E-Paper

দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা ভাল নয়

বয়স্ক মহিলাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে পড়ে দেরিতে প্রাতরাশ করা। ঘুম থেকে ওঠার পরে বারবার চায়ের অভ্যাস খিদেয় ব্যাঘাত ঘটায়। এই অভ্যাস কতটা ক্ষতিকর?

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭


সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠলেও বেলা এগারোটার আগে প্রাতরাশ করা হয়ে ওঠে না সত্তরোর্ধ্ব বন্দনার। রান্নার কাজ ও পরিচারিকাকে তদারকির ফাঁকে ফুরসত পান না প্রাতরাশের। কাজ না থাকলেও প্রাতরাশ করেন বেলা করেই। যুক্তি, তাঁর খিদে পায় না। যদিও ঘুম থেকে ওঠা ও প্রাতরাশের মধ্যে তিনি বহুবার চা পান করেন। ৬৫-র লিপিকা ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে গৃহদেবতার পুজো না করে খাবার খান না। তাঁরও প্রাতরাশ করতে প্রায় দিনই সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। এমন উদাহরণ একাধিক। কিন্তু এর পরিণতি কী হতে পারে, তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন তাঁরা?

একাধিক শারীরিক সমস্যারমূল কারণ

বহু বয়স্ক মহিলার দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে পড়ে দেরিতে প্রাতরাশ করা। ঘুম থেকে ওঠার পরে বারবার চা পান খিদে পেতেও ব্যাঘাত ঘটায়। দীর্ঘ দিনের এই অভ্যাস শরীরে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। যত বয়স বাড়ে, তা অজান্তে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে বাধা দেয়। এই প্রসঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের জেরিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান অরুণাংশু তালুকদার বললেন, ‘‘রাতে ঘুমোতে যাওয়া থেকে সকালে ঘুম থেকে ওঠার মধ্যে সাত-আট ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। ততক্ষণ খালি পেটে থাকা সমস্যার নয়। কারণ তখন ঘুমিয়ে থাকি, বিশ্রামে থাকি। ১০ ঘণ্টার বেশি না খেয়ে থাকা অভ্যাসে পরিণত হলে তা ক্ষতি করে, বিশেষত বয়স্কদের। অল্প বা মাঝবয়সি অনেকেই ওজন কমানোর জন্য নিয়ম করে উপোস করেন, সেটা চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে পড়ে। তবে তারও নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে।” অধিকাংশ বয়স্কেরই শরীরে চর্বি কম। পঞ্চাশের পরে মহিলাদের মেনোপজ়ের জন্য ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষরণ হয় না। ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যায়। এর মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে নিয়মিত খালি পেটে থাকলে পেশি তৈরি হয় না, শরীর পুষ্টি পায় না।

ডা. তালুকদার বললেন, “যে বয়স্ক মহিলারা বাড়ির কাজ করেন, তাঁদের ক্যালরি খরচ হয়। ফলে তাঁদের মাংসপেশি ভেঙে এনার্জি তৈরি হয়। এর ফলে পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। হাঁটতে, উঠতে-বসতে কষ্ট হয়। শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়। কিডনি ড্যামেজ, হার্ট ফেলিয়োর ও জলশূন্যতার মতো একাধিক সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া ঠিক সময়ে না খেলে অ্যাসিডিটি এবং গ্যাস্ট্রাইটিসের সমস্যা তো আছেই। এই সব সমস্যা যখন তাঁদের ঘিরে ধরে, তখন তাঁরা চিকিৎসকের কাছে আসেন। কিন্তু তত দিনে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়।’’

বারবার চা

“খালি পেটে দুধ-চা খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। লাল চা বা চায়ের লিকার খেতে পারেন, এতে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস থাকে। বারবার লিকার চা খেলে শরীরে জলের ঘাটতি কমে, কিন্তু ক্যালরি বা এনার্জি তৈরি হয় না,” বললেন ডা. তালুকদার।

ব্রেকফাস্টের ঠিক সময় কখন?

প্রাতরাশ দেরিতে হলে দুপুরে ও রাতের খাবারও স্বাভাবিক ভাবেই দেরিতে খাওয়া হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ কোয়েল পালচৌধুরী বললেন, “সকালে ঘুম থেকে ওঠার দু’ঘণ্টার মধ্যে প্রাতরাশ করতে হবে। যেমন, সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠলে সকাল ৯ টার মধ্যে প্রাতরাশ করতে হবে। দুপুর ও রাতের খাবারের সময় এদিক-ওদিক বা পরিমাণে কম হলে অসুবিধা নেই, কিন্তু নিয়মিত প্রাতরাশের সময় মেনে চলা জরুরি এবং প্রাতরাশের পরিমাণ সারাদিনের খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হওয়াও দরকার।” এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বাড়ির কাজ সামলাতে গিয়ে সময় পান না। আবার অনেকের খিদেও পায় না। “খিদে না পাওয়ার অন্যতম কারণ বায়োলজিক্যাল ক্লক। দেখবেন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলেও খিদে পায় না। সে সময়ে খিদে পাওয়ার কথা হরমোন জানান দেয় না। বায়োলজিক্যাল ক্লক সে ভাবে সেট হয়ে গিয়েছে। মনের সঙ্গে শরীর অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। দীর্ঘ দিন অভ্যাসের ফলে খিদে পাওয়ার হরমোন কমে যায়, লিভারের এনজ়াইম কাজ করে না,” বললেন ডা. তালুকদার। কিন্তু চাইলে এই অনিয়ম বদলে ফেলা যায়। এর একটা পদ্ধতি আছে। যিনি বেলা ১১টায় প্রাতরাশ করেন তিনি এ বার থেকে শুরু করুন পৌনে ১১টা বা সাড়ে দশটায় প্রাতরাশ করার। এর কিছু দিন পরে আরও ১৫- ২০ মিনিট এগিয়ে আনুন। এ ভাবে ধীরে ধীরে কয়েক মাসের মধ্যে ঘুম থেকে ওঠার দু’ঘণ্টার মধ্যে প্রাতরাশ করার অভ্যাস তৈরি করে ফেলা যায়। এতে শারীরিক পরিবর্তনও লক্ষ করা যাবে।

কী খাবেন, কী খাবেন না

অনেকেই আছেন যাঁরা সকালে উঠেই খাওয়া শুরু করেন লুচি-পরোটা-আলুর তরকারি বা তেলেভাজা মুড়ির মতো ভাজা খাবার দিয়ে, যা সহজপাচ্য নয়। এই সব খাবার অ্যাসিডিটির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। কোয়েল বললেন, ‘‘ছাতু বা সাবুর শরবত, মুড়ি, দই-চিড়ে ইত্যাদি খাবার দ্রুত তৈরি করে খেয়ে ফেলা যায়। একটু বেলার দিকে একটা ফল খান। সকালে উঠে চা খাওয়ার অন্তত আধ ঘণ্টা পরে প্রাতরাশ করুন বা প্রাতরাশের আধ ঘণ্টা পরে চা খাবেন। খাবারের সঙ্গে চা খাবেন না, এতে খাবারের পুষ্টি শরীর ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না। দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার পরে বা উপোসের পরে ভাজা জিনিস নয়, ভাত, রুটি, ডালিয়া, উপমা, মিলেট খিচুড়ি, ওটস জাতীয় খাবার খেতে পারেন। সকালে যেন শস্য ও প্রোটিন জাতীয় খাবার থাকে, সে দিকেও নজর দিতে হবে।”

বাড়ির অধিকাংশ বয়স্ক মহিলাই ভাবেন পরিবারের সকলে খেলে তিনি খাবেন। সুস্থ থাকতে এই ধারণার বদল আনতে হবে, কিছু খেয়ে নিয়ে কাজ করুন। বিশেষ করে যাঁরা ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওষুধ খান বা ইনসুলিন নিয়ে থাকেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ওষুধ খান, তাঁদের ঠিক সময়ে খাবার খেতেই হবে। এতে শরীর সুস্থ থাকবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Hunger Fasting

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy