নয়, সমস্যা রোগীদের বিষয়ে চিকিৎসকদের মানসিকতাতেও।
স্রবন্তী যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন কলকাতায় চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়ে, তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশন (ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিকাল এস্টাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন)-এর চেয়ারম্যান তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রায় একই রকম সমস্যার কথা বলেছেন। রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখার দায়িত্ব এই কমিশনের। স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যানের কথায়, “এখানে রোগীদের কাউন্সেলিং করানো হয় না বলে অনেক অভিযোগ আসে। এখানে চিকিৎসা হচ্ছে, কিন্তু রোগীদের নিয়ে ডাক্তারবাবুদের ধারণা কিছুটা এমন— যাকে বোঝাব, তিনি কি বুঝবেন? তাঁকে কী বোঝাব? দক্ষিণ ভারতে এটি সম্পূর্ণ উল্টো। ডাক্তারবাবুরা রোগীকে এবং রোগীর পরিজনদের যথেষ্ট সময় দেন।” এই ফারাক রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষদের বোঝা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাঙালির এই ‘দাক্ষিণাত্য অভিযান’কে অবশ্য এতটা সরল ভাবে দেখতে চান না চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরী। তাঁর কথায়, “সরকারি হাসপাতালে কিছুই পরিষেবা নেই, বিষয়টা এমন নয়। সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নজরদারি দরকার। দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার বিষয়টা অনেকটাই বিপণন। এমনটাই হলে তো বিহার-ওড়িশা থেকেও লোকে দক্ষিণ ভারতে যেত। তেমন তো হচ্ছে না! তা হলে কি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিহারের চেয়েও খারাপ? তেমন তো নয়। এটা আসলে একটা মানসিকতা।” রাজ্যের স্বাস্থ্যভবনের এক প্রাক্তন কর্তার কথায়, “যে ধর্মস্থানে গিয়ে ইচ্ছাপূরণ হবে বলে মনে করে, মানুষ সেখানেই যায়। এই প্রবণতাও তেমনই। এই প্রবণতা সহজে বদলানোও যাবে না।”
আরও পড়ুন:
জেলার হাসপাতাল কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ
রাজ্য সরকার জেলায় জেলায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি করেছে। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল বলতে বোঝায় যেখানে সব ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে। কার্ডিয়োলজি, নেফ্রোলজি-সহ বিভিন্ন বিভাগ থাকবে। এবং সেখানে শুধু কাজ চালানোর মতো চিকিৎসক নয়, থাকবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও। জেলায় জেলায় তৈরি হওয়া সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালগুলি কতটা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। জেলার হাসপাতালগুলি বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু পরিষেবা কি কলকাতা কেন্দ্রিক হাসপাতালগুলির মতো? সত্যিই তেমন পরিষেবা পাওয়া গেলে তো ‘রেফার’ (অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর) কমে যেত। তা কি কমছে? সরকারি আধিকারিকেরা বলছেন, খানিকটা কমেছে তো বটেই। কিন্তু বাস্তব বলছে, এখনও জেলা থেকে কলকাতার হাসপাতালে পাঠানো রোগীর চাপ যথেষ্ট। এক স্বাস্থ্যকর্তার হিসাব অনুযায়ী, কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলির একেকটিতে ইন্ডোর, আউটডোর এবং ক্রিটিকাল কেয়ার মিলিয়ে দৈনিক শতাধিক রোগী পাঠানো হয় জেলার হাসপাতালগুলি থেকে।
তবে তাঁরা এ-ও মানছেন যে, জেলার হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে জেলাগুলিতে থেকে রোগীদের কলকাতায় পাঠানোর প্রবণতা অনেক বেশি ছিল। একটু বড় কিছু ঘটলেই কলকাতায় ‘রেফার’ করে দেওয়া হত। সেখান থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখন জেলাতেও বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে। সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রও খুলেছে জেলায় জেলায়। কিন্তু ‘রেফার-রোগ’ এখনও পুরোপুরি সারেনি। ফলে কলকাতার বিভিন্ন সরকারি উপরে চাপ এখনও রয়েছে। রয়েছে বেডের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা এসে বেড না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কলকাতার হাসপাতালের উপর চাপ
নার্সিংহোমে বা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা চিকিৎসার খরচ না চালাতে পেরে অনেক সময়েই এসএসকেএম-এর আইসিইউ বা সিসিইউ-য়ে আসতে চান। কিন্তু তাঁদের বেড পেতে সমস্যা হয়। তাঁরা যাতে বেডের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দরখাস্ত করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা চালু রয়েছে এসএসকেএম-এ। কিন্তু এক ভুক্তভোগীর কথায়, ‘‘দরখাস্ত করার কয়েক মাস পরেও এসএসকেএম থেকে ফোন আসেনি!’’ রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষাস্বাস্থ্য অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র অতীতে এসএসকেএম-এর অধিকর্তা ছিলেন। তাঁর কথায়, “আমার সময়েই এই ব্যবস্থা তৈরি করেছিলাম। সিরিয়াল নম্বর চালু করা হয়। দরখাস্তের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এখন শোনা যায় অনেকেই বেড পেতে অসুবিধা হয়। তার সঙ্গে দালালচক্রও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে শুনেছি।”
সরকারি হাসপাতালে দালালচক্র নিয়ে প্রদীপের উদ্বেগ অমূলক নয়। কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলিতে দালাল-সমস্যা দীর্ঘ দিনের। বেড পেতে গেলে দালালের শরণাপন্ন হতে হয়, এমন অভিযোগও উঠে আসে মাঝে মধ্যে। পুলিশি ধরপাক়ড়ও হয়। কিন্তু তার পর আবার সেই একই অভিযোগ উঠে আসে।
অনেকের অভিযোগ, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে ‘সুপারিশ’ ছাড়া পরিষেবা মেলে না। তাঁদের বক্তব্য, হাসপাতালগুলিতে ‘ক্যাচ পেশেন্ট’ (সুপারিশে আসা রোগী)-এর প্রবণতা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সমস্যা আগেও ছিল। বাম আমলে যাঁরা চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, সেই আমলে সরকারি হাসপাতালে ৩০ টাকায় বেড পাওয়া যেত। প্রতিটি হাসপাতালের নির্দিষ্ট সংখ্যক বেড ‘পেয়িং বেড’ হিসাবে থাকত। স্বল্প ভাড়ায় সেই ‘পেয়িং বেডের’ জন্যও সুপারিশ করতে হত। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ সে ভাবেই পরিষেবা জোগাড় করতেন। এখন সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এতে এক দিকে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ সম্পূর্ণ ভাবে বেসরকারি পরিষেবার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
রাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার জন্য ছ’টি হাসপাতাল রয়েছে। কলকাতায় রয়েছে তিনটি, জেলায় তিনটি। তার মধ্যে তুফানগঞ্জের হাসপাতালটি হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। বর্তমানে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক ওষুধ রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া মানসিক হাসপাতালের একটি অন্যতম সমস্যা ছিল, রোগী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ থাকত না। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে জনমানসে। রোগীদের বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁদের স্বাবলম্বী করতে ‘হাফওয়ে হোম’ নামক একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সরকারের তরফে। বেসরকারি সংগঠনের সঙ্গে মিলে তাঁদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা অবসাদে ভুগছেন, তাঁদের জন্য ‘টেলিমানস’ উদ্যোগ চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁদের টেলিফোনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে খামতি রয়ে গিয়েছে এখনও। ‘টেলিমানস’ উদ্যোগ চালু হলেও তা পর্যাপ্ত প্রচার পায়নি রাজ্যে। নেই মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার জন্য পৃথক জরুরি বিভাগ (সাইকায়াট্রিক ইমার্জেন্সি)। বিশেষ করে ‘প্যানিক অ্যাটাক’, আত্মহত্যার প্রবণতার মতো সমস্যাগুলির জন্য তাৎক্ষণিক পরিষেবার প্রয়োজন। সেই পরিকাঠামো এখনও রাজ্যে তৈরি হয়নি বলেই জানাচ্ছেন অধ্যাপক তথা ভারতীয় মনোবিজ্ঞান সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় সম্পাদক রঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, “পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। নীলসাদা বাড়ি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সঠিক যায়গায় সঠিক পোস্টিং হচ্ছে না।” শুধু কলকাতায় নয়, জেলাস্তরের হাসপাতালগুলিতে আরও বেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দরকার।
পরিকাঠামো বনাম পরিষেবা
তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিক্যাল কলেজগুলিতে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ২০১০-’১১ সালে শয্যাসংখ্যা ছিল ৫৮,৬৪৭। বর্তমান সরকারের প্রথম এক বছরে ৩,০০০ বেড বেড়েছিল বলে দাবি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের ২০২৪ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪০ হাজার বেড বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে চিকিৎসকের সংখ্যা। ১৪টি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে। তৈরি হয়েছে ৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। ১৩,৫০০ সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রও রয়েছে রাজ্য জুড়ে। আছে ১৫৬টি ন্যায্যমূল্যের স্বাস্থ্যপরীক্ষা কেন্দ্র এবং ১১৭টি ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মেডিক্যালে ভর্তির আসন ছিল ১,৩৫৫টি। বর্তমানে তা বেড়ে ৫,৩২৫টি হয়েছে। শুরু হয়েছে টেলিমেডিসিন পরিষেবা। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের এপ্রিলে এসএনসিইউ (স্পেশ্যাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট) ছিল মাত্র ছ’টি। ২০২৪ সালের নথি বলছে, রাজ্যে এসএনসিইউ-এর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৮৬টি। ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পে ছোটদের বিনামূল্যে হার্ট সার্জারিরও ব্যবস্থা হয়েছে। রয়েছে ‘চোখের আলো’ প্রকল্পে ছানি অপারেশন এবং চশমা বিলির ব্যবস্থাও। আগের তুলনায় এখন রাজ্যে এসএনসিইউ-এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমেছে সদ্যোজাতের মৃত্যুর হারও। পশ্চিমবঙ্গে আগে শুধু কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা ছিল। এখন কিডনি প্রতিস্থাপনও হচ্ছে। ‘বোন ব্যাঙ্ক’ থেকে হা়ড় নিয়ে তা জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ব্যয়সাপেক্ষ অস্ত্রোপচারও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে করে দেওয়া হচ্ছে। আগে বিনামূল্যের ওষুধ কম পাওয়া যেত। এখন তা বেড়েছে। এসএসকেএম হাসপাতালের সঙ্গেই ক্যানসার হাসপাতাল চালু হচ্ছে। এনআরএস হাসপাতালে উদ্বোধন হয়েছে নতুন ভবনের। ক্যানসার, স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় জরুরি এবং ব্যয়বহুল এই পরীক্ষাটি বিনাখরচে করা যায় এনআরএস-এ।
সরকারি হিসাব বলছে, পরিকাঠামো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অনেকে এ-ও বলছেন, এতে বাড়তি কৃতিত্বের কিছু নেই। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিকাঠামো বৃদ্ধি হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারি হিসাবের বিপরীতে একটি প্রশ্নও উঠে আসছে। তা হল— চিকিৎসা পরিষেবা যদি রাজ্যে এতটাই ভাল হয়, তা হলে রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে কেন? সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা কি তা হলে সকলে সমান ভাবে পাচ্ছেন না? এনআরএস হাসপাতালে রয়েছে ‘পেট সিটি স্ক্যানের’ ব্যবস্থা। রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির মধ্যে একমাত্র এখানেই এই পরিষেবা পাওয়া যায়। যে কারণে বাইরের হাসপাতাল থেকেও রোগীরা ‘পেট সিটি স্ক্যান’ করাতে আসেন এনআরএস হাসপাতালে। কিন্তু রোগীদের ‘ওয়েটিং’-এ থাকতে হয় পরীক্ষা করানোর জন্য। এই সমস্যা মেটাতে অন্য সরকারি হাসপাতালগুলিতেও এই পরিষেবা চালু হওয়া দরকার।