‘জুমানজি: ওপেন ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার প্রমোশনের ঠিক আগের দিন অণ্ডকোষে বড়সড় মাংসপিণ্ডের উপস্থিতি টের পান হলিউড অভিনেতা ডোয়েন জনসন। মারাত্মক যন্ত্রণাও হচ্ছিল তাঁর। ধরেই নিয়েছিলেন তা ক্যানসার। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা জানান, শুক্রাণু উৎপাদনকারী থলির ঠিক বাইরে ওই মাংসপিণ্ড গজিয়েছে। সেটি বিনাইন অর্থাৎ, ক্যানসার কোষ নেই তাতে। তবে সঠিক সময়ে ধরা না পড়লে, এই টিউমারই ক্যানসারে বদলে যেতে পারত অচিরেই। যত ধরনের ক্যানসার নিয়ে আলোচনা হয়, তার মধ্যে অণ্ডকোষের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা কমই বলা চলে। ইদানীং কালে প্রস্টেট ও কোলন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। তবে জেনে রাখা ভাল, পুরুষের শুক্রাণু উৎপাদনকারী থলিতেও ক্যানসার হতে পারে এবং সেটি আরও বিপজ্জনক।
কী থেকে হয় শুক্রাশয়ের ক্যানসার?
পুরুষদের তলপেটের নীচে একটি থলির (স্ক্রোটাম) ভিতরে দুটি ডিম্বাকৃতির অঙ্গ থাকে, যাকে শুক্রাশয় বা অণ্ডকোষ বলা হয়। এখান থেকেই পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন এবং শুক্রাণু তৈরি হয়। শুক্রাশয়ের কোষগুলি কোনও কারণে যদি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখনই তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। সেখানে ক্যানসার কোষ থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে। যদি ক্যানসার কোষ তৈরি হয়, তা হলে সেটি আরও দ্রুত বিভাজিত হতে থাকে এবং প্রস্টেটেও ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
শতকরা ৯৫ ভাগ শুক্রাশয়ের ক্যানসারই শুরু হয় ‘জার্ম কোষ’ থেকে। এই কোষের কাজ হল শুক্রাণু তৈরি করা। এই কোষ আবার দু’প্রকার— সেমিনোমা যার মধ্যে ক্যানসার খুব ধীরগতিতে বাড়ে এবং ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
নন-সেমিনোমা কোষে ক্যানসার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের ক্যানসার অল্পবয়সিদের বেশি হয়। প্রথমে ক্যানসার কোষগুলি শুক্রাশয়ের ক্ষুদ্র নালির ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। এটি ক্যানসারের প্রাথমিক রূপ। ধীরে ধীরে ক্যানসার কোষগুলি শুক্রাশয় থেকে ছড়িয়ে তলপেটের পিছনের দিকের লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিগুলিতে পৌঁছয়। সেখান থেকে এই ক্যানসার যেমন পরবর্তীতে প্রস্টেটে ছড়াতে পারে, তেমনই ক্যানসার চতুর্থ পর্বে পৌঁছে গেলে রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়ে হাড়, অস্থিমজ্জা, লিভার ও ফুসফুসেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন হয়?
শুক্রাশয়ের ক্যানসার কেন হয়, তার সঠিক কারণ অজানা। এই বিষয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্র আছে। সেখানে বলা হয়েছে, জন্মের পর থেকে যদি শুক্রাশয়ের গঠনে কিছু ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা থাকে, তা হলে শুক্রাণু উৎপাদনকারী কোষগুলির বিভাজন অনিয়মিত হতে থাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সে থেকে ক্যানসার হতে পারে। আবার জিনগত কারণও রয়েছে। পরিবারে কারও থাকলে, তা থেকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সে জিন আসতে পারে।
এইচআইভি সংক্রমণ হলে তা থেকে অণ্ডকোষের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার ডাউন সিনড্রোমের মতো জিনগত রোগ থাকলে, তা থেকেও এমন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
অটোইমিউন রোগ যাঁদের থাকে, তাঁদের নানা ধরনের ওষুধ খেতে হয়। বেশ কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শরীরে টক্সিনের মাত্রা বাড়ে। সে থেকেও ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অণ্ডকোষে টিউমার জন্মালে তা যন্ত্রণাহীন হবে। তবে শুক্রাশয়ে তরল জমতে শুরু করবে। বন্ধ্যত্বের সমস্যা তো হবেই, প্রস্রাবের রংও বদলে যেতে পারে। অণ্ডকোষের আকার বাড়তে থাকবে। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে তলপেটে যন্ত্রণা শুরু হবে, যা ছড়িয়ে পড়বে পিঠ অবধি। সে সঙ্গে রোগীর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হতে থাকবে।
শুক্রাশয়ের ক্যানসার সারাতে হলে রেডিয়োথেরাপি বা কেমোথেরাপির পাশাপাশি অস্ত্রোপচারই একমাত্র উপায়। তবে ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তির একটি শুক্রাশয় বাদ দিলেও প্রজননক্ষমতা অটুট থাকে।