হাম, রুবেলা, মাম্পসের মতো রোগের ফের বাড়াবাড়ি শুরু হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে হাম রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। কোভিডের কারণে টিকাকরণ অনেক জায়গাতেই পিছিয়ে গিয়েছিল। ফলে ফের এই সব রোগের প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছে বিশ্বের নানা দেশে। আক্রান্ত পাঁচ বছরের নীচে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা। মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। তাই হাম, পক্স থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।
ঋতু পরিবর্তনের সময় হাম, রুবেলা ও মাম্পসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। তবে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এখন এই সব রোগ হওয়ারও কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন-তখন হানা দিচ্ছে এই সব ভাইরাসঘটিত রোগ। এ দেশে শীতের সময়ে ও বসন্ত শুরু হওয়ার আগে হাম, পক্সের প্রকোপ বাড়ে। তবে যেহেতু এখন বিশ্বের নানা দেশেই হামের প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই সময় থাকতেই সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। এই বিষয়ে সংক্রামক রোগ বিষয়ক চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদারের মত, এখানে হাম বা পক্সের তেমন মারাত্মক প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। তবে জলবায়ু বদলের কারণে আবহাওয়া খামখেয়ালি, তার উপরে বাতাসে ভাসমান দূষিত কণা, বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। ভাইরাসও তার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই সতর্ক হতে হবে।
কী ভাবে ছড়ায় হাম, পক্স?
সংক্রামক ব্যক্তির হাঁচি এবং কাশি থেকে ছড়ায় এই রোগ। রোগীর সংস্পর্শে এলেও অনেকে রোগের শিকার হতে পারেন। আবার রোগীর নাক বা গলা থেকে নিঃসৃত তরলের সংস্পর্শে এলেও রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হামের প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর। সঙ্গে সর্দি, হাঁচি, চোখ লাল হওয়া, কিছু ক্ষেত্রে চোখের পাতা ফুলে যাওয়া, চোখ দিয়ে জল পড়া, কাশি, গলার স্বর বসে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দু’-তিন দিন থাকে। মুখের ভিতরে দানা দানা ভাব দেখা দেয় এবং আস্তে আস্তে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
পক্স হয় ভ্যারিসেলা জস্টার নামক ভাইরাসের সংক্রমণে। রোগটি খুব কষ্টদায়ক। জ্বর ঘন ঘন আসতে থাকে, সারা শরীর ফোস্কায় ভরে যায়। এই রোগের স্থায়িত্ব সাত থেকে পনেরো দিন হতে পারে। র্যাশ বেশি বেরোয় মুখে এবং ঘাড়ের উপরের অংশে। পাঁচ থেকে ছ’দিন পরে র্যাশ শুকোতে থাকে। র্যাশ বেরনোর পরে গড়পরতা ১৪ দিন পর্যন্ত সেগুলি সংক্রামক থাকে। হাম বা পক্স ছড়িয়ে পড়লে মহামারীর আকার নিতে পারে। ঘটতে পারে মৃত্যুও। বিশেষ করে কমবয়সি, অপুষ্টির শিকার শিশুদের ভয় বেশি। সাধারণত চিকেন পক্স বা হাম শুরুর ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত এই রোগের ভাইরাস অন্যের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
এই রোগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু হয় নানা শারীরিক জটিলতার কারণে। গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে পাঁচ বছরের নীচে শিশু ও কমবয়সিদের। কারও দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হতে পারে, কেউ এনসেফ্যালাইটিসের আক্রান্ত হন। হতে পারে মারাত্মক ধরনের ডায়েরিয়া। আর সেই কারণে শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কারও কানে সংক্রমণ হয়। কেউ শ্বাসযন্ত্রের প্রবল সংক্রমণে ভোগেন। নিউমোনিয়াও হতে পারে।
সতর্ক থাকার উপায় কী?
১) প্রথমত ঠান্ডা লাগানো যাবে না কোনওভাবেই। শিশুদের ভাল করে গরম পোশাক পরিয়ে রাখতে হবে। বাইরে বেরোলে মুখে মাস্ক পরা অবশ্যক।
২) এই সময় খাবার তালিকায় সজনে ডাটা, সজনে ফুল, সজনে শাক ও নিমপাতা খেলে ভাল হয়।
৩) এই ঋতুতে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত হয় শিশুরা। কোওন শিশুর কাশি হয়, কারও বা রাত্রে ঘুমোবার সময় নাক বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে কাশির ফলে সারা রাত ঘুমাতে পারে না। বুকে সর্দি জমেছে মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
৪) শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাসে হামের টিকা দেওয়া জরুরি। তবে টিকা দিলেও তা পুরোপুরি সফল না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ় নিয়ে রাখার পরামর্শও দেন চিকিৎসকেরা।
৫) শিশুর জ্বর হলে ও গায়ে ছোট ছোট ফোস্কা বেরোতে শুরু করলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধ আছে। র্যাশ বের হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োগ করলে অনেক কম র্যাশ বের হয়। জ্বালা, যন্ত্রণা থেকে উপশম পাওয়া যায়।
৬) রোগে আক্রান্ত হলে জল বেশি করে খেতে হবে। জল ফুটিয়ে খাওয়াই ভালো। এসময় হজমশক্তি কমে যায়। তাই সহজপাচ্য খাবার খেলে পেটের সমস্যা হয় না। ফল খেলে দূর্বলতা অনেকটাই কমে যায়। খাবারে সাধারণত কোনও বিধি নিষেধ নেই। তবে ফার্স্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড বা বাইরের কোনও খাবার খাওয়া যাবে না।