মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফিতাকৃমির জীবন্ত লার্ভা। তা নিয়েই বছরের পর বছর কাটিয়েছেন ৪৭ বছরের লোরি ডেনম্যান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের কর্মী লোরি জানিয়েছেন, ২০০৭ সালে তিনি ভারতে আসেন। ওই সময়ে নিরামিষ খাবারই খান। কিন্তু তার পরেও তাঁর শরীরে ফিতাকৃমির সংক্রমণ ঘটে। ২০১০ সালে শরীর থেকে কৃমি বার হতে দেখে তিনি ওষুধ খেয়েছিলেন বটে, তবে বিষয়টি নিয়ে সতেচন হননি। পরে দেখা যায়, এই ফিতাকৃমির ডিম ও লার্ভা পৌঁছে গিয়েছে তাঁর মস্তিষ্ক অবধি। প্রবল মাথাযন্ত্রণা ও খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, মস্তিষ্কের বিরল রোগ নিউরোসিস্টিসার্কোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন লোরি।
কী এই রোগ?
নিউরোসিস্টিসার্কোসিস হল কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের এক বিরল রোগ। মস্তিষ্কে জীবাণু সংক্রমণ ঘটলে, স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রোগটি হয়। মূলত পরজীবী সংক্রমণেই রোগটি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে, মগজখেকো অ্যামিবার সংক্রমণে অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ইদানীং কালে। আবার ফিতাকৃমির সংক্রমণ ঘটলেও রোগটি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মৃগীর উপসর্গ দেখা দেয়, রোগীর তীব্র মাইগ্রেন হতে পারে, ঘন ঘন মাথাঘোরা, বমি ভাব, জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন:
দূষিত জল, খাবার থেকে ফিতাকৃমির ডিম প্রবেশ করে শরীরে। সেই ডিম শরীর থেকে পুষ্টি নিয়ে অন্ত্রে বেড়ে ওঠে। তার পর ফেটে গিয়ে লার্ভা বার হয়, যা রক্তপ্রবাহে বাহিত হয়ে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছোয় এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষে আশ্রয় নেয়। মস্তিষ্কের কোষ থেকেই এরা পুষ্টি সংগ্রহ করে। ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, ক্ষতি হয় স্নায়ুর। অনেক সময়েই দেখা যায়, ফিতাকৃমির ডিম জমে গিয়ে মস্তিষ্কে জল ভরা থলি বা সিস্টের মতো তৈরি হয়েছে। যার জেরে রোগীর প্রবল খিঁচুনি শুরু হয়, ঘন ঘন বমি হতে থাকে। রক্তচাপ আচমকা বেড়ে যায় এবং এর থেকে ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
ফিতাকৃমি শরীরে ঢোকে কী ভাবে?
আধসেদ্ধ বা কম আঁচে রান্না করা মাংস, মাছ ও সব্জিতে যদি ফিতাকৃমির ডিম থাকে, তা হলে তা মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। শূকরের মাংস ঠিকমতো রান্না করে না খেলে তা থেকেও ফিতাকৃমি বা টিনিয়া সোলিয়ামের ডিম ঢুকতে পারে শরীরে। পাবমেড থেকে প্রকাশিত একাধিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মাঠে বা ঘাসজমিতে পড়ে থাকা মলে কৃমির ডিম থাকে। সেই ঘাস খায় গবাদি পশু, ফলে ওই ডিম তাদের শরীরে প্রবেশ করে। লার্ভা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাংসপেশিতে। সেই মাংস ঠিকমতো না ধুয়ে বা উচ্চতাপমাত্রায় রান্না না করে খেলেই মুশকিল। তবে কেবল মাছ বা মাংস নয়, সব্জি বা শাকপাতার গায়ে ফিতাকৃমির ডিম লেগে থাকতে পারে। সেগুলি ঠিকমতো পরিষ্কার করে না খেলে তা থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে। মস্তিষ্কে দীর্ঘ সময়ে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে ফিতাকৃমির ডিম। শরীরে ঢোকার কয়েক বছর পরেও লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই না করলে ফিতাকৃমির সংক্রমণ ধরা পড়ে না। মূলত অ্যান্টি প্যারাসাইটিক ও অ্যান্টি কনভালশন ওষুধ দিয়েই এর চিকিৎসা করা হয়। সঠিক সময়ে ধরা না পড়লে, রোগীর স্মৃতিনাশও হতে পারে আবার ফিতাকৃম ছড়িয়ে পড়ে চোখের স্নায়ু নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিও থেকে যায়।