ব্যাক্টেরিয়ার নাম শুনলেই আতঙ্ক হয়। মনে হয়, এই বুঝি কোনও জটিল রোগ হানা দিল। রোগজীবাণু থেকে শতহস্ত দূরে থাকারই চেষ্টা করেন সকলে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই ব্যাক্টেরিয়া দিয়েই মারণ রোগ বিনাশের চেষ্টা করছেন। বিষয়টা অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতোই। মারাত্মক সংক্রামক কোনও ব্যাক্টেরিয়াকে শরীরে সেঁধিয়ে দেওয়া হবে এমন ভাবে, যাতে সে সুস্থ কোষগুলির দিকে ফিরেও না চায়। সটান গিয়ে আক্রমণ করে টিউমার কোষগুলিকে। তার পর একে একে ধ্বংস করতে থাকবে সেগুলিকে। এমন জাঁদরেল ব্যাক্টেরিয়াকে মানুষের শরীরের উপযোগী করে তৈরি করে ফেলেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলু-র গবেষকেরা। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরাও এই গবেষণায় সহযোগিতা করেছেন।
ক্যানসার নিরাময়ের হাতিয়ার ব্যাক্টেরিয়া!
ক্যানসার মানেই যন্ত্রণাদায়ক কেমোথেরাপি। আর তার ফলে দেখা দেয় নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কেমোথেরাপির বদলে কী ভাবে ক্যানসারের চিকিৎসা করা যায়, সে নিয়েই বিশ্ব জুড়ে গবেষণা চলছে। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, ইমিউনোথেরাপির নানা ওষুধ নিয়ে গবেষণাও চলছে। ক্যানসারের টিকা আনার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা। তার মধ্যেই কাজ চলছে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস নিয়েও। শরীরে ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাস ঢুকিয়ে রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে সক্রিয় করে মারণরোগ সারানোই হল উদ্দেশ্য। কিন্তু কাজটা অতটা সহজ নয়। কারণ ব্যাক্টেরিয়া কাজ করবে নিজের মর্জি মাফিক। তাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলটা আগে আয়ত্ত করা জরুরি। গবেষকেরা নানা রকম ব্যাক্টেরিয়াকে দেখেশুনে ক্লস্ট্রিডিয়াম স্পোরোজেনেস নামের এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এরা মাটিতে জন্মায় এবং অক্সিজেন নেই, এমন জায়গায় বংশবিস্তার করে। গবেষকেরা দেখেছেন, এই ব্যাক্টেরিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ সহজ। কী ভাবে?
প্রথমে ব্যাক্টেরিয়াগুলিকে সংগ্রহ করে তাদের গবেষণাগারে রেখেই পরীক্ষা করা হয়েছে দিনের পর দিন। তার পর জিনগত প্রযুক্তিতে তাদের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতাকে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সেই সব ব্যাক্টেরিয়াগুলিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরীরের ঢুকিয়ে দিয়ে দেখা গিয়েছে, তারা পথ চিনে ঠিক ক্যানসার কোষের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে। কী ভাবে তারা পথ চিনবে, তারও এক উপায় বার করেছেন গবেষকেরা। এর জন্য ক্লস্ট্রিডিয়ামের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েছেন তাঁরা। এই ব্যাক্টেরিয়ার স্বভাবই হল অক্সিজেনবিহীন জায়গা খুঁজে নেওয়া। ক্যানসার কোষের বাড়বৃদ্ধি যেখানে হচ্ছে, সেখানে কোষে কোষে অক্সিজেন সরবরাহ হয় না। যে কারণেই কোষের মৃত্যু ঘটতে থাকে। ক্লস্ট্রিডিয়াম ব্যাক্টেরিয়া শরীরের ঢুকলে ঠিক সেই কোষের কাছাকাছি জায়গাই খুঁজে নেবে। তার পর গবেষকদের ঠিক করে দেওয়া পদ্ধতিতে ক্যানসার কোষের ভিতরেই বংশবৃদ্ধি করতে থাকবে। তাার ফলে কোষগুলি ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে, অনিয়মিত বিভাজনও বন্ধ হয়ে যাবে। সহজ করে বললে, ব্যাক্টেরিয়া ক্যানসার কোষগুলিকেই আত্মসাৎ করে ফেলবে।
ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে ক্যানসারের পরীক্ষা পশুর শরীরে হয়েছে। মানুষের শরীরে তার প্রয়োগ শুরু করার অপেক্ষামাত্র। যদি এই প্রক্রিয়া নিরাপদে হতে পারে, তা হলে আগামী দিনে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যাক্টেরিয়াকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া সহজ হবে বলে আশা রাখছেন গবেষকেরা।