রান্নাবান্নার ঝক্কি নেই, গ্যাসের দরকার নেই, গরমে তেতে-পুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁশেল ঠেলতে হবে না, অথচ রোজই বাড়ির খাবার খাবেন, তা-ও নিজের হাতে তৈরি করে। ভাবছেন, তা কী করে সম্ভব? আপনার ভাবতে অসুবিধা হলেও, যাঁরা ‘র ফুড ডায়েট’ বা কাঁচা খাবারের ডায়েট মানেন, তাঁদের জীবন কিন্তু এমনই।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রান্নার গ্যাস নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। দামও বেড়েছে কিছুটা। দাম আরও বাড়তে পারে, তেমনটাও শোনা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি রান্নার ঝক্কি, গ্যাস খরচ বাঁচিয়ে খাওয়া-দাওয়া করা যেত, মন্দ হত না— এমনটাই মনে হচ্ছে কি? তবে মনে রাখতে হবে, এই ডায়েটে কিন্তু সেদ্ধ খাবারও পাতে রাখার নিয়ম নেই। ভাত-ডাল, রুটি, কোনওটিই খেতে পাবেন না। শাকসব্জি, ফলমূল, বীজ, বাদাম, কাঁচা দুধে আপত্তি না থাকলেও, আগুন জ্বালিয়ে কোনও কিছুই রান্না করা চলবে না।
মেদ ঝরাতে, সহজে ঘুম আনতে, মজবুত পেশিবহুল শরীর পেতে, হজমশক্তি বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে আলাদা আলাদা ডায়েট আছে। গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলেও কিছু ডায়েট তৈরি হয়েছে, যেমন কিটো ডায়েট, ড্যাশ ডায়েট, মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং। তারই মধ্যে একটি হল ‘র ফুড ডায়েট’। এই দেশে জনপ্রিয় ডায়েটের তালিকায় তা না থাকলেও, বিশ্বের অনেক দেশেই তা মানেন অনেকেই।
আরও পড়ুন:
পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক বলছেন, ‘‘কাঁচা সব্জি খাওয়ার বেশ কিছু উপকারিতা রয়েছে। গবেষণা বলছে, এই ডায়েট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও কমায়। তবে লম্বা সময় ধরে ডায়েটটি কেউ অনুসরণ করলে ভিটামিন বি ১২-এর অভাব হতে পারে শরীরে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় সাপ্লিমেন্টের। তা ছাড়া, এই ডায়েট সকলের জন্য নয়।’’
ডায়েটের মূল কথা
এই ডায়েটের মূল কথাই হল কাঁচা খাবার খাওয়া। ডায়েটের সিংহভাগ জুড়েই থাকবে সব্জি, ফলমূল, বাদাম, বীজ, কাঁচা অপ্রক্রিয়াজত দুধ। থাকতে পারে ফারমেন্টেড বা মজানো খাবার। তবে কোনও খাবারই রান্না করা যাবে না। সেই কারণে, এই খাবার তালিকায় পনির, টোফুও রাখা চলে না। এই ডায়েটের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দেওয়া। রান্না হয় না বলেই, সব্জির পুষ্টিগুণ আরও ভাল ভাবে মেলে এতে। ভিগান থেকে নিরামিষভোজি শুধু নয়, আমিষাশীরাও এই ডায়েট মানতে পারেন। কাঁচা ডিম (নির্দিষ্ট কায়দায়), মাছও (সুসির মতো খাবার) তালিকায় রাখা হয় কোনও কোনও দেশে।
কাদের জন্য প্রযোজ্য ডায়েটটি
সুস্থ এবং প্রাপ্তবয়স্কেরা এই ডায়েট অনুসরণ করতে পারেন। শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বার করতে, বিপাকক্রিয়া সচল রাখতে, খাদ্যতালিকায় ফাইবার মাত্রা বৃদ্ধিতে এই ডায়েট সহায়ক। তা ছাড়া, স্থূলত্বের মতো সমস্যা, মেটাবলিক সিন্ড্রোম (যা টাইপ ২ ডায়াবিটিস, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে) কমাতেও সাহায্য করে কাঁচা খাবার খাওয়ার অভ্যাস। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টের মাত্রা বৃদ্ধি করতে চাইলেও তা তালিকায় যুক্ত করা যায়।
পুষ্টিবিদ শম্পা চক্রবর্তী মনে করাচ্ছেন, ‘‘কাঁচা খাবারের ডায়েট সুস্থ কেউ শুরু করলেও, দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। যেহেতু ভাত, ডাল বা রান্না করা কোনও খাবারই খাওয়া যায় না, তা ছাড়া, প্রাণিজ খাবার বাদ পড়ে, তাই লম্বা সময় ধরে চালিয়ে গেলে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। অল্প কয়েক দিনের জন্য শর্ত মেনে অবশ্য এই ডায়েট করা যেতে পারে।’’
বাদের তালিকায় কারা
শিশু এবং কিশোর-কিশোরী, যারা বেড়ে ওঠার পর্যায়ে রয়েছে
অন্তঃসত্ত্বা মহিলা
বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন যাঁরা
কিডনি বা হজমজনিত সমস্যা থাকলে
বিএমআই বা বিপাকহার কম যাঁদের
অপুষ্টিতে ভুগছেন যাঁরা
থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে যাঁদের
ডায়েটের লক্ষ্য কী, কেন এই নিয়ে চর্চা
ওজন কমানো, হার্ট ভাল রাখা, অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে এবং খাবারের পুষ্টিগুণ বেশি মাত্রায় পেতে অনেকে এমন ডায়েট বেছে নেন। এই ডায়েটে ফাইবার, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ, কার্বোহাইড্রেট, সবটাই মেলে। চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী বলছেন, ‘‘ভিটামিন সি, বি কমপ্লেক্স জলে দ্রবীভূত হয়। ফলে সব্জি সেদ্ধ বা রান্নার সময় এই ভিটামিনের মাত্রা কমে যায় অনেকটাই। কাঁচা সব্জিতে পুষ্টিগুণ বেশি মেলে। তা ছাড়া, সব্জিতে কিছু প্রাকৃতিক উৎসচেক থাকে, উচ্চ তাপেও সেগুলি নষ্ট হতে পারে। তাই কাঁচা সব্জি ডায়েটে রাখা যেতেই পারে। লিভার, কিডনি বা পেটের অসুখ থাকলে, এমন ডায়েট করা ঠিক নয়। তবে সুস্থ যে কেউ (অন্তঃসত্ত্বা, শিশু, বেশি বয়স্ক ছাড়া) কাঁচা সব্জি, বাদাম, ফলমূল খেয়ে ডায়েট করতেই পারেন।’’
কী ভাবে শুরু করা যায় এই ডায়েট, তালিকায় কী থাকবে
টাটকা ফল
কাঁচা সব্জি ( কচি পালং, বাঁধাকপি, গাজর, বিট, শাঁকালু, মুলো ইত্যাদি )
বাদাম এবং বীজ ( রোস্ট করা নয়)
অঙ্কুরিত ছোলা, বাদাম, মুগ, মটর, কাবলি ছোলা, রাজমা
মজানো খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন কিমচি,সাওয়ারক্রাউট (কুচোনো বাঁধাকপি দিয়ে তৈরি)
কোল্ড প্রেস অয়েল
কাঁচা ডিম, মাছ (তালিকায় থাকে ডায়েটের শর্ত মেনে)
পুষ্টিবিদ শম্পা বলছেন, ‘‘কাঁচা সব্জি উপকারী হলেও এটি খাওয়ার নিয়ম আছে। সব্জিগুলি খুব ভাল করে ধুয়ে না নিলে সমস্যা হতে পারে। সব্জি ভাপানো হলে ব্যাক্টেরিয়া, জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কাঁচা সব্জি ভাল করে না ধুলে পেটের সমস্যা হতেই পারে। ভাল হয় গাজর, বিটের মতো সব্জিগুলি হালকা গরম জলে ধুয়ে নিতে পারলে। তা ছাড়া, কাঁচা ডিম খাওয়াও স্বাস্থ্যকর নয়। কাঁচা মাছ, এ দেশের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যায় না।’’
সুবিধা কোথায়
ময়দা, চিনি, নুন যুক্ত খাবার বাদ পড়ে। পরিশোধিত তেল, চা-কফি হিসাব মাফিক কোনওটি খাওয়া যায় না। প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো যায়, যা খুব একটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা কী বলছে
কাঁচা শাকসব্জি বা কাঁচা খাবার কী ভাবে শরীরে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে নানা সময়ে। ২০০৫ সালে জার্মানির ‘র ফুড স্টাডিজ়’ জার্নাল বলছে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে ডায়েটটি সাহায্য করে। তবে একই সঙ্গে এই ডায়েটের ফলে বিএমআই বা বিপাকহার কমতে পারে। ৩৮শতাংশ মহিলার ঋতুস্রাবও অনিয়মিত হয়েছে এই ডায়েট অনুসরণ করে। আবার ‘জার্নাল অফ নিউট্রিশন’-এর একটি পরীক্ষাভিত্তিক ফলে দেখা গিয়েছে, এমন ডায়েট ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারয়েড— দুই এর মাত্রাই কমাতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে এর ফলে ভিটামিন বি১২ এর মাত্রাও কমতে পারে। সেটি এই ডায়েটের খামতি।
হার্ভার্ডের একটি গবেষণা লব্ধ ফলে প্রকাশ পেয়েছ, সেদ্ধ বা রান্না করা খাবার কিছু কিছু পুষ্টিশোষণে সাহায্য করে। যেমন ক্যারোটিনয়েড। তা ছাড়া, রান্না করা খাবার প্রোটিন এবং স্টার্চ পরিপাকে সহায়ক, যা কাঁচা সব্জির ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ ছাড়াও, বিভিন্ন গবেষণা এবং পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে এই ডায়েটে থাকলে ভিটামিন ডি, আয়রন, ক্যালশিয়াম, জ়িঙ্ক, ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের ঘাটতি হতে পারে।
তা হলে কি এই ডায়েট করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে
কাঁচা খাবার খেয়ে দিনের পর দিন কাটানো যায় কি না, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রশ্ন, এ দেশে এমন ডায়েট কতটা প্রাসঙ্গিক? অনন্যা বলছেন, ‘‘ডায়েটের বিষয়টি অনেক সময় ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছা, খাদ্যাভ্যাসের উপরও নির্ভর করে। কারও শরীর, সমস্যা এবং খাবারের চাহিদা বুঝে পুষ্টিবিদেরা খাদ্যতালিকা তৈরি করে দেন। আমার কাছে এক বার একজন এমন একটি ডায়েটের উপর খাদ্যতালিকা চেয়েছিলেন। তবে সচরাচর পুরোপুরি কাঁচা খাবারের উপর কাউকে নির্ভর করতে বলা হয় না।’’
কাঁচা খাবার খাওয়ার অভ্যাস ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে যে একেবারেই আনকোরা বা নতুন, তা কিন্তু নয়। বরং উপোসের দিনে ফল, ছোলা-মটর ভিজিয়ে খাওয়া, সাবুমাখা খাওয়ার চল বহু দিনের। চিকিৎসক সুবর্ণ মনে করাচ্ছেন, অনেকেই মূল খাবারে স্যালাড খান। কাঁচা সব্জির রস, যেমন লাউ, পালং, বিট, গাজর, করলা, উচ্ছের রসও দীর্ঘ দিন ধরেই খাওয়া হয়। তবে এক ধাক্কায় অনেকটা সব্জি খেলে কারও কারও হজম সমস্যা হতেই পারে। অনেকেরই মাত্রাতিরিক্ত ফাইবার সহ্য না-ও হতে পারে। আবার কাঁচা সব্জির সমস্ত ভিটামিন শরীর সমান ভাবে শোষণ করতে পারে, তেমনটাও নয়।
পুষ্টিবিদ অনন্যা, শম্পা বা সুবর্ণ— তিন জনের মতেই, দিনভর পুরোপুরি কাঁচা খাবারের কড়া ডায়েট না মেনেও কেউ অন্য ভাবে বিষয়টি দেখতে পারেন। কাঁচা সব্জি, ফল, বাদামের উপকারিতা পেতে দৈনন্দিন খাবার তালিকায় একটু বেশি পরিমাণে কাঁচা খাবার রাখা যায়। তাতে হজমের সমস্যা হবে না, পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকিও কমবে। খাবারে বৈচিত্রও থাকবে। এক বেলা কাঁচা খাবার খেলে হেঁশেলের ঝক্কি যেমন কমবে, শরীর ভাল থাকবে, তেমনই এই বাজারে রান্নার গ্যাসের সাশ্রয়ও হবে।