হাঁটুর ব্যথায় কাবু এখন অনেকেই। সে বয়স ত্রিশ হোক, বা ষাট। কিছু ক্ষণ শুয়ে থাকার পর উঠতে গেলে ব্যথা, বসা থেকে দাঁড়াতে গেলে ব্যথা, সিঁড়ি ভাঙতে গেলেও টনটনিয়ে ওঠে হাঁটু। এমন সমস্যা ঘরে ঘরে। তা ছাড়া খেলতে গিয়ে আঘাত লেগে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধির যন্ত্রণা, এ সবও খুব ভোগায়। হাড়ের যে কোনও কঠিন ব্যামো সারাতে অস্ত্রোপচার ছাড়া তেমন গতি থাকে না। আর অস্ত্রোপচার মানেই কাটাছেঁড়া, রক্তক্ষরণ। হাঁটু প্রতিস্থাপন তাই আতঙ্কের। তবে এখন সে অস্ত্রোপচারেরও নতুন ধরন এসে গিয়েছে। সম্পূর্ণ নয়, হাঁটুর শুধু ক্ষয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিই অস্ত্রোপচার করে বদলে দেওয়া হবে। একে বলে আংশিক প্রতিস্থাপন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘প্রিশিসন পার্শিয়াল নি রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি’। কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে এমন চিকিৎসা হচ্ছে।
হাঁটুতে অস্ত্রোপচার আর আতঙ্কের নয়। ভয় কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ দিচ্ছেন হাসপাতালের অস্থিরোগ চিকিৎসক রঞ্জন কামিল্যা এবং চিকিৎসক সৌমেন কর। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাঁটুর যে অংশটির কোষ ক্ষয়ে যাচ্ছে বা যেটুকু অংশে লিগামেন্ট ছিঁড়েছে, শুধুমাত্র সেই জায়গাটুকুই অস্ত্রোপচার করে প্রতিস্থাপন করা হবে। আস্ত হাঁটু বদলে ফেলার ঝক্কি থাকবে না। তাই এই অস্ত্রোপচারে রোগীর যন্ত্রণা কম হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি হাঁটাচলাও শুরু করতে পারবেন।
হাঁটুর আংশিক প্রতিস্থাপনে পথ দেখাচ্ছে কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতাল।
আংশিক হাঁটু প্রতিস্থাপন নিয়ে বিশ্ব জুড়েই গবেষণা হচ্ছে। অক্সফোর্ডে এই গবেষণার সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে। এখন কলকাতাতেও সে চিকিৎসা নিয়ে এসেছে অ্যাপোলো হাসপাতাল। চিকিৎসকদের মত, সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপনের বদলে হাঁটুর আংশিক প্রতিস্থাপন হলে তার স্থায়িত্ব বেশি দিন থাকবে। অস্ত্রোপচারের ১০ বছর পরেও প্রতিস্থাপিত অংশটি প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ১৫ বছর পরে তা প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্ষম থাকবে।
হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয় মূলত অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেই। আংশিক প্রতিস্থাপন এরই এক বিকল্প ব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে একটি কৃত্রিম অংশ বা ইমপ্ল্যান্টের সাহায্যে হাঁটুর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ প্রতিস্থাপন করা হয়। সম্পূর্ণ হাঁটু প্রতিস্থাপনের তুলনায় আংশিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠা, অস্ত্রোপচারের পরে কিছু দিনের মধ্যেই চলাফেরা করতে পারা, খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও তা সুবিধাজনক। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা কম হবে। সম্পূর্ণ হাঁটু প্রতিস্থাপনে যেখানে হাঁটাচলা স্বাভাবিক হতে প্রায় মাসখানেক সময় লাগে, সেখানে আংশিক প্রতিস্থাপনে তা আরও দ্রুত হবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোগী তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
কয়েক বছর আগেও হাঁটু প্রতিস্থাপন নিয়ে নানা আশঙ্কা ছিল অনেকের মনে। ব্যয়সাপেক্ষ এই অস্ত্রোপচার যদি সফল না হয়, তা নিয়েই মূলত চিন্তায় পড়তেন রোগীর পরিজন। তবে সে ভয় কেটে গিয়েছে এখন। বছর কয়েক আগেও এত বড় অস্ত্রোপচারের জন্য এ শহরের রোগীরা পাড়ি দিতেন দক্ষিণে। কিন্তু কলকাতার কিছু হাসপাতালের সৌজন্যে এখানকার স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাতেও আমূল বদল এসেছে। ফলে ভিন্ রাজ্য, এমনকি ভিন্ দেশের রোগীরা চিকিৎসার জন্য ভিড় করছেন কলকাতায়। এ শহরে এখন হাঁটু প্রতিস্থাপনের চিকিৎসার প্রায় ৯৯ শতাংশই সফল হয়। নতুন অস্ত্রোপচারটি সেখানে আরও এক কদম এগিয়ে থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে।