মিউনিখ শুটিং বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার সময় বিমানে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ভারতের অন্যতম সেরা শুটার ও জাতীয় দলের কোচ যশপাল রানা। দিল্লির ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রাক্তন অলিম্পিয়ান। শুক্রবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা জানান, হৃদ্যন্ত্রে ব্লকেজ ধরা পড়েছিল রানার। একটি স্টেন্ট বসানোর পরে দ্বিতীয় স্টেন্ট বসানোর কথাও ছিল। কিন্তু সে সময়টুকু আর পাওয়া যায়নি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে সোনাজয়ী শুটারের এমন মৃত্যু কেবল ক্রীড়াজগৎকেই স্তব্ধ করেনি, চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হয়েছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, হৃদ্রোগ বয়স দেখে হয় না। ইদানীং কমবয়সি ও মধ্যবয়সিরাই আক্রান্ত হয়ছেন বেশি। আচমকা বুকে ব্যথা, দরদর করে ঘাম, তীব্র শ্বাসকষ্ট— তার পরেই সব শেষ। কী ভাবে এমন বিপদ এড়ানো সম্ভব?
দেশের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের গবেষণা বলছে, একজন শিশুর জন্মের সময় থেকেই তার হৃদ্যন্ত্রে কোলেস্টেরল জমা হতে শুরু করে, স্বাভাবিক নিয়মেই। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী সেই মাত্রা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটাই আসল ব্যাপার। ধমনীর মুখ সরু হয়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই তার মধ্য দিয়ে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হবে। তখন হার্টে ব্লকেজ দেখা দেবে। বংশগত কারণে হলে তাকে বলা হবে, ‘কনজেনিটাল হার্ট ব্লক’। তা ছাড়া হার্টের ধমনীতে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত বা স্তব্ধ হয়ে গেলে তাকে ‘করোনারি থ্রম্বোসিস’ বলা হবে। যদি হার্টের স্পন্দনে গোলমাল হয়, তা হলে তাকে বলা হয় অ্যারিদ্মিয়া। সে ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দনের হার অনিয়মিত হয়ে যায়। সারা শরীরে ঠিক মতো রক্ত সঞ্চালন হয় না। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার নেপথ্যে এ সব কারণই রয়েছে।
কেন অকালে হানা দিচ্ছে হৃদ্রোগ?
১) অতিরিক্ত মানসিক চাপ একটি কারণ হতে পারে। এখনকার সময়ে কর্মব্যস্ততা যে ভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা। দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ থেকে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ধমনীতে এমন প্রদাহ তৈরি করে, যা ধূমপানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
আরও পড়ুন:
২) পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব আরও একটি কারণ। যিনি বাইরের খাবার কম খান বা নিয়মিত শারীরচর্চা করেন, তিনিও আক্রান্ত হতে পারেন হৃদ্রোগে। এর কারণ হতে পারে কম ঘুম ও শরীরকে ঠিকমতো বিশ্রাম না দেওয়া।
৩) রোজের ধকল কাটাতে এখন অনেকেই বাজারচলতি নানা ধরনের প্রোটিন শেক বা এনার্জি ড্রিঙ্ক খান। খেলোয়াড়েরা তো বটেই। এই ধরনের পানীয় রক্তে আচমকা শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। সেখান থেকেও বিপদ ঘটে যায়।
৪) পরিবারে যদি হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকে, তবে এই ঝুঁকি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। তখন আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে।
কী কী সতর্কতা নেওয়া জরুরি?
বুকে আচমকা ব্যথা, ভারী পাথর চেপে বসার মতো অনভূতি হলে সাবধান। বিশ্রাম নেওয়ার সময়েও যদি বুক ধড়ফড় করে মাঝেমধ্যেই, ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসে ও দরদর করে ঘাম হয়, তা হলেও সতর্ক হতে হবে।
হৃদ্রোগের হদিস পেতে সিআরপি টেস্ট করানো খুব জরুরি। ‘সিআরপি’ এক ধরনের প্রোটিন। রক্তে এই প্রোটিন বৃদ্ধি পেলে প্রদাহ বাড়ে। সিআরপি টেস্ট করালে বোঝা যায়, শরীরে কী পরিমাণ প্রদাহ হচ্ছে। যার থেকে বোঝা সম্ভব, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আছে কি না।
অক্সিডাইজ়ড এলডিএল পরীক্ষার মাধ্যমেও হৃদ্রোগের আভাস পাওয়া যেতে পারে আগে থেকেই। অক্সিডাইজ়ড এলডিএল হল কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন। রক্তে এর মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরে প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে এবং এর পাশাপাশি হৃদ্রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
হিমোসিস্টিন টেস্টে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আছে কি না তা টের পাওয়া সম্ভব। এটি এক ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড, যার মাত্রা বাড়লে ধমনীর ভিতরে জমা হতে থাকে ও রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি করে। দিনের পর দিন যদি রক্তে হিমোসিস্টিন জমা হতে থাকে, তা হলে ধমনীতে তা ‘প্লাক’-এর মতো জমতে থাকবে ও হার্ট ব্লকেজের কারণ হয়ে উঠবে।