ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশ মানে কি শুধুই ভুলে যাওয়া? শুরুটা কিন্তু সকলের একরকম হয় না। মনোবিদেরা বলেন, ডিমেনশিয়া হল বিশাল একটা ছাতার মতো। এর নীচে আশ্রয় নেয় মনের আরও অনেক অসুখ। কোনওটা ভুলে যাওয়ার রোগ, কোনও ক্ষেত্রে আচরণে হঠাৎ বদল, কারও আবার প্রচণ্ড আগ্রাসী মনোভাব। এমন অসুখকে বেঁধে রাখতে পারে পরিবারের মানুষের সেবা, যত্ন, শুশ্রূষাই। রোগীর প্রাত্যহিক জীবনের মান বাড়ানো, তাঁকে যথাযথ সম্মান, সঙ্গ এবং সেবা দিলেই তাঁর ভাল থাকা বা আরোগ্যের পথ অনেকখানি প্রশস্ত হয়।
স্মৃতিনাশ বা বিস্মরণ রোগ সারা বিশ্বব্যাপী এক বিরাট সমস্যা। যখন শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি ধীরে ধীরে অচল হতে থাকে তখন এমনিতেই অসহায় বোধ হয়, কিন্তু যখন মাথাটিও ধীরে ধীরে তার কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করে এবং অবশেষে কাছের মানুষকে চেনার ক্ষমতাও হারিয়ে যায়, তখন সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। 'জার্নাল অফ ইকোনমিক লিটারেচার'-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছিল, পঁয়ষট্টি-ঊর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তির স্মৃতিহীনতা রোগটি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। মহিলাদের এই ব্যাধির সম্ভাবনা পুরুষদের থেকে দুই-তৃতীয়াংশ কম। এ দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ এবং আমেরিকার জন্স হপকিন্স মেডিসিনের তথ্যও জানাচ্ছে, ভুলে যাওয়ার রোগ ইদানীং কালে অনেকটাই বেশি। বয়স্কদের এই রোগ ধরা পড়লে তাঁরা অনেক বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ, জীবননির্বাহ ক্রমশ জটিল হয়েছে। সন্তান কাজের জন্য বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে দূরদূরান্তে পাড়ি দিচ্ছেন। অনেকে বাবা-মায়ের কাছে থেকেও তাঁদের দেখাশোনা করতে আগ্রহী নন। অথচ গবেষণা বলছে, এমন রোগে ওষুধের চেয়ে সেবাই বেশি জরুরি।
আরও পড়ুন:
কেমন হবে দেখাশোনার ধরন?
এক জন সুস্থ মানুষ হঠাৎ সব খুঁটিনাটি ভুলতে শুরু করছেন, ভুলে গিয়েছেন কেমন করে খাবারের গ্রাসটা তুলে মুখ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়, নিজের ঘরের চেনা পথও ভুলে গিয়েছেন, এমন অবস্থায় সবচেয়ে আগে জরুরি ধৈর্য ধরে শান্ত ও নরম স্বরে কথা বলা। চেঁচামেচি করলে বা বিরক্তি প্রকাশ করলে, এমন রোগীদের স্নায়বিক জটিলতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
জটিল নির্দেশ না দিয়ে সহজ ও ছোট বাক্যে কথা বলুন। এমন ভাবে বলুন, যাতে বুঝতে সুবিধা হয়।
স্নায়ুর রোগ মস্তিষ্কের স্মৃতির পাতা ধূসর করে দিতে থাকে। তাই মস্তিষ্ককে সচল রাখা জরুরি। সে কারণে রোগীকে যোগব্যায়াম করানো বা ছোট ছোট কাজের মধ্যে রাখতে হবে। যেমন, শব্দছক খেলানো, ধাঁধাঁর সমাধান বার করতে বলা, সুদোকু খেলা, ছবি আঁকা বা বই পড়ার মতো কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে।
প্রতি দিন একই সময়ে খাবার দেওয়া, স্নান করানো বা ঘুমের অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
সৃজনশীল কিছু কাজে নিযুক্ত রাখার চেষ্টা করুন। যেমন, গাছের পরিচর্যা, জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, বাড়িতে খুদে সদস্য থাকলে তাকে গল্প বলার মতো কাজে ব্যস্ত রাখুন তাঁদের। এতে মন ভাল থাকবে।
যে ঘরে বয়স্কেরা রয়েছেন, সেই ঘরটি সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে ঘরে যেন এমন জিনিসপত্র না থাকে, যা থেকে তাঁদের ক্ষতি হতে পারে।
সব সময়ে তাঁদের পকেটে এমন কার্ড দিয়ে রাখুন, যাতে আপনার বা পরিবারের কারও নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লেখা থাকবে।
বিকেলের দিকে হাঁটাহাঁটি করানো বা হালকা ব্যায়াম করালে তাঁরা শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকবেন। চেষ্টা করতে হবে রোজ এই অভ্যাস তৈরি করার।
অকারণ সন্দেহ, আপনজনেদের শত্রু মনে করা, আগ্রাসী মনোভাবও ডিমেনশিয়ার পূর্বলক্ষণ হতে পারে। তাই সে ক্ষেত্রে সব সময়েই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।