নতুন ধরনের যাপন থেকেই তৈরি হচ্ছে হার্টের রোগের ঝুঁকি। অনেকের ধারণা, কেবল বড়সড় ঘটনা বা অভ্যাসই হার্টের ক্ষতি করে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, রোজ যে বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, সেটিই আপনার ক্ষতি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই বিপদের বীজ তৈরি হয় দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস থেকে। আর সেটি হল, অতিরিক্ত ব্যস্ততা। অর্থাৎ সারা ক্ষণ সতর্ক থাকা, নিজেকে বিশ্রাম না দেওয়ার মতো অভ্যাসই এই অঙ্গটির শত্রু।
মেডিসিনের চিকিৎসক অভিজ্ঞান মাঝির মতে, বিশেষ করে রাত জাগা, দীর্ঘ দিনের মানসিক চাপ এবং তাড়াহুড়োর কারণে কোনও মতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা— এমন বিষয়গুলিই এখন হৃদ্রোগের বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে আসছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও অনিয়মের কারণে এই অভ্যাসগুলি অনেকের জীবনেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু শরীরের ভিতরে এগুলি ধীরে ধীরে এমন পরিবর্তন ঘটায়, যা শেষ পর্যন্ত হার্টের উপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
হার্টের রোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
এই অভ্যাসগুলি কী ভাবে ক্ষতি করছে শরীরের?
রাত জাগা ও কম ঘুমের প্রভাব
গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা বা পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দকে বিঘ্নিত করে। এই ছন্দকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। ঘুম, হরমোন ক্ষরণ, হজম ও বিপাকের মতো নানা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম কমে গেলে বা অনিয়মিত হলে নানা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। সিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ বেড়ে যেতে পারে। আর তার ফলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে এবং শরীরে গ্লুকোজ়ের বিপাক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। এর ফলে রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং হার্টের উপর বাড়তি চাপ পড়ে।
দীর্ঘ দিনের মানসিক চাপ
অবিরাম মানসিক চাপও হার্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ দিন ধরে চাপের মধ্যে থাকলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন, যেমন কর্টিসল ও ক্যাটেকোলামিনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলি রক্তচাপ বাড়াতে পারে, ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্সও বাড়াতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতাও বাড়াতে পারে। ফলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া
ব্যস্ত জীবনে খাওয়ার সময় থাকে না অনেকের। ফলে এমন কিছু খাবারের তাঁরা নির্ভর করেন, যা খেতে সময় লাগে না বা যাতায়াতের পথে খাওয়া যায়। এ ধরনের খাবারের মধ্যে প্রায়শই বেশি ক্যালোরি, নুন ও প্রক্রিয়াজাত উপাদান থাকে। এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসের ফলে শরীরে চর্বির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, ওজন বাড়তে পারে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যদি রাতের দিকে এই ধরনের খাবার বেশি খাওয়া হয়, তা হলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত হয়। এতে হজমেরও সমস্যা হয়।
এই তিনটি অভ্যাস, অর্থাৎ কম ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস যদি একসঙ্গে থাকে, তা হলে এর মিলিত প্রভাব শরীরে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে, যেখানে ধমনীতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে এবং পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। আর তাই চিকিৎসকের পরামর্শ, শুধু ওষুধের উপর নির্ভর করলেই চলবে না। নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং সুষম খাবার খাওয়া, এই তিনটি অভ্যাস ঠিক রাখতেই হবে।