বয়সকালে চোখে চশমা এঁটেও বইয়ের পাতার খুদে খুদে অক্ষর পড়তে নাকানিচোবানি খেতে হয়। আর যাঁদের দৃষ্টিই চলে গিয়েছে, তাঁদের সামনে গোটা জগৎই অন্ধকার। দৃষ্টিহীনের দৃষ্টি ফেরাতে চক্ষু প্রতিস্থাপন করা হত এত দিন। তাতে ঝুঁকি যেমন বিস্তর, তেমনই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল। এমন অস্ত্রোপচারের পরেও যে স্বচ্ছ দৃষ্টি ফিরে আসবে, তা না-ও হতে পারে। কিন্তু বায়োনিক আই সে ঝক্কি মেটাবে। চক্ষু প্রতিস্থাপনের বিকল্প উপায় হতে পারে একটি ছোট্ট ডিভাইস। চোখে বসিয়ে দিলে দৃষ্টিহীনও দৃষ্টি ফিরে পাবেন বলে দাবি। পরিষ্কার দেখতে পাবেন চারপাশ।
কী এই বায়োনিক আই?
অন্ধত্বের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো বলা চলে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, আমেরিকার জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বায়োনিক আই নিয়ে গবেষণারত। ডিভাইসটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগও শুরু হয়েছে। দৃষ্টিহীনের চোখে বসিয়ে দেখা হচ্ছে, কতটা স্বচ্ছ দৃষ্টি ফিরছে বা আদৌ যন্ত্রটি দৃষ্টি ফেরাতে পারছে কি না।
দৃষ্টি ফেরাবে যান্ত্রিক চোখ। ছবি: ফ্রিপিক।
বায়োনিক আই হল এক প্রকার যান্ত্রিক চোখ। বলা যেতে পারে এটি একটি নিউরোপ্রস্থেটিক ডিভাইস, যা একই সঙ্গে চোখের মতোই আলোর প্রতিফলন ঘটাবে এবং মস্তিষ্ককে সঙ্কেতও পাঠাবে। অপটিক স্নায়ুর সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে চোখের মতোই কাজ করবে। বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনে যিনি ক্রমশ দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন অথবা রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা নামক জিনগত রোগে যাঁর দৃষ্টিই প্রায় চলে গিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই যান্ত্রিক চোখ দৃষ্টি ফেরাতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন:
বায়োনিক আই একটি চিপের মতো যন্ত্র, যা চোখে বসিয়ে দেওয়া হবে। রোগীর চশমায় থাকবে হাই-রেজ়োলিউশন ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা বাইরের দৃশ্য দেখবে ও রেকর্ড করবে। সেই সঙ্কেত চিপের প্রসেসরে পাঠানো হবে। এই প্রসেসর সেই সঙ্কেত পাঠিয়ে দেবে মস্তিষ্কে। তা ছাড়া রেটিনা যেমন আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে বাইরের দৃশ্য স্পষ্ট করে তোলে, এই যন্ত্রও তেমন ভাবেই কাজ করবে। শুধু এটি আলোর সঙ্কেতকে বৈদ্যুতিক সঙ্কেতে রূপান্তরিত করবে এবং তা পাঠিয়ে দেবে অপটিক স্নায়ুর মারফত মস্তিষ্কে। মস্তিষ্ক সেই সঙ্কেত গ্রহণ করে তার ছবি ফুটিয়ে তুলবে। দৃষ্টিহীন ব্যক্তি বা যাঁর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, তিনি ধীরে ধীরে দেখতে পাবেন।
অন্ধত্বের চিকিৎসায় নতুন দিশা। ছবি: ফ্রিপিক।
প্রতিস্থাপনের কাজ সহজ করবে যান্ত্রিক চোখ
কর্নিয়া প্রতিস্থাপন সহজ নয়। সদ্যোমৃত দাতার থেকে কর্নিয়া তোলা ও সেটি নিপুণ ভাবে গ্রহীতার চোখে বসিয়ে দেওয়ার কাজটি বড়ই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। সহজ করে বললে, পেঁয়াজের খোসার মতো অনেকগুলি স্তর থাকে কর্নিয়ার। মৃতের চোখ থেকে তা নিখুঁত ভাবে তুলে ফেলতে হয়। কোনও একটি স্তরও যদি আঘাত পায়, তা হলে প্রতিস্থাপন ঠিক মতো হবে না। তাই প্রক্রিয়াটি জটিল। ঝুঁকিপূর্ণও বটে। সে কাজ যান্ত্রিক চোখে সহজে হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে চোখের জটিল রোগ, যেমন রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায় চোখের রড কোষ ও কোন কোষ দু’টিই নষ্ট হয়ে যায়। স্বল্প আলোতে বা রাতে দেখতে সাহায্য করে রড কোষ এবং কোন কোষের কাজ হল রঙের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করা। যাঁর দু’টি কোষই নষ্ট হয়েছে, তিনি না দেখতে পাবেন বাইরের দৃশ্য, না রঙের পার্থক্য বুঝতে পারবেন। এ অসুখে শুরুতে রাতকানা রোগের লক্ষণ দেখা দেয়, পরে দু’পাশের দৃশ্য দেখতে সমস্যা হয় এবং ধীরে ধীরে রেটিনা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। এ রোগের চিকিৎসা সহজ নয়। তবে বায়োনিক আই এমন অসুখেও রোগীর দৃষ্টি ফেরাতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে।
গবেষণা কত দূর?
ভারতে চেন্নাই ও হায়দরাবাদের কিছু প্রতিষ্ঠানে বায়োনিক আই নিয়ে ট্রায়াল চলছে। হার্ভার্ড ও জন্স হপকিন্সের গবেষকেরাও এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করেছেন। প্রাথমিক ভাবে দেখা গিয়েছে, চোখের মতো অত স্বচ্ছ দৃষ্টি ফেরাতে পারে না বায়োনিক আই, তবে যিনি দৃষ্টি হারিয়েছেন তিনি মোটামুটি স্পষ্ট দেখতে পাবেন। কী দেখছেন, তা বুঝতে এবং মনে রাখতেও পারবেন। কারণ শুধু সামনের দৃশ্য দেখানো নয়, মস্তিষ্কে তার সঙ্কেত পাঠানোর কাজটিও করবে বায়োনিক আই।
‘আর্গাস ২’ নামক রেটিনাল প্রস্থেটিক এক ডিভাইস এফডিএ-র অনুমোদন পেয়েছে। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, বায়োনিক আই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে তোলার চেষ্টা চলছে। এমনটা সম্ভব হলে এক সময়ে অন্ধত্বও নির্মূল করা সম্ভব হবে।