যে ভাবে হোক লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস হতে দেওয়া যাবে না এবং সে কারণেই এই সংক্রান্ত সংশোধনী বিলটির ভোটাভুটিতে সরকারকে হারানো নিশ্চিত করতে হবে— গতকাল গভীর রাতে তৃণমূলের সংসদীয় দলকে বিষয়টি নিয়ে আক্রমণাত্মক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, শুক্রবার লোকসভা কক্ষেই বিলটি ভোটাভুটিতে খারিজ হলে শনিবার তা আর রাজ্যসভায় যাবে না। মমতার নির্দেশ, সেটা করতেই হবে। কারণ ভোটের দোরগোড়ায় সাংসদদের নির্বাচনী এলাকা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দিল্লিতে দেড় দিনের বেশি বসিয়ে রাখা যাবে না। দলীয় সূত্রে আজ এ খবর জানা গিয়েছে।
তৃণমূলের সংসদীয় দল প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট যেহেতু মোদী সরকার বিলটি পাশ করানোর জন্য জোগাড় করতে পারবে না, ভোটাভুটির সময়ে দলের পাঁচ জন সাংসদের উপস্থিতি যথেষ্ট। গতকাল বিকেলে আলোচনার সময়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, অন্তত ৮ জন সাংসদ যেন থাকেন। সন্ধ্যায় তৃণমূল স্থির করে ১০ জনকে রাখা হবে, যাতে শাসক দলকে হারাতে সমস্যা না হয়। এরপর মমতার নির্দেশ আসে, শুধু হারালেই হবে না, ব্যবধানটাও নিশ্চিত করা জরুরি। এরপর স্থির হয়, ২০ জন সাংসদকে কলকাতা থেকে আপৎকালীন ভিত্তিতে নিয়ে আসা হবে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অসুস্থ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়ও। শুক্রবার বিকেলে ভোটাভুটি সেরেই তাঁরা ফিরে যাবেন প্রচারে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্যই ভোট ময়দান ছেড়ে আসবেন না। পাশাপাশি সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিকের মতো যাঁদের উপর প্রথম দফার ভোট প্রচারের গুরুদায়িত্ব, তাঁরাও আসছেন না।
আজ এই বিল নিয়ে আলোচনায় তৃণমূল স্থির করে, মহিলা সংরক্ষণ বিলে দলের ভূমিকাকে বড় করে প্রচার করা হবে যাতে কোনও ভুল বার্তা না যায় রাজ্যে। সেই অনুযায়ী আক্রমণাত্মক হন তৃণমূলের তিন মহিলা সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, প্রতিমা মণ্ডল এবং জুন মালিয়া। এই বিলকে ‘ছদ্মবেশী বিল’ হিসেবে উল্লেখ করে কাকলি বাংলায় বক্তৃতা দেন। আর তিনি যখন লোকসভায় বলছেন, তখন ভোট প্রচারে এই বিল নিয়ে সরব হয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, “সংসদে আসন পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ বিলকে জুড়ে দিয়ে একসঙ্গে পাশ করাতে চাইছে সরকার। অথচ এই দু’টি আলাদা বিল। আসলে বিজেপি বাংলা এবং গোটা দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করতে চাইছে। মহিলা সংরক্ষণ ৩৩ শতাংশ করার দাবিতে সংসদে অনেক লড়াই করেছি, এখন আমার দল করছে।”
আজ লোকসভায় কাকলির কথায়, “মহিলা সংরক্ষণ বিল আনা হোক অবশ্যই। ৩৩ শতাংশ নয়, আমরা দাবি করছি ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ রাখা হোক। গোটা দেশে আর কোথাও কেউ যা পারেনি তা করিয়ে দেখিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, লোকসভায় ৪১ % মহিলা সাংসদ এনে। এই বিল ছদ্মবেশী বিল, কারণ নারীসংরক্ষণের নাম করে আসনের পুনর্বিন্যাস করাই আসল লক্ষ্য।” প্রতিমা মণ্ডলের কথায়, মহিলা সংরক্ষণ বিলের নাম করে মোদী সরকার রাজ্যগুলির নতুন মানচিত্র আঁকতে চাইছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বেশি আসন লাভ করাই যার উদ্দেশ্য।” জুন মালিয়ার কথায়, ‘‘ভোটের আগে এই বিল আনাই বুঝিয়ে দিচ্ছে, কেন্দ্র ভোটের রাজনীতি করছে। আমরা মহিলা সংরক্ষণের বিরোধিতা করি না কিন্তু যে প্রতারণা করা হচ্ছে তার বিরোধিতা করি।’’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রীর 'টিটকিরি দেওয়ার' অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, "পিএম বাংলার মানুষের কাছেপাড়ার মস্তান!"
আজ সকালে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের ঘরে বিরোধীদের বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার উপনেতা সাগরিকা ঘোষ। তৃণমূলের দাবি, যে সব দল কংগ্রেসের সঙ্গে সমন্বয়ে স্বচ্ছন্দ নয়, অর্থাৎ এসপি, আপ, শিবসেনা (উদ্ধব)-এর মতো দলের পর্যাপ্ত সংখ্যা যাতে আগামিকাল ভোটের সময় থাকে, সে জন্য সক্রিয় থেকেছে তারা। সূত্রের খবর, কংগ্রেসের পি চিদম্বরম বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেছেন। আজ পুরো সংখ্যার হিসাব নিয়েই বৈঠকে গিয়েছিলেন সাগরিকা। দলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনের কথায়, “গতকাল পর্যন্ত বলেছিলাম, সরকার এই বিলটিতে পরাজিত হবে। আজ বলছিগোহারা হারবে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)