পদ্মসম্মানে ভূষিত অলকা যাজ্ঞিক। আর হুইলচেয়ারে চেপে বেরোচ্ছেন গায়িকা। দু’টি ঘটনার একটি আনন্দের, একটি কষ্টের। সকলের নজর চলে গেল হুইলচেয়ারের দিকে। লোকে ভুলে গেলেন পদ্মসম্মান প্রাপ্তির কথা। কী হয়েছে তাঁর? হুইলচেয়ারে বসেছেন কেন? তিনি কি হাঁটতে পারছেন না? মঞ্চে ওঠার সময়েও কারও সাহায্যের প্রয়োজন হল কেন? প্রশ্ন উঠল নানা বিষয় নিয়ে। চোখ কেড়ে নিল হুইলচেয়ার। অবশ্যই তাতে ছিল দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ এবং করুণা। কিন্তু এই করুণাই বোধহয় কখনও কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
লোকে কী বলবে! এই চিন্তাতেই এই দেশে রোগাক্রান্ত বা দুর্বল বহু মানুষ হাঁটার সহায়ক লাঠি, ক্রাচ, ওয়াকার ইত্যাদি ব্যবহার করতে চান না। পাছে করুণার শিকার হয়ে যান, পাছে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেন, পাছে হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়! অলকা জানিয়েছিলেন, অনেকক্ষণ অনুষ্ঠানে বসে থাকার পর ক্লান্ত বোধ করছিলেন, গায়ে জোর ছিল না, তাই হুইলচেয়ারে বসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর তাঁর শরীর ধীরে ধীরে ভাল হয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহ ঘুরতে চলল, কিন্তু লাইমলাইটে এখনও সেই হুইলচেয়ার। অলকা কি চেয়েছিলেন, তাঁর এই দৃশ্য দেখে তাঁর প্রতি সকলে করুণাঘন দৃষ্টিতে তাকান? নিশ্চয়ই নয়। শ্রবণশক্তি হারানোর রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে ক্যামেরার আড়ালে ছিলেন। এই আড়াল নিশ্চয়ই প্রচার এড়াতেই ব্যবহার করা। কিন্তু পদ্মসম্মানে ভূষিত হওয়ার জন্য জনসমক্ষে আসতেই হত! কিন্তু তার পরেই আতসকাচের তলায় চলে এলেন— পদ্মসম্মানের জন্য নয়, হুইলচেয়ারের জন্য।
হুইলচেয়ারে বসে রয়েছেন অলকা যাজ্ঞিক। ছবি: সংগৃহীত
অস্থিরোগ চিকিৎসক আরণ্যক সরকারের প্রশ্ন, ‘‘করুণার পাত্রী হব না ভেবে যদি তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার না করতেন বা মঞ্চে ওঠার সময়ে কারও সাহায্য না নিতেন, তা হলে কি পদ্মসম্মান হাতে তুলে নিতে পারতেন?’’ সত্যিই তো শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে, নিজেকে সুস্থ রাখতেই তো সাহায্য নিয়েছিলেন অলকা। হাঁটার সময়ে যদি বার বার ভারসাম্য নষ্ট হয়, পায়ে যথেষ্ট জোর না থাকে, অস্ত্রোপচারের পরে চলাফেরা করতে হয়, দীর্ঘ দিনের আর্থ্রাইটিস, স্নায়ুর সমস্যা, পার্কিনসন্স, স্ট্রোক বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার কারণে হাঁটা কঠিন হয়ে ওঠে, তখন চিকিৎসকের পরামর্শে হাঁটার সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করা প্রয়োজন হতেই পারে।
কিন্তু বিষয়টি এতখানি সরল নয়। বিদেশের রাস্তায় রাস্তায় ওয়াকার নিয়ে টুকটুক করে গাড়িঘোড়া দেখে পার হতে দেখা যায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। তাঁদের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু করুণার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ দেশের চিত্র খানিক ভিন্ন। ৫৭ বছরের মৃগাঙ্ক ঘোষ আজ প্রায় ১০ বছর ধরে স্নায়ুর রোগী। ভর ছাড়া হাঁটতে পারেন না। কর্মক্ষেত্র বা কোনও নিমন্ত্রণে যেতে হলে, অথবা ঘর থেকে খাওয়ার ঘরে যেতে লাঠি ছাড়ি গতি নেই। কিন্তু প্রায় রোজই শ্লথগতিতে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পান করুণায় ভরা কত শত চোখ। লাঠি নিয়ে হাঁটতেও কষ্ট হয়, সুবিধা হত যদি চারপেয়ে ওয়াকার ব্যবহার করতেন। কিন্তু বড় লজ্জা করে তাঁর। বলছেন,‘‘লোকে ভাববে, আমি পুরোপুরি অচল।’’
সমাজের কাছে কেন এখনও করুণার পাত্র-পাত্রী হয়ে থাকতে হয় ক্রাচ নিয়ে চলা মানুষকে? ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকের বক্তব্য, এগুলি অসহায়ত্বের প্রতীক নয়। বরং স্বনির্ভর হয়ে ওঠার সঙ্গী। স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার উপকরণ। তবুও বাস্তব বলছে, অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এগুলি ব্যবহার করতে চান না এ দেশে। কারণ, মনে হয় সবাই তাকিয়ে আছে, করুণা করছে, বয়স বা অসুস্থতার ছাপ যেন হঠাৎ করেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেকেই ভাবেন, যত দিন সম্ভব কোনও সাহায্য না নিয়ে হাঁটাই ভাল। কিন্তু এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়। বার বার পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এতে। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে অতিরিক্ত চাপে আরও দুর্বলতা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। বরং সঠিক সময়ে সঠিক সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে এবং সেরে ওঠাও হয়তো সহজ হয়। তিনি বলছেন, ‘‘হাঁটার ক্ষমতা অনুযায়ী লাঠি, ওয়াকার, ক্রাচ, হুইলচেয়ার বেছে দেওয়া হয়। এখন তো আরও নতুন ধরনের মোটরচালিত যন্ত্র আবিষ্কার হয়ে গিয়েছে। সে সব তো অসহায়ত্বের নয়, বরং স্বাধীন হয়ে ওঠার উপকরণ। নয়তো রোগীদের ঘরে বসে থাকতে হবে। তার চেয়ে তো এটাই ভাল।’’
সে ক্ষেত্রে কী করা যায়?
মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘ভারতীয়দের মধ্যে অনেকেই হাঁটার সহায়ক যন্ত্র যেমন, লাঠি, ওয়াকার বা ওয়াকিং স্টিক ব্যবহার করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক, মানসিক ও ব্যবহারিক কারণ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, হাঁটার সহায়ক কিছু ব্যবহার করলে মানুষ তাঁকে বৃদ্ধ, দুর্বল বা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে দেখবে। তাই লজ্জা বা অস্বস্তির কারণে তাঁরা ব্যবহার করতে চান না। অনেক পরিবার মনে করে, এক বার লাঠি বা ওয়াকার ব্যবহার শুরু করলে মানুষ সেটির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং পায়ের শক্তি কমে যাবে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা সঠিক নয়। অনেকের কাছে লাঠি বা ওয়াকার ব্যবহার মানে নিজের বার্ধক্য বা শারীরিক দুর্বলতাকে স্বীকার করে নেওয়া, যা মানসিক ভাবে গ্রহণ করা কঠিন হয়।’’
আরও পড়ুন:
আর তাই পরিবারকে বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে এ ক্ষেত্রে। পরিবারের সদস্যদের উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে রোগী নিজেকে বোঝা মনে না করেন। ‘‘এত তাড়াতাড়ি লাঠি ধরছ?’’ বা ‘‘তুমি তো এখনও ঠিকই হাঁটতে পারো’’— এই ধরনের মন্তব্য অনেক সময়ে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। বরং তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক উপকরণ বেছে নিতে সাহায্য করা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো উচিত।