E-Paper

রক্ত দেওয়া-নেওয়ার নিয়মবিধি

হঠাৎ করে রক্তের প্রয়োজন পড়লে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। জেনে নিন, রক্ত কোথা থেকে জোগাড় হবে, কারা দিতে পারবেন?

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:০৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

অসুখ, ওষুধ, ডাক্তার, হাসপাতাল নিয়ে পরামর্শদাতার অভাব নেই। কিন্তু হঠাৎ করে রক্তের প্রয়োজন পড়লে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। রক্ত কোথা থেকে জোগাড় হবে, কারা দিতে পারবেন... নানা প্রশ্ন মনে ভিড় করে।

দাতা-গ্রহীতা পাশাপাশি শয্যায় শুয়ে, একজন রক্ত দিচ্ছেন, অন্যজন সেই রক্ত গ্রহণ করছেন— ভারতীয় সিনেমার পরিচিত দৃশ্য। জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. সুবীর মণ্ডল বললেন, “এমন সিনেমাতেই হয়। আগে সে রকম ভাবে দেওয়া হলেও এখন কিন্তু সকলকে হোল ব্লাড দেওয়া হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্লাডের কমপোনেন্ট দেওয়া হয়। ধরুন, কারও কোনও অভ্যন্তরীণ কারণে শরীর থেকে রক্তক্ষয় হয়েছে, তাঁর প্লাজ়মা প্রয়োজন। রক্তের মধ্যে থাকা প্লাজ়মাটুকুই তাঁকে দেওয়া হবে। কারও ডেঙ্গি হয়ে প্লেটলেট কমে গিয়েছে, তাঁকে শুধু প্লেটলেট দেওয়া হবে। কেউ প্রবল রক্তাল্পতায় ভুগছেন, তাঁকে শুধু আরবিসি বা লোহিত রক্তকণিকা দেওয়া হবে।” চিকিৎসকদের মতে, যাঁর শুধু প্লাজ়মা প্রয়োজন তাঁকে আরবিসি, প্লেটলেট দিয়ে ওভারলোড করা অর্থহীন। এতে হার্টে চাপ পড়তে পারে। কেবলমাত্র দুর্ঘটনাজনিত কারণে অস্ত্রোপচারের সময় বা সন্তান প্রসবকালে মেয়েদের রক্তক্ষরণ হলে হোল ব্লাডের প্রয়োজন হয়।

কারা রক্ত দিতে পারবেন

১৮-৬০ বছর বয়সি নারী-পুরুষ রক্ত দিতে পারবেন। যাঁরা ৬০ বছর বয়সের মধ্যে রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের স্বাস্থ্য ভাল থাকলে ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে ৬৫ বছর অবধিও দিতে পারেন। নিয়মানুযায়ী যাঁরা ৬০ বছরের মধ্যে কোনও দিন রক্তদান করেননি, তাঁরা ৬০-এর পরে দিতে পারবেন না। বয়সের ছাড়পত্র পাওয়ার পরে বিভিন্ন মেডিক্যাল টেস্ট করে দেখা হয় যিনি রক্তদান করবেন, তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে উপযুক্ত কি না। তবে গর্ভবতী মহিলা, অ্যানিমিক, রক্তচাপ কম থাকলে এবং জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি থেকে সদ্য সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের রক্তদান করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস, বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত ইনসুলিন নেন, তাঁদেরও রক্তদান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। “এইচআইভি পজ়িটিভ থাকলে বা কোনও ব্যক্তির নিষিদ্ধ পল্লিতে যাতায়াত থাকলে এবং রেড জ়োনে বসবাসকারীর কাছ থেকেও রক্ত নেওয়া হয় না। এমনকি সেখানে রক্তদান শিবিরের আয়োজনও করা হয় না,” বললেন ডা. মণ্ডল।

অনেকেই রক্তদান করতে ইতস্তত করেন, অজানা আশঙ্কায় ভোগেন। যদিও এই ভীতি অমূলক। মেডিকেল কলেজের ইমিউনো হেমাটোলজি অ্যান্ড ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং পিপলস ব্লাড সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ডা. বিপ্লবেন্দু তালুকদার বললেন, “রক্তদানে শরীরে কোনও ক্ষতি হয় না। এক বার দেওয়ার পরে রক্তে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্লাজ়মা, ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্লেটলেট এবং ২১ দিনের মধ্যে আরবিসি তৈরি হয়ে যায়। পুরুষরা বছরে চার বার ও মহিলারা বছরে তিন বার রক্তদান করতে পারেন।”

রক্তের প্রয়োজন হলে

রক্তের প্রয়োজন হলে তা সংগ্রহ করা হয় সরকারি ও বেসরকারি ব্লাড সেন্টার থেকে। “এখন ‘ব্লাড ব্যাঙ্ক’ বলা হয় না, বলা হয় ‘ব্লাড সেন্টার’। হাসপাতালের আরএমও-র সই করা ব্লাড স্যাম্পল ও রিকুইজ়িশন দেখার পরই ব্লাড সেন্টার থেকে প্রয়োজন মতো রক্ত দেওয়া হয়। সরকারি, বেসরকারি সব সেন্টারে এক নিয়ম,” বললেন ডা. তালুকদার। সারা বছর ২৪ ঘণ্টা এই সেন্টার খোলা থাকে। এ ছাড়া রোগীর পরিবারের কোনও দাতা ইচ্ছুক থাকলে রক্ত দিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৫০টি ব্লাড সেন্টার আছে। রক্তদান শিবির ছাড়াও সারা বছর যে কোনও সময়ে ব্লাড সেন্টারে গিয়ে রক্ত দেওয়া যায়। “সেন্টারে এসে রক্ত দিতে চাইলে দাতার কয়েকটা শারীরিক পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং করা হয়। রক্তদান শিবিরেও ডাক্তার থাকেন, যিনি দাতার রক্তচাপ পরীক্ষা করেন, উচ্চতা-ওজন দেখেন। সব কিছু দেখেই তাঁকে রক্ত দেওয়ার জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়।” শিবিরের জমা হওয়া রক্ত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা হয়। সে ক্ষেত্রে রক্তে কোনও সমস্যা পাওয়া গেলে সেই রক্ত বাতিল করা হয় এবং দাতাকে জানানো হয়। ব্লাড সেন্টারে রক্ত সংরক্ষণের আগে যে টেস্ট করা হয় সেটা স্ক্রিনিং টেস্ট, কনফার্মেটরি নয়, তাই রক্ত দেওয়ার পর সেন্টার থেকে ফোন গেলে ভয় পাবেন না, বরং কোনও সমস্যা থাকলে তা জানতে পারবেন। ল্যাবরেটরিতেই হোল ব্লাড থেকে কমপোনেন্টগুলি আলাদা করা হয়। তার পরে উপযুক্ত ভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এই পৃথকীকরণ ও সংরক্ষণ করতে যে ব্যয় হয় সেই অর্থটাই রক্ত নেওয়ার সময়ে দিতে হয়।

অনেক সময়েই অভিযোগ ওঠে, ব্লাড সেন্টারে রক্ত থাকা সত্ত্বেও তা দেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে ডা. তালুকদার বললেন, “রক্ত ৩৫ থেকে ৪২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তাই রক্ত জমিয়ে রাখার সুযোগ নেই। অনেক সময় রক্তের ঘাটতি হয়।” ২৩ বা ২৬ জানুয়ারির মতো বিশেষ দিনগুলিতে শহরে, গ্রামে একাধিক রক্তদান শিবির হয়। সেই তুলনায় দেখা যায় গরমে কম শিবির হয়। “১৫ অগস্ট বেশ কিছু শিবির হয় বটে, কিন্তু সে সময়ের রক্ত তো শীত আসা পর্যন্ত রাখা যাবে না! তাই যাঁরা শিবির পরিচালনা করেন তাঁরা যদি বছরের বিভিন্ন সময়ে করেন, তা হলে রক্তের আকাল হয় না,” বললেন ডা. তালুকদার।

রক্ত জীবন দান করে। অন্যের উপকার করায় যে আত্মতৃপ্তি লাভ হয়, তার মূল্যও কম নয়। তাই ভয়, দ্বিধা কাটিয়ে সামাজিক কর্তব্যের খাতিরে এই কাজে এগিয়ে আসা উচিত এবং এ নিয়ে সচেতনতার প্রচারও জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Blood Donation

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy