হাত কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে, শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে চলেছে শীতল প্রবাহ, ঘামও হচ্ছে, মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাবেন। অনেক রোগের উপসর্গের সঙ্গে মিল পাচ্ছেন বটে, কিন্তু সম্ভবত আপনি উদ্বেগে ভুগছেন। ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর কবলে পড়েছেন আপনি। এই পরিস্থিতিতে আসলে আপনি ভয় পাচ্ছেন। তবে প্যানিক অ্যাটাক ছাড়াও আপনি দিনে অনেক বার ভয় পান। সারা দিন ভয় আচ্ছন্ন করে রাখে। মাথার মধ্যে অন্য সব অনুভূতিকে ছাপিয়ে শুধু ভয়ই তখন বিরাজ করে। কখনও কারণ থাকে, কখনও থাকে না। কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক অধিকাংশ সময়ে আতঙ্কে থাকে। কোনও খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা । আর এই অবস্থাকে বলা হয়, ‘অ্যাংসাস ব্রেন’ বা আতঙ্কে থাকা মস্তিষ্ক। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের মানসিক অস্থিরতা শুধু মনের নয়, শরীরের উপরেও প্রভাব ফেলে। তাই সময় মতো একে সামলানো জরুরি।
সারা ক্ষণ আতঙ্কে রয়েছে মস্তিষ্ক? ছবি: সংগৃহীত
এই অস্থিরতা কমাতে কিছু সহজ অভ্যাস খুবই কার্যকর হতে পারে, যা ধীরে ধীরে স্নায়ুকে শান্ত করতে সাহায্য করে—
১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা। ধীরে, গভীর ভাবে শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার অভ্যাস করলে স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে। এতে হৃৎস্পন্দন কমে এবং মনও স্থির হয়। আর তার জন্য ৪-৭-৮ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন এবং ৮ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে জোরে শ্বাস ছাড়ুন। এই চক্রটি চার বার করুন। নিজে থেকেই শান্ত হবে মন।
২. মাথার ভিতর যখন দুশ্চিন্তার ঢেউ একটার পর একটা এসে ধাক্কা দেয়, তখন নিজেকে সামলানো খুব কঠিন মনে হয়। কিন্তু কিছু সহজ অভ্যাস ধীরে ধীরে সেই অস্থিরতাকে কমাতে পারে। আর সেখানেই কাজে আসে ‘গ্রাউন্ডিং’-এর মতো কার্যকর উপায়। গ্রাউন্ডিং মানে হল নিজের মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা। খুব সহজ ভাবে, চারপাশে কী দেখছেন, কী শুনছেন বা কী ছুঁতে পারছেন— এই ইন্দ্রিয়গুলির দিকে মন দেওয়া। এতে মাথার ভিতরের ঘুরপাক খাওয়া চিন্তা একটু থামে, আর মন ধীরে ধীরে স্থির হয়।
৩. শরীরকে সক্রিয় রাখা এই ক্ষেত্রে খুব উপকারী। নিয়মিত হাঁটলে বা অল্প শরীরচর্চা করলেই মস্তিষ্কে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি হয়, যা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে এবং উদ্বেগ কমায়। ব্যায়াম করলে শরীরে এন্ডরফিন নামে একটি হরমোনের ক্ষরণ হয়, যা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, এটি স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে উদ্বেগের পরিস্থিতিতেও মস্তিষ্ক স্থিতিশীল থাকে।
৪. ঘুমের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। ঠিক মতো ঘুম না হলে মস্তিষ্ক আরও বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। তাই প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম খুব জরুরি।
৫. খাবারের প্রভাবও এখানে কম নয়। ক্যাফিন বা অতিরিক্ত চিনি অনেক সময়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এই ধরনের খাবার কমিয়ে হালকা, সুষম খাবার খাওয়াই ভাল।
৬. মোবাইল বা স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটানোও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো উচিত, যাতে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিতে পারে।
৬. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হল, নিজের অনুভূতিকে চেপে না রেখে প্রকাশ করা। কারও সঙ্গে কথা বলা, ডায়েরি লেখা বা নিজের মতো করে ভাবনা প্রকাশ করলে মনের চাপ কমে।
আরও পড়ুন:
এই সমস্যাকে অবহেলা না করে ছোট ছোট পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে শান্ত রাখা সম্ভব, আর তাতেই দৈনন্দিন জীবনের চাপ সামলানো সহজ হয়ে ওঠে।
তবে যদি উদ্বেগ দীর্ঘ দিন ধরে থাকে, তা হলে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া জরুরি। কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (সিবিটি) অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর, আর প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও খেতে হতে পারে।