E-Paper

নর্মাল ডেলিভারি না সি-সেকশন? 

তর্কের বদলে তথ্য কী বলছে দেখে নেওয়া যাক। মায়ের শরীর ও গর্ভাবস্থার উপরে নির্ভর করে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন। রইল বিশদে।

সুনীতা কোলে

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৬

Sourced by the ABP

গর্ভধারণের পর্বে প্রায়ই একটি প্রশ্ন মাথায় আসে— নর্মাল ডেলিভারি নাকি সি-সেকশন? প্রবীণদের কাছে নর্মাল ডেলিভারিই একমাত্র পথ, আবার আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেকেই সি-সেকশনকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। আত্মীয়স্বজনের অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিগত ভয়-ভরসা মিলিয়ে এই বিতর্ক আরও জটিল হয়। কিন্তু স্ত্রীরোগ চিকিৎসক অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, বাস্তবে কোন প্রসবপদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম হবে, তার উত্তর সব সময়ে এক হবে না। কারণ প্রতিটি গর্ভাবস্থা, প্রতিটি মায়ের শারীরিক পরিস্থিতি এবং শিশুর প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।

নর্মাল ডেলিভারি কী

নর্মাল বা ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি হল প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান জন্মের প্রক্রিয়া। গর্ভাবস্থার শেষে জরায়ুর স্বাভাবিক সঙ্কোচনের মাধ্যমে শিশু জন্মনালির পথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, প্রয়োজনে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ বা সহায়ক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না।

সুবিধা

স্ত্রীরোগ চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, নর্মাল ডেলিভারির অন্যতম সুবিধা হল দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যেই মা দৈনন্দিন কাজে ফিরতে পারেন। অস্ত্রোপচার না হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে এবং ভবিষ্যতে গর্ভধারণ করলে জটিলতার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম হয়। শিশুর ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি অনেক উপকারী— জন্মনালির মধ্য দিয়ে বেরোনোর সময়ে শিশুর ফুসফুস স্বাভাবিক ভাবে কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়। এই পদ্ধতিতে খরচও কম।

অসুবিধা

তবে স্ত্রীরোগ চিকিৎসক চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত বললেন, “নর্মাল ডেলিভারি মানেই যে সব সহজ বা ঝুঁকিহীন হবে তা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রসববেদনা চলার পরেও জরায়ুর মুখ পুরোপুরি না খুললে, প্রসববেদনা চলাকালীন শিশুর কষ্ট হলে আপৎকালীন সি-সেকশন করতে হয়। শিশুর অবস্থান অনুকূল না হলে বা আকার তুলনায় বড় হলে নর্মাল ডেলিভারি মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।” এ ছাড়াও কিছু সঙ্কটজনক পরিস্থিতি হতে পারে, যেমন আমবিলিকাল কর্ড বেরিয়ে আসা (প্রোল্যাপস), শিশুর মাথা বেরিয়ে এলেও কাঁধ আটকে থাকা (শোল্ডার ডিসটোসিয়া), অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। এ ছাড়া, রাতে হঠাৎ প্রসববেদনা শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনো এবং যথাযথ পরিষেবা পাওয়া সব সময়ে নিশ্চিত করা যায় না।

ডা. দাশগুপ্ত আরও জানাচ্ছেন, নর্মাল ডেলিভারি মানেই যে কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না, তা নয়। শিশু বেরিয়ে আসার সময়ে সেকেন্ড বা থার্ড ডিগ্রি টিয়ার হতে পারে। তার জন্য প্রয়োজনে এপিসিয়োটোমি বা ভ্যাজাইনাল কাট করা হয়। যেটি পরে সেলাই করে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পরে যত্নের প্রয়োজন হয়। মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থা অনুকূল হলে অবশ্যই নর্মাল ডেলিভারি করা যেতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভাল।

সি-সেকশন কী?

সি-সেকশন বা সিজারিয়ান ডেলিভারি হল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি। মায়ের পেট ও জরায়ু কেটে শিশুকে বার করে আনা হয়। এটি আগে থেকে পরিকল্পিত হতে পারে, আবার প্রসবের সময়ে হঠাৎ জটিলতা দেখা দিলে জরুরি সিদ্ধান্ত হিসেবেও সি-সেকশন করতে হতে পারে।

সুবিধা-অসুবিধা

সি-সেকশন বহু ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী বলে জানাচ্ছেন ডা. অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “শিশুর হার্টবিট কমে যাওয়া, প্লাসেন্টার সমস্যা বা প্রসব অগ্রগতিহীন হলে এই পদ্ধতিতে দ্রুত শিশুকে বার করে আনা যায়।” পূর্ব পরিকল্পনা মতো সি-সেকশন করা হলে প্রসবের অনিশ্চয়তা কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, হৃদ্‌রোগ, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া, একাধিক সি-সেকশনের ইতিহাস বা শিশুর অস্বাভাবিক অবস্থানের ক্ষেত্রে সি-সেকশন জরুরি। সি-সেকশন জটিল রোগে আক্রান্ত মায়েদের শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে দেয় না।

সি-সেকশন একটি বড় অস্ত্রোপচার। ফলে সুস্থ হতে সময় লাগে। পেটের সেলাইয়ের ব্যথা, সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকতে পারে। পরবর্তী গর্ভধারণের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ার ভয় থাকে, তখন নর্মাল ডেলিভারির সুযোগ কমে যায়। এ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বাবদ খরচও বাড়ে। তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, আপৎকালীন সি-সেকশনের চেয়ে পূর্ব পরিকল্পিত সি-সেকশন বেশি সুবিধাজনক। চিকিৎসকদের পূর্ব প্রস্তুতি ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

চিকিৎসাগত প্রয়োজন

সাম্প্রতিক কালে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনও জটিলতা না থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট ‘শুভ দিন’, ‘শুভ সময়’ বা সুবিধাজনক তারিখে পরিকল্পিত সি-সেকশন করানো। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, শুধু নির্দিষ্ট তারিখের জন্য অস্ত্রোপচার যুক্তিযুক্ত নয়, বিশেষত তা যদি সময়ের আগে হয়। গর্ভস্থ শিশু ও মা সুস্থ থাকলে কোনও ভাবেই প্রিম্যাচিয়োর ডেলিভারি করা উচিত নয়। গর্ভকাল সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুকে বার করে আনলে তার শ্বাসযন্ত্র বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত না-ও হতে পারে। ভবিষ্যতে শিশুর চোখ, ফুসফুসের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

দুই পদ্ধতির কোনওটাকে ভাল বা খারাপ বলার সুযোগ নেই। দু’টিই আধুনিক চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জরুরি বিষয় হল মা ও শিশুর নিরাপত্তা। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা প্রচলিত ধারণা নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ ও মায়ের শারীরিক অবস্থাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Normal Delivery C Section Delivery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy