সন্তানের স্কুলের টিফিন গোছানোর সময়ে, অনেক মা-ই টিফিন বক্সে খাবারের সঙ্গে জুড়ে দেন টেট্রাপ্যাকবন্দি তরল পানীয়, যার গায়ে লেখা ওআরএস! টিফিনের সঙ্গে ওআরএস দেওয়ার যুক্তি, গ্রীষ্মের দুপুরে স্কুলে তাঁর সন্তান খেলাধুলোর পরে যেন ঘেমেনেয়ে ঝিমিয়ে না পড়ে। দ্রুত চনমনে করতে পারে টেট্রাপ্যাকের পানীয়। অন্তত বিজ্ঞাপন তাই বলে। শুধু মায়েরা নন, বয়স্করাও অনেকে পথে বা কাজের ফাঁকে ঘর্মাক্ত হয়ে একটু দুর্বল বোধ করলেই এই ধরনের পানীয়ে ভরসা করেন।
অথচ এই টেট্রাপ্যাক বন্দি ওআরএস বিক্রির বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে দীর্ঘ দিন প্রচার চালিয়ে, আইনি লড়াইয়ে সম্প্রতি জয়ী হয়েছেন হায়দরাবাদের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শিবরঞ্জিনী সন্তোষ। তিনি নজরে আনেন, এই পানীয়গুলোর সঙ্গে ওআরএস অর্থাৎ ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশনের কোনও সম্পর্ক নেই। প্যাকেটে ফুড সেফটি আন্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া-র অনুমোদন থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়র্ল্ড হেলথ অরগানাইজ়েশনের (হু) অনুমোদন নেই। এই পানীয়গুলোয় নিয়মের তুলনায় ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি চিনি থাকায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরের উন্নতি হওয়ার চেয়ে অবনতি বেশি হচ্ছে।
টেট্রাপ্যাকবন্দি তরল পানীয় প্রসঙ্গে জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. সুবীর মণ্ডল বললেন, “হু অনুমোদিত ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস জলে গুলে রাখা যায় ছ’ঘণ্টার জন্য। টেট্রাপ্যাকের ওআরএস পানীয়গুলোয় ন’মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ব্যবহার করার তারিখ উল্লেখ করা থাকে। তার মানে তাতে প্রিজ়ারভেটিভ থাকে, যা শরীরের পক্ষে কখনওই ভাল নয়।” এখন অবশ্য নড়েচড়ে বসেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী হু-র অনুমোদন ছাড়া কোনও খাদ্যপণ্যের নামকরণে ওআরএস শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি এই ধরনের সমস্ত পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ এসেছে। কিন্তু এ নিয়ে আইনি জটিলতা এখনও চলছে। তবে সরকারি পদক্ষেপের চেয়েও জরুরি সাধারণ মানুষের সচেতনতা। অধিকাংশই জানেন না ওআরএস কী এবং কোন পরিস্থিতিতে তা ব্যবহার করা যায়।
ওআরএস আসলে কী
দেহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া অতিরিক্ত জল ও খনিজ লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার হয় ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন। এর মধ্যে থাকে সোডিয়াম ক্লোরাইড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম সাইট্রেট, ডেক্সট্রোজ অ্যানহাইড্রাস (চিনি)। এই বিষয়ে ডা. সুবীর মণ্ডল বললেন, “ওআরএস নরম পানীয় নয়, এটা ওষুধ। ডিহাইড্রেশন, মানে শরীরে জল কমে গেলে এবং ডাইসেলেক্ট্রোলাইটেমিয়া মানেশরীরে প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট অর্থাৎ পটাশিয়াম, সোডিয়ামের ভারসাম্য ব্যাহত হলে ওআরএস দেওয়া হয়।”
কী করে বোঝা যাবে ডিহাইড্রেশন হয়েছে?
জলশূন্যতার প্রধান লক্ষণ প্রস্রাব না হওয়া। ডায়রিয়া হলে বারবার লুজ় মোশন হবে। প্রতিবার মলত্যাগের সময়ে প্রস্রাবও হয়। যদি দেখা যায় তা হচ্ছে না, তার মানে ডিহাইড্রেশন শুরু হয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া পেশিতে টান, শারীরিক দুর্বলতা, মাথা যন্ত্রণা, ঝিমুনি, চোখ খুলতে অসুবিধা, ঠোঁট সাদা হয়ে শুকিয়ে যাওয়া, ঘাম না হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।
“যদি প্রত্যেক বার স্টুল পাস করার সময়ে ইউরিন পাস করে, তার মানে ডিহাইড্রেশন নেই। সে ক্ষেত্রে শারীরিক দুবর্লতা কাটাতে জল, ডাবের জল, লেবু চিনির শরবত, ডাল সিদ্ধ জল কার্যকর। তবে এই সময় শুধু তরল খাবার খেলে হবে না, বাড়িতে তৈরি হালকা খাবারও খেতে হবে। শক্ত খাবার না খেলে মল শক্ত হতে পারবে না,” বললেন ডা. মণ্ডল। ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ না থাকলে ওআরএস-এর প্রয়োজন নেই। যদি কোনও ব্যক্তির ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তা হলে তাঁকে প্রাথমিক ভাবে ওআরএস দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ শরীরের সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ভারসাম্য ব্যহত হল কি না, তা দেখা প্রয়োজন।
ওআরএস খাওয়ার নিয়ম
হু অনুমোদিত ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস জলে গুলে সলিউশন তৈরি করতে হয়। তার পর সেই পানীয় বারবার অল্প করে চুমুক দিয়ে খেতে হয়। কতটা জলে কতটা ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস মেশাতে হবে তা হু অনুমোদিত ওআরএস-এর প্যাকেটে লেখা থাকে। সাধারণত ২১ গ্রামের ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টসের প্যাকেট এক লিটার জলে মেশাতে হয়। “ওআরএস-এর ঘনত্ব ও রক্তে প্লাজমার ঘনত্ব সমান। সেই অঙ্কটা করেই জল ও পাউডারের অনুপাত প্যাকেটের গায়ে লিখে দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ না মেনে এক লিটার জলে দু’-তিন প্যাকেট মিশিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হবে। ওআরএস-এর পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে অন্ত্রের ভিতরের লুমেন বা গহ্বর জল টেনে নেবে। তাতে শরীর থেকে আরও জল শুকিয়ে যাবে। ডিহাইড্রেশন কমে যাওয়ার বদলে বেড়ে যাবে,” বললেন ডা. মণ্ডল।
নুন-চিনি দিয়ে ঘরে তৈরি জলকে চিকিৎসেকেরা ওআরএস বলতে রাজি নন। কারণ এখানে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে নুন-চিনির পরিমাপ ঠিক হওয়া সম্ভব নয়। শুধু ডিহাইড্রেশনের জন্য নয়, অনেকেই রক্তচাপ কমে গেলে বা রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে গেলে তা স্বাভাবিক করার জন্য ওআরএস পান করেন। এতে রক্তচাপ বা রক্তের শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক হয় না।
শরীরের সামান্য দুর্বলতায় মাঝেমধ্যেই পানীয় হিসেবে ওআরএস পান করলে যাঁদের কিডনির সমস্যা আছে, তা আরও বেড়ে যেতে বাধ্য। ওআরএস আপৎকালীন ওষুধ। বাড়িতে বা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার সময়ে ফাস্ট-এড বক্সে এক-দু’টি হু অনুমোদিত ওআরএস-এর প্যাকেট রাখতেই পারেন। কিন্তু সেটা কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করবেন, তা জানা প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)