E-Paper

যে ওষুধ বন্ধ করবেন না

এমন কিছু রোগ আছে যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজীবন বা দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খেতে হয়,তা বন্ধ করলে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৯

জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় অসুস্থতা। চিকিৎসার পরেও সব রোগ পিছু হটে না! এমন কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ আছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় সারা জীবন ধরে ওষুধ খেয়ে যেতে হয়।

প্রথম সারিতে যারা

এই ক্রনিক ডিজ়িজ়ের প্রথম সারিতে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাই কোলেস্টেরল, থাইরয়েড এবং বেশ কিছু স্নায়ুরোগ ও ত্বকের সমস্যা আছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বললেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুনীলবরণ রায়, “অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপে হার্ট, আর্টারি, কিডনির ক্ষতি হয়। মস্তিষ্ক ও চোখে স্ট্রোক হতে পারে। এই সব কারণে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাজীবন ওষুধ খেতে হয়। পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে সেই পরিবারের সদস্যদের কম বয়স থেকেই সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে কম বয়স থেকেই দীর্ঘ দিন ওষুধ খেতে হতে পারে রক্তচাপ, শর্করা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে। আবার যাঁদের শৈশবে রিউম্যাটিক ফিভারের জন্য ভালভে ক্ষতি হয়েছে তাঁদের ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে একটা করে ইঞ্জেকশন নিয়ে যেতে হয়।” ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি লাইফস্টাইল ডিজ়িজ়। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, কম দৈহিক পরিশ্রম, ওজন বৃদ্ধি, অনিদ্রা, নেশা, দুশ্চিন্তা এই রোগগুলির অন্যতম কারণ।

“এই রোগগুলির ওষুধ যে কোনও দিন বন্ধ করা যাবে না, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে জীবনযাত্রার মান, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে ওষুধ বন্ধ করা গিয়েছে বা ওষুধের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া গিয়েছে। এদের মধ্যে অবশ্য যাদের টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিস (জন্মগত), তাদের সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে,” বললেন মেডিক্যাল কলেজের জেরিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান ডা. অরুণাংশু তালুকদার।

স্নায়ুরোগের ক্ষেত্রে ক্রনিক অসুখের সংখ্যা বেশ বেশি, যেখানে ওষুধ একবার শুরু করলে আজীবন খেয়ে যেতে হয়। নিউরোলজিস্ট ও স্ট্রোক স্পেশ্যালিস্ট ডা. জয়ন্ত রায় সে রকম বেশ কয়েকটি রোগের বিষয়ে বললেন, “কারও যদি ইসকেমিক স্ট্রোক হয়, তা হলে পুনরায় স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে সারা জীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। পারকিনসন’স, ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ক্ষেত্রেও তাই। কয়েক ধরনের মৃগী রোগের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি এড়াতে বাকি জীবন ওষুধ খেতে হবে। পরিস্থিতি বুঝে ওষুধের ডোজ় বাড়ে-কমে।”

ত্বক

ত্বকের এমন কিছু রোগ আছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কখনও তিন-ছ’বছর আবার কখনও ১৫-২০ বছর ধরে ওষুধ খেয়ে যেতে হয়! ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. সন্দীপন ধর বললেন, “সোরিয়াসিস, এগজ়িমা, শ্বেতি, অ্যালোপেশিয়া ইত্যাদি জিনগত রোগে চিরতরে আরোগ্য পাওয়া যায় না। ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অনেক সময়ে ওষুধ বন্ধ করে দেখা যায় রোগী ভাল আছেন। কিন্তু জোর দিয়ে বলা যায় না, একদম সেরে গিয়েছে। রোগ ফিরেও আসতে পারে। তখন আবার চিকিৎসা শুরু করতে হবে।”

স্ত্রীরোগ

গাইনিকলজিক্যাল সমস্যাতেও, কখনও টানা পাঁচ বছর, কখনও বা টানা আট-দশ বছরের জন্য ওষুধ খেতে হতে পারে। “এর উদাহরণ এন্ডোমেট্রিয়োসিস। এই রোগ যাতে ভবিষ্যতে বড় আকার ধারণ না করে এবং প্রজনন ক্ষমতার ক্ষতি না হয়, সেই জন্য হরমোনাল ওষুধ দীর্ঘ দিন ধরে খেতে হতে পারে। অনেক সময়ে মেনোপজ়ের পরে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করা হয়। তখন পাঁচ-ছ’বছর টানা ওষুধ খেতে হয়,” বললেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত। যাঁদের মেনোরেজিয়া বা ঋতুকালীন সময়ে অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাঁদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য হরমোনাল ওষুধ দেওয়া হয়, যা নিয়মিত খেতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে নন-হরমোনাল ওষুধও দেওয়া হয় যা প্রত্যেক মাসে পিরিয়ডসের আগে খেতে হয়।

পুরুষদের তুলনায় মহিলারা অস্টিয়োপোরোসিস, অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসের সম্মুখীন হন বেশি। বিশেষ করে মেনোপজ়ের পরে। অর্থোপেডিক ডা. সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসের জন্য কোনও দীর্ঘকালীন ওষুধ নেই, সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয় যাতে প্রদাহ, ব্যথা কমানো যায়। অস্টিয়োপোরোসিসের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য একাধিক ওষুধ, ইঞ্জেকশন আছে, যা রোগীর অবস্থা বুঝে দীর্ঘ দিন ধরে দেওয়া হয়।” রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস হলেও অনেক দিন ধরে ওষুধ খেতে হয়।

নাক-কান-গলা ও চোখ

নাক-কান-গলার ক্ষেত্রে মূলত অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘকালীন ওষুধ দেওয়া হয়। তবে দেখা গিয়েছে একই ধরনের ওষুধ টানা ব্যবহার করলে শরীরে সেটির প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা. অর্জুন দাশগুপ্ত ন্যাজ়াল স্প্রে-র কথা উল্লেখ করলেন। অনেক দিন ধরে এই স্প্রে বা ড্রপ ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে। “দীর্ঘ দিন ব্যবহারে রেজিস্ট্যান্ট আসে, তখন কিছু দিন ওই স্প্রে বন্ধ করা হয় বা অন্য মলিকিউলের অ্যান্টি-অ্যালার্জি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক সময়ে সার্জারি বা ইমিউনোথেরাপি করে সমাধানের সুযোগ থাকে। যেমন সাইনোসাইটিসের ক্ষেত্রে।”

চোখে গ্লকোমার মতো সমস্যায় আইড্রপ দিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শুভ্রাংশু সেনগুপ্ত বললেন, ‘‘গ্লকোমা-য় সারা জীবন আইড্রপ দিয়ে যেতে হবে। এ ছাড়া বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন থাকলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জাতীয় ওষুধ দীর্ঘ সময়ের জন্য দেওয়া হয়।” এখন ছোট-বড় প্রায় সকলেরই স্ক্রিনটাইম বেড়ে গিয়েছে, যার ফল ড্রাই আইজ়। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যবহারের জন্য লুব্রিকেটেড আইড্রপের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

ক্যানসার

রোগীকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খেতে হয়। “বিশেষ করে হরমোন পজ়িটিভ ক্যানসারে। যেমন, চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেক সময়ে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে হরমোনাল থেরাপি করতে হয়, এর জন্য দীর্ঘ দিন ওষুধ খেতে হয়। আবার থাইরয়েড ক্যানসারে থাইরয়েড গ্রন্থি বাদ গেলে ওষুধ দিয়ে হরমোনের কাজ স্বাভাবিক রাখতে যায়। এর জন্য ওষুধ খেয়ে যেতে হবে,” বললেন ক্যানসার শল্যচিকিৎসক ডা. গৌতম মুখোপাধ্যায়।

ছোটদের

ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা খুব ছোট বয়স থেকেই শুরু হতে পারে। “যে সব বাচ্চার ডায়াবিটিস (টাইপ-ওয়ান) থাকে, তাদের আজীবন ইনসুলিন নিয়ে যেতে হয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ত নেওয়ার পাশাপাশি ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। কয়েক প্রকার থাইরয়েড, মৃগী, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, টিবি ও হার্টের সমস্যায় ছোট থেকে ওষুধ খেয়ে যেতে হয়,” বললেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রভাসপ্রসূন গিরি।

ফলোআপ জরুরি

ওষুধ খাওয়ার ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা জানা যায় পরীক্ষার মাধ্যমে। এ ছাড়া অধিকাংশ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সে জন্য দীর্ঘ দিন ধরে ওষুধ খেলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ফলোআপ করা জরুরি। চিকিৎসকেরা যে কারণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর লিভার ফাংশন টেস্ট করতে দেন। “ওষুধ দেওয়ার সময়ে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে চিকিৎসকদের ভাবতে হয় ‘রিস্ক-বেনিফিট রেশিয়ো’। এমন একটা ওষুধ দিতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যতটা সম্ভব কম হবে। ওষুধ খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে এবং তা হলে রোগী যাতে চিকিৎসকের কাছে যান সেটাও তাঁকে বোঝাতে হবে,” বললেন ডা. জয়ন্ত রায়।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও তার মোকাবিলায় ডা. ধর বললেন, “সব ওষুধ লিভারে গিয়ে মেটাবলাইজ়়ড হয়। বিশেষ করে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দীর্ঘ দিন ধরে খেলে লিভারে এনজ়াইম বেড়ে যায়। তখন হয়তো কয়েক মাসের বিরতি দিয়ে ফের ওষুধ চালু করা হয়। তাই ফলোআপ জরুরি।”

অনেকেই আছেন যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খাচ্ছেন কিন্তু নিয়মিত ফলোআপে অনীহা! আবার কেউ কখনও নিজের মতো করে ওষুধের ডোজ় বাড়িয়ে-কমিয়ে নেন বা মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। চিকিৎসকেরা এ ব্যাপারে সতর্ক করছেন। ওষুধের ডোজ় বাড়ানো-কমানো বা বন্ধ করা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচিত নয়। আর এ সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর মেডিক্যাল টেস্ট করানো জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

medicines

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy