E-Paper

ক্লান্তি থেকে বাড়ছে অসুখ

আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে মানসিক ক্লান্তি। ক্রমাগত মানসিক চাপের প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক স্বাস্থ্যে, যার জেরে হচ্ছে কঠিন অসুখ। অতএব, মানসিক ক্লান্তি কাটানো জরুরি

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৩

মানসিক ক্লান্তি নতুন নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ ক্ষণে ক্ষণে শ্বাপদ, শত্রু বা প্রতিকূল প্রকৃতির মুখোমুখি হত। সেই সময় মানবশরীরে একটি মৌলিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা সক্রিয় হত। সেটাই ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’। এ সময়ে হরমোনের ক্ষরণ বাড়ত, পেশি কঠিন হয়ে উঠত, শরীর সতর্ক থাকত, যাতে প্রয়োজনে লড়াই করা যায় বা পালানো যায়।

আগে বিপদ আসত, চলেও যেত। বিপদ কেটে গেলে শরীরও বিশ্রাম পেত। কিন্তু বিপদের বিবর্তন হয়েছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা, সম্পর্কের জটিলতা, জীবনের প্রত্যাশা, ঘাত-প্রতিঘাত... বিপদ টের পেয়ে শরীর ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’-এর মাধ্যমে একই ধরনের জৈব প্রতিক্রিয়া দেয়। শরীর এক সময় হরমোন নিঃসরণ করে তেজিয়ান করে মানুষের জীবন বাঁচাত, আজ সেই একই প্রক্রিয়া অনেক সময়েই শরীর ও মনের উপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কারও চেহারা থেকে উধাও জৌলুস, চোখ গর্তে ঢুকে গিয়েছে, চুল উঠে যাচ্ছে। এগুলি বাহ্যিক ক্ষতি। কিন্তু লাগাতার মানসিক চাপ থেকে শরীর ও মনে নানা অসুখও জন্মায়।

শরীরে ধরে শতেক রোগ

ভয় পাওয়া, আতঙ্ক, টেনশন, কাজের চাপ, বিরক্তি— মূলত এগুলোই স্ট্রেস। সিনিয়র ফিজ়িশিয়ান ও জেরিয়াট্রিশিয়ান ডা. অরুণাংশু তালুকদারের ব্যাখ্যা, “জীবনে ঝামেলার আবির্ভাব হলে মস্তিষ্কের সঙ্কেত পেয়ে অ্যাড্রিনালিন, কর্টিজ়ল ইত্যাদি হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে। এতে মস্তিষ্ক সতেজ ও সতর্ক থাকে। তাই স্ট্রেস পরিস্থিতি অনেক ক্ষণ ধরে চললে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে, ফলে গ্লুকোজ়ের চাহিদা বাড়তে পারে। হরমোন ক্ষরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, নাড়ির গতি বেড়ে যায়। নিয়মিত বা দিনের অধিকাংশ সময় এমন হতে থাকলে, হরমোনগুলোর মাত্রা বেড়েই থাকবে, তা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। এর কুপ্রভাবে শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দেখা দেবে। রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, হার্টের রোগে দাঁড়িয়ে যাবে। রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে।”

মানসিক ক্লান্তির কারণে ঘুমও ঠিকঠাক হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে শরীর নিজের ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যার জেরে অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। হৎপিণ্ড, ফুসফুসের ক্ষতি হওয়াও সম্ভব। অনেকে বলেন, মানসিক চাপে বুক ধড়ফড় করে, কেউ বলেন শ্বাসকষ্ট হয়। ইদানীং কমবয়সিদের মধ্যে যে হৃদ্‌রোগের প্রবণতা বেড়েছে, তার অন্যতম কারণও স্ট্রেস। হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ডা.সুনীলবরণ রায়ের সতর্কবাণী, “হরমোনগুলির মাত্রা বাড়লে ধমনিতে স্প্যাজ়ম হয়। তার সঙ্গে হৃৎপিণ্ডে যে চর্বি বা ক্যালশিয়ামের আস্তরণ (প্লাক) থাকে, সেগুলি ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে হৃদ্‌রোগের ভয় থাকে।”

ডা. তালুকদারের সংযোজন, অতিরিক্ত স্ট্রেস থেকে অজ্ঞান হতেও দেখা যায়। তা ছাড়া, রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে, কোনও রোগ থাকলে তার প্রকোপও বাড়ে। মস্তিষ্কের সঙ্গে খাদ্যনালির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। ফলে বদহজম, গ্যাস্ট্রাইটিসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড-সংক্রান্ত সমস্যাও হয়। স্ট্রেসের কারণে অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে ওবেসিটি হতে পারে। আর স্ট্রেস কাটাতে বা মন ঠিক হবে মনে করে কোনও নেশার খপ্পরে পড়লে তো আরওই মুশকিল। স্ট্রেস-জনিত ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে জুড়বে মদ্যপান, ধূমপান বা অন্যান্য ভয়ঙ্কর নেশা থেকে তৈরি হওয়া নানা কঠিন রোগব্যাধি।

পর্যুদস্ত মন

হরমোনের ভারসাম্যের এমন হেরফের চলতে থাকলে তার প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যে পড়বেই। অনিদ্রা, অ্যাংজ়াইটি ডিজ়র্ডার, অবসাদ— এগুলির শিকড়ও তো সেই স্ট্রেস। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবীর মুখোপাধ্যায় বললেন, “স্ট্রেস কিন্তু কোনও ডিজ়অর্ডার বা মানসিক অসুস্থতা নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত স্ট্রেসের ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে কর্টিজ়লের প্রভাবে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ কমে (যেখানে আবেগ, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হয়), হিপোক্যাম্পাস (স্মৃতির রক্ষক) দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মেজাজের উপরে প্রভাব পড়ে, স্মরণশক্তি, একাগ্রতা নষ্ট হয়। রাগ, বিরক্তি বাড়ে। অস্থিরতা, উদ্বেগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। বার্ন আউটের সমস্যা হয়, অর্থাৎ যে কাজটাকরতে এত দিন ভালই লাগত, তাতে মন বসে না।”

ক্লান্তি শরীর ও মন দু’দিক দিয়েই যেমন ঘায়েল করে, তেমন একটি বিপর্যস্ত হলে তার অবশ্যম্ভাবী প্রভাব পড়ে অন্যটিতে। যেমন এই যে উদ্বেগ, ভীতি, সারা ক্ষণ চাপের মধ্যে থাকা— এ তো এক রকম মানসিক নির্যাতন। তার থেকে আসে অনিদ্রা, যা ক্রনিক হয়ে গেলেই প্রভাব পড়ে মেজাজে এবং শারীরিক সুস্থতাতেও। অতএব, সুস্থ থাকতে স্ট্রেস কমান। অর্থাৎ যে হরমোনগুলির মাত্রা সারাক্ষণ বেড়ে রয়েছে, অথচ কোনও শারীরিক কাজে তাদের আর প্রয়োজন হচ্ছে না, সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তা হলে উপায়?

প্রথমেই মেনে নিতে হবে, মানসিক ক্লান্তি এখন জীবনের অংশ। হাজার চাইলেও তা কমবে না। আপনাকেই নিয়ন্ত্রণের কৌশল জেনে রাখতে হবে। ডা. তালুকদার বললেন, “স্ট্রেস-জনিত সমস্যা কার ক্ষেত্রে কত দিনে কতটা প্রকট হয়ে দেখা দেবে, তা কিন্তু অনেক কিছুর উপরে নির্ভরশীল। যেমন চাপ সামলানোর ক্ষমতা, জেনেটিক গঠন, পরিবেশ, কী ভাবে বড় হয়েছে ইত্যাদি। দেখা গেল, একই পরিস্থিতিতে কেউ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভোগেন, কুঁকড়ে যান, কেউ আবার শান্ত ভাবে কাজ করে চলেন।” এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তির জীবন কিছুটা আরামের তো হবেই, শরীর-মনও তুলনায় অনেকখানি বিপন্মুক্ত থাকবে।

প্রথম ধরনের মানসিক গঠন যাঁদের, তাঁরা মুষড়ে পড়বেন না। শারীরচর্চা, ধ্যানের মাধ্যমে মনকে শান্ত করার প্রক্রিয়া, ডিপ ব্রিদিং প্রভৃতির অভ্যাস রাখুন। এতে আপনিও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছুটা শান্ত থাকতে শিখে যাবেন।

বিশেষজ্ঞের মতে, কোনও দুর্ঘটনার ফলে মানসিক ক্লান্তি-জনিত সমস্যা সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু যে বিষয়গুলি জীবনে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে সেটা চিনে নিন। জীবনযাত্রায় কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনলে উপকার হবে। মোবাইল-মগ্নতা কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালে সুফল মিলবে। নিজের পছন্দের সৃষ্টিশীল কাজ করা যায়। ডা. মুখোপাধ্যায়ের আশ্বাস, “রুটিনমাফিক খাওয়া-ঘুম, ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে বিরতি নিতে পারলেই জীবনের ছন্দ ফিরবে।” তার পরও যদি দেখেন সমস্যা কমছে না, তা হলে সাহায্য নিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের। সময়মতো সচেতনতা, অন্য কেউ যন্ত্রণায় রয়েছে বুঝলে তার প্রতি সহমর্মিতা, নিজের ও পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হলেই স্ট্রেস-জনিত রোগব্যাধিগুলি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যাবে না।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Meditation

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy