বনের মধ্যে বাল্মীকির আশ্রমে স্ত্রী সীতাকে রেখে অযোধ্যায় ফিরে গিয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। শকুন্তলাকে বিয়ে করে বনেই রেখে গিয়েছিলেন দুষ্মন্ত। স্ত্রীকে বনে ফেলে আসার কাহিনি ভারতীয় পুরাণ থেকে লোককথায় ভর্তি। তারই ছায়া ফিরে এল অস্ট্রিয়ার এক ঘটনায়। আর তৈরি হল নতুন ট্রেন্ড। বিচ্ছেদের পন্থা। তারই নাম দেওয়া হল ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’।
ডিভোর্স লেগেছে বনে বনে
অস্ট্রিয়ার ঘটনার আগেই এই নামকরণ হয়ে গিয়েছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে স্কটিশ লেখক রবার্ট বার একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন ‘অ্যান অ্যালপাইন ডিভোর্স’ নামে। যেখানে আল্পস পর্বতমালায় হেঁটে উঠছিলেন স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু পাহাড়ের খাদ থেকে স্ত্রীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল স্বামীর। শেষমেশ স্ত্রী নিজেই খাদ থেকে ঝাঁপ মারেন। সেই গল্প থেকেই এই শব্দটির উত্থান হয়। তার পর অস্ট্রিয়ার এই ঘটনা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস। অস্ট্রিয়ার উচ্চতম পর্বত গ্রসগ্লক্না্রে আরোহণের চেষ্টা করছিলেন এক যুগল। কিন্তু সফল হননি। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ থেকে আর ১৬৪ ফুট দূরে ছিলেন প্রেমিকা। এ দিকে অন্ধকার নেমে আসে। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যেতে শুরু করে। পরে প্রেমিকার মৃতদেহ খাদের ধারে উল্টো এবং ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে প্রেমিকের দাবি, তিনি সাহায্যের জন্য নীচে নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে মহিলার মৃত্যুর জন্য প্রেমিককে গ্রেফতার করা হয়। এ ভাবেই একে একে আলাদা হতে থাকছেন যুগল থেকে দম্পতি। আর প্রেক্ষাপট? সেই বন, জঙ্গল, অরণ্য।
এটি আসলে এক ধরনের আচরণ, যেখানে একজন ইচ্ছাকৃত ভাবে সঙ্গীকে নির্জন বা বিপজ্জনক জায়গায় ফেলে চলে যান। কোনও দম্পতি বা যুগল পাহাড়ে হাঁটতে বেরিয়ে, ট্রেকিংয়ে গিয়ে, ক্যাম্পিং করলে বা বাইরে অভিযানে গেলে সঙ্গীকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ছেড়ে যান। এতে অন্য ব্যক্তি একা পড়ে যান এবং অনেক সময়ে বিপদের মুখেও পড়তে পারেন। সম্পর্ক ভাঙার একটি চরম উপায় হিসাবে দেখেন অনেকে। কেউ আবার কখনও অসতর্কতা বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ থেকেও এমন ঘটনা ঘটান বলে মনে করা হয়। যা-ই হোক, এর পর বিচ্ছেদ তো পাকা বটেই!
এই ধরনের গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরতে শুরু করেছেন সমাজমাধ্যমে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মহিলাদেরই ভিডিয়ো করতে দেখা যাচ্ছে। যেখানে তাঁরা অন্য মহিলাদের সাহস জোগাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গীরা যদি বনে ফেলে যান, তা হলে কেমন ভাবে নিজেদের বাঁচানো উচিত, সে সব নিয়ে পরামর্শ দিতে দেখা যাচ্ছে নানা দিকে। পশ্চিমি দেশগুলিতে ইতিমধ্যে সাপোর্ট গ্রুপও তৈরি হয়ে গিয়েছে। কারণ, এমন ঘটনার সংখ্যাও নাকি সে সব দেশে বেড়ে গিয়েছে! তার উপরে দেখা যাচ্ছে, এই ট্রেন্ড নাকি মূলত পুরুষ-নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেই বেশি হচ্ছে। দুই নারীর সম্পর্ক, দুই পুরুষের সম্পর্ক, অথবা প্রান্তিক লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও এমন উদাহরণ শোনা যায়নি। আর তাতে প্রশ্ন উঠছে, পুরুষ-নারীর সম্পর্ক কি এতটাই ভয়ঙ্কর?
আরও পড়ুন:
এ ভাবেও ছেড়ে আসা যায়
বিচ্ছেদ তো নানা ভাবেই হয়। কখনও ঝগড়া করে করে, কখনও কথা না বলতে বলতে, কখনও বা কিছু না জানিয়েও ছেড়ে আসা যায়। কিন্তু প্রেক্ষাপট কখনও বাড়ি, কখনও অচেনা শহর, কখনও হোটেল বা রেস্তরাঁ বা নিছক রাস্তা। এই তালিকার অন্ত খোঁজা কঠিন। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে বনে ছেড়ে আসার এই ট্রেন্ড পশ্চিমে একান্তই ‘নতুন’ বলে দাবি অনেকের। এমন বিচ্ছেদ তো পুরাণেও কথিত আছে। কেবল ভারত কেন, খুঁজলে হয়তো একাধিক দেশের ইতিহাসেই এমন ঘটনা মিলবে। পশ্চিমের লোককাহিনিতেও স্ত্রী/ প্রেমিকা/ সন্তানকে বনে ছেড়ে আসার উদাহরণ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আজকের দিনেও কি ভাবা যায় যে, এ ভাবেও ছেড়ে আসা যায়? এত নিষ্ঠুর পদ্ধতিতেও?
কেন চলে গেলে দূরে
এই ‘কেন’-র প্রশ্ন খুঁজতে গেলে সেই সঙ্গীদের মনের ভিতরে প্রবেশ করা দরকার। আর নানা দিকে এই বিষয়ে কথা শুরু হওয়ার পর এর নেপথ্য কারণ সন্ধানের চেষ্টা চলেছে। তার থেকে যা যা উত্তর মিলেছে, তা বেশ অস্বস্তিকর। সেই সঙ্গীদের উদ্দেশ্য কেবল, পালানো। সম্পর্ক থেকে। আর সেই কাজটি ‘সুষ্ঠু’ ভাবে সম্পন্ন করতে জঙ্গল বা দুর্গম জায়গাকে বেছে নেন তাঁরা। এর ফলে মুখোমুখি বসে সঙ্গীর চোখের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছেদের কথা বলতে হবে না। কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। কোনও গভীর কথোপকথনের অংশ হতে হবে না। দেখা যাচ্ছে যে, প্রায় সর্বত্রই কোনও পুরুষ তাঁর সঙ্গিনীকে বেকায়দায় ফেলেছেন। তা হলে কি এটা পুরষতন্ত্রের হাতে এক অস্ত্র বিশেষ, যার দ্বারা এক সময়ে 'অধিকৃত' নারীকে পরিত্যাগ করা যায়?
আবার একই সঙ্গে কখনও কখনও যিনি কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন, তাঁর কাছে উত্তরও প্রস্তুত থাকে। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়লে ফেলে আসা সঙ্গীকে দোষারোপও করেন তাঁরা। এটি মানসিক নির্যাতনের একটি রূপও হতে পারে। যাকে আড়াল করতে তিনি যে কোনও রকম অজুহাত খাড়া করতে পারেন। এতে পরিত্যক্ত সঙ্গীর মানসিক আঘাত আরও বাড়তে পারে।