সন্তানধারণের সময়ে যেমন হবু মায়েদের ওজন বেড়ে যায়, তেমন প্রসব-পরবর্তী কালে শরীরে মেদের আধিক্য ঘটে। শারীরবৃত্তীয় নানা পরিবর্তনের কারণেই সহজে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসতে চায় না। শরীরচর্চা করার মতো ক্ষমতাও থাকে না নতুন মায়েদের। পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু এই সময়ে সদ্যোজাতটিকে স্তন্যপান করাতে হয় বলে কড়া ডায়েট মেনেও চলা যায় না। আর তাতেই বেড়ে যায় ওজন। আর সন্তানের জন্মের পর ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে অনেক মা-ই হতাশায় ভোগেন। সম্প্রতি অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টির ফিটনেস ট্রেনার জানিয়েছেন সন্তানের জন্মের পর তিনি কী ভাবে অভিনেত্রীকে মাত্র তিন মাসে প্রায় ৩৫ কেজি ওজন ঝরাতে সাহায্য করেছিলেন।
ফিটনেস ট্রেনার বিনোদ চোপড়ার মতে, সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর শিল্পা শেট্টি ওজন ঝরানোর জন্য তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে অভিনেত্রীর ওজন প্রায় ৩৫ কেজি বেড়ে গিয়েছিল। তবে তিন মাসের মধ্যেই তাঁর ওজন ঝরে গিয়েছিল। বিনোদ বলেন, ‘‘অনেকেই সে সময়ে ভেবেছিলেন, শিল্পা বুঝি কোনও অস্ত্রোপচার করিয়ে বা ওষুধ খেয়ে ওজন ঝরিয়েছিল। তবে আমরা দু’জনে মিলে তিন মাস ধরে যে পরিশ্রম করেছিলাম, তার কি কোনও দাম নেই! শিল্পা পুরোপুরি প্রাকৃতিক উপায়ে তার ওজন ঝরিয়েছিল। যাঁরা ব্যায়াম করেন, তাঁদের আর কিছুর প্রয়োজন হয় না... তাঁদের শরীর এমনিতেই দ্রুত সাড়া দেয়। আমি তাঁদের এমন কোনও জিনিস দিই না যা তাঁদের শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আমি সব সময়ে তাঁদের স্বাভাবিক ভাবেই ওজন কমানোর পরামর্শ দিই। আমি ৩০ বার ওজন কমিয়েছি এবং বাড়িয়েছি, প্রতি বারই অতীতের ভুলগুলি নতুন কিছু শিখেছি।’’
মুম্বইনিবাসী স্ত্রীরোগ চিকিৎসক রিচা ভরদ্বাজের মতে, সন্তান জন্ম দেওয়াার পর ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এক এক জন মহিলা এক এক রকম সমস্যার সম্মুখীন হন। চিকিৎসক বলেন, ‘‘জিনগত কারণ, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার আগে শারীরিক সুস্থতা, বিপাকক্রিয়া এবং যাপন—এই সব কিছুরই একটি ভূমিকা থাকে সন্তানের জন্মের পর ওজন ঝরানোর ক্ষেত্রে। প্রসব-পরবর্তী সুস্থ ওজন হ্রাসের অর্থ এই নয় যে ওজন কতটা দ্রুত কমছে। বরং এটি নির্ভর করে শরীর কতটা ভাল ভাবে সেরে উঠছে তার উপর। দ্রুত শারীরিক পরিবর্তনের চেয়ে সামগ্রিক শক্তি, শরীরে হরমোনের সঠিক ভারসাম্য এবং মানসিক সুস্থতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঠিক কত দিন পর ব্যায়াম কিংবা শরীরচর্চা শুরু করা যায়, তা নিয়ে কী বলছেন চিকিৎসক ও ফিটনেসবিদেরা? চিকিৎসক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যেমন ব্যায়াম, যোগাসন করা স্বাভাবিক, ঠিক তেমনই সন্তানের জন্মের পরেও নিয়ম করে শরীরচর্চা করা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক ভাবে প্রসব হলে প্রসবের পরের দিন থেকেই আপনি ব্যায়াম শুরু করতে পারেন। আর অস্ত্রোপচার করে প্রসব হলে সাধারণত ৬ মাস একটু সাবধানে থাকতে বলা হয়, সে ক্ষেত্রে পেটের উপর চাপ পড়ে এমন কোনও ব্যায়াম না করাই ভাল। এ ছাড়াও সাঁতার কাটা, রানিং, জগিংও করা যায়। তবে প্রথম ৬ সপ্তাহ হালকা ধরনের ব্যায়াম করাই শ্রেয়। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভীষণ জরুরি। আর ব্যায়ামের সময়ে ফিটনেসবিদের নজরদারিতে থাকত পারলে ভাল।’’
তবে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর ওজন ঝরানোর জন্য খুব বেশি তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছেন যোগ প্রশিক্ষক অনুপ আচার্য। তিনি বলেন, ‘‘‘পোস্ট নেটাল কেয়ার’ দুই থেকে তিন মাস পর থেকে শুরু করাই ভাল। এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম প্রশিক্ষকের সাহায্য নিতেই হবে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ব্যায়াম শুরুর সময় কিছু নিয়ম কিন্তু মাথায় রেখে চলতেই হবে।’’
নতুন মায়েরা ব্যায়াম করার সময়ে কী কী মাথায় রাখবেন?
১) লাম্বার রিজিয়ান ও লোয়ার ব্যাকে খুব বেশি চাপ দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম নতুন মায়েরা স্কোয়াট, প্লাঙ্কের মতো ব্যায়ামগুলি এড়িয়ে চলুন।
২) সন্তানের জন্মের পর পরই অনেক মা অবসাদে ভোগেন। তাই ওই সময়ে নিয়ম করে ‘ব্রিদিং এক্সারসাইজ়’ বা শ্বাসের ব্যায়াম করা জরুরি।
৩) এই সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বীরভদ্রাসন, বৃক্ষাসন, ভদ্রাসন, মৎস্যাসন, সেতুবন্ধাসন, উত্থান পদাসনের মতো যোগাসনগুলি দিয়ে শুরু করা উচিত।
৪) শরীরকে আগের অবস্থায় ফিরতে সময় দিতে হবে, তাড়াহুড়ো করলে চলবে না।
৫) শরীরে কোনও রকম অস্বস্তি হলেই সঙ্গে সঙ্গে শরীরচর্চা বন্ধ করে দিতে হবে। শরীরের উপর ভুলেও চাপ দেওয়া যাবে না।