মরসুমি ফ্লু বলতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নামই সামনে আসে। সর্দি-কাশির সাধারণ অ্যাডিনোভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি সংক্রামক ইনফ্লুয়েঞ্জা। এর অসংখ্য উপরূপ আছে যারা যখন তখন নিজেদের চরিত্র বদলে ফেলে। ইনফ্লুয়েঞ্জা বলতে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এবং বি ভাইরাসের নামই বেশি শোনা যায়। আবার সোয়াইন ফ্লু (এইচ১এন১) ও বার্ড ফ্লু (এইচ৫এন১) ভাইরাসও ইনফ্লুয়েঞ্জারই দুই রূপ। সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল জ্বর এত বেড়ে গিয়েছে যে, ইনফ্লুয়েঞ্জার আরও এক প্রতিরূপ ‘সাবক্ল্যাড কে’ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বলেও সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। এতএব ইনফ্লুয়েঞ্জা তার নানা রূপ ও আকার নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই চেনাশোনা ইনফ্লুয়েঞ্জারা নানা সময়ে উৎপাত করলেও তেমন আতঙ্ক ছড়ায়নি। কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জার আরও এক বংশধর সে কাজে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে বলে সতর্ক করেছে হু। সেটি হল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি। এর নাম আগে শোনা যায়নি, এর সম্পর্কে পাওয়া তথ্যও খুব অল্প।
আমেরিকার হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল, জার্মানির ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি এবং আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ মিসিসিপির গবেষকেরা ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস নিয়ে গবেষণারত। অনেকেরই আশঙ্কা, আগামী দিনে এই ভাইরাস বিশ্ব জুড়ে ফের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কী এই ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি?
নতুন ভাইরাস নয়। ইনফ্লুয়েঞ্জারই এক পরিবর্তিত রূপ, যা গবাদি পশুর শরীরেই পাওয়া যেত আগে। এখন তার পরিধি বেড়েছে। গবেষকেরা বলছেন, পশু থেকে মানুষের শরীরে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে অজান্তে। ঠিক করোনাভাইরাসেরই মতো। বড় আকারে এটি ছড়িয়ে পড়েনি ঠিকই, তবে পশু খামারে কাজ করেন যাঁরা বা আশপাশে থাকেন, তাঁদের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, এর থেকেই প্রমাণিত, তাঁরা কোনও না কোনও সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি এক প্রকার আরএনএ ভাইরাস, করোনারই মতো। এই ভাইরাসও শ্বাসনালি দিয়ে মানুষের শরীরে ঢোকার ক্ষমতা রাখে। একই ভাবে শরীরের ভিতরে ছড়াতে পারে ও আক্রান্তের থেকে সুস্থ মানুষের শরীরেও ঢুকে পড়তে পারে। গবেষকদের ভয় পাওয়ার আরও একটি কারণ হল, ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং উচ্চ তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে, তাই যে কোনও আবহাওয়াই এই ভাইরাসের জন্য অনুকূল।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস কবে ও কী ভাবে মানুষের শরীরেও বিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে, তা অজানা। তবে অজানন্তে এই ভাইরাস যে ছড়াচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সাধারণ জ্বর বা সর্দি-কাশির মতোই এর উপসর্গ বলেও অনুমান বিজ্ঞানীদের। মানুষের শরীরেই এমন এক প্রোটিন তৈরি হয়, যা জ্বরজারির ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়াকে রোগ ছড়াতে উস্কানি দেয়। সেই প্রোটিনটির নাম ‘অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ডি’। এটি তৈরি হয় লিভারে। লিভারে তৈরি হয়ে প্রোটিনটি রক্তপ্রবাহে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। লিভার ও ফুসফুসের কোষ নষ্ট করতে শুরু করে। বাইরে থেকে কোনও জীবাণু শরীরে ঢুকলে তার বিভাজন ও বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। ফলে সেখানেও সুস্থ কোষের মৃত্যু ঘটে খুব তাড়াতাড়ি। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। প্রোটিনটির আসল লক্ষ্য হল মাইটোকন্ড্রিয়া, যা কোষে কোষে শক্তির জোগান দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে তা এই প্রোটিনের সহায়তায় কতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, তা নিয়েই চিন্তা বাড়ছে। একে ঠেকানোর উপায় নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছেন গবেষকেরা।