টালিগঞ্জের ছবির মান, ব্যবসা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে আজকাল। আসলে ব্যবসা হওয়ার জন্য তো মানুষের সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকা দরকার। সেটাই যে হারিয়ে গিয়েছে ইদানীংকালে।
তার মানে কি বাংলা ছবির ব্যাপারে দর্শকের উৎসাহ চলে গিয়েছে? এ কথা আমি অন্তত একেবারেই মানতে রাজি নই। যখন নন্দনে ৫০ টাকা, রাধা স্টুডিয়োতে ৩০ টাকায় সিনেমা দেখানো হয়েছে, তখন বেশির ভাগ শো হাউসফুল হয়েছে। তার মানে টাকা একটা বড় বিষয়। টিকিটের দাম ২৫০-৩০০ টাকায় উঠে গেলে দর্শকের সমস্যা হচ্ছে। এ তো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে!
মিনার, বিজলী, ছবিঘরের মতো হল মানুষ বোঝে। কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে সমস্যা হয়। আসলে বুঝতে হবে, মলের যে চেহারা আমরা দেখি, সেটা বড়লোকের জায়গা বলেই মনে হয়। সাদা টাইলসের মেঝেতে দাঁড়িয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব মানুষ। তাঁরা লজ্জা পান। মনে হয়, জায়গাটার সঙ্গে যেন খাপ খাওয়াতে পারছেন না। আশপাশের মানুষ যখন দামি ব্র্যান্ডের জামা পরে ঘুরে বেড়ান, তখন তার মাঝখানে নিজেকে তাঁর বেমানান মনে হয়। মল-ভীতি বাংলা ছবির বিরাট সংখ্যক দর্শককে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এতে আসলে ইন্ডাস্ট্রিরই সমস্যা হচ্ছে। তাতেই বাংলা ছবির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হচ্ছে অনেকের।
সিঙ্গল স্ক্রিন কমে যাওয়া বাংলা ছবির মারাত্মক ক্ষতি করছে। আমার সময়ে সাড়ে সাতশো সিঙ্গল স্ক্রিন হল ছিল, এখন সেটা বোধহয় ৪০টা মতো আছে। যে ছবি রাজ্যের সাধারণ মানুষ পছন্দ করেন, তা তাঁরা পাচ্ছেন না। ওঁরা ‘চতুষ্কোণ’ দেখেন না, ‘বাড়িওয়ালি’ দেখেন না। গ্রামের মানুষের জন্য ফর্মুলা ছবি চাই। এই যে জিৎ-এর ছবি এখন হিট হচ্ছে না, তার কারণ, ও যে ধরনের ছবির কাজ করত, সেই সব ছবি চলার এখন হল নেই। মাল্টিপ্লেক্সে সে ধরনের ছবি চলে না। ফলে সে সব ছবি কম হচ্ছে। অথচ, তার প্রয়োজন আছে।
ছোট ছোট হল তৈরি করতে হবে ২০০ দর্শকের মতো। ১০০ টাকার ভিতরে টিকিটের দাম রাখতে হবে। তা হলেই আবার মানুষ আসবেন। ফর্মুলা ছবিকে দূরে সরিয়ে রাখা মোটেই কাজের কথা নয়। ইন্টেলেকচুয়াল পরিচালকেরা বলেন দর্শকের রুচি বদলে গিয়েছে, তারা আর পচা ছবি দেখে না। এই করতে গিয়ে হলগুলো তুলে দিয়েছে। ফর্মুলা ছবি তৈরি করে ব্যবসা না করতে পারলে অন্য ধারার ছবি তৈরির রাস্তাও বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বলতে চাইছি যে, এমন একটা কারখানা তৈরি করতে হবে যাতে, দু’কোটি লুঙ্গি তৈরি হবে। আর তারই মাঝখানে ভাল ধুতির কারখানা করা যেতে পারে। সেখানে ১০ হাজার ধুতি তৈরি হবে। উল্টোটা হলে কারখানা উঠে যাবে। সেটাই হচ্ছে। সাধারণ লোক সাধারণ গল্প বোঝে। রূপকথা বোঝে। সেটাই সে পর্দায় দেখতে চায়। বুদ্ধির খেলার ছবি সাধারণ মানুষ নিতে পারে না।