অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী (অলঙ্কার ও রত্ন) চুরির ঘটনায় বৃহস্পতিবার ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন স্থানীয় আইনজীবীরা। উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা প্রভাবশালী বিজেপি নেতা কেশবপ্রসাদ মৌর্য অবশ্য তাতে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। চম্পতের দরাজ প্রশংসা করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘এ বিষয়ে অহেতুক জল ঘোলা করার কোনও মানে হয় না!’’
অন্য দিকে, অযোধ্যায় রামমন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে গ্রেফতার আট অভিযুক্তের মধ্যে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রণামী চুরিতে যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ৪৫ দিনের ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন সময় ওই পাঁচ অভিযুক্ত ভক্তদের দানের টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী সরাচ্ছেন। অন্য দিকে, যে আউটসোর্সিং সংস্থার মাধ্যমে রামমন্দির কর্তৃপক্ষ টাকা গণনার কর্মীদের নিয়োগ করেছিলেন, তারা দাবি করেছে যে তারা ওই ব্যক্তিদের বাছাই করেনি। আউটসোর্সিং সংস্থাটির দাবি, ওই ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য তাঁদের নাম সুপারিশ করা হয়েছিল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) স্থানীয় শাখার কয়েকজনের তরফে। ওই শাখাতেই রামমন্দিরের দানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী জমা করা হয়। যদিও তদন্তকারী দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, এসবিআই প্রায় তিন মাস আগে প্রণামী গণনার প্রক্রিয়ায় ‘সন্দেহজনক অনিয়মের’ বিষয়ে সতর্ক করেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিল।
অযোধ্যার রামমন্দিরে গত দু’বছরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর কয়েক কোটি টাকা লুট হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। রামমন্দিরের কর্মচারী (সেবাদার), এমনকি মন্দির পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সদস্য ও পদাধিকারীদের একাংশও এতে জড়িত থাকতে পারেন বলে পুলিশের ‘বিশেষ তদন্তকারী দল’ (সিট)-এর ধারণা। গত ২৫ জুন আট অভিযুক্তের গ্রেফতারির পরেই ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেন চম্পত। সেই সঙ্গে তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সদস্য (ট্রাস্টি) পদ থেকে ইস্তফা দেন অনিল মিশ্র। কিন্তু চম্পতের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রণামী চুরিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার অযোধ্যার রাম জন্মভূমি থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় আইনজীবীদের একাংশ।
ঘটনাচক্রে, প্রণামী চুরির ঘটনায় ধৃত আট জনের মধ্যে অন্যতম রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিনু যাদব একদা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর সহ-সভাপতি চম্পতের গাড়িচালক ছিলেন। অভিযোগ, পরবর্তী কালে চম্পতের উদ্যোগে প্রণামী হেফাজতে রাখার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তিনু এই চুরিকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত মুখ। অভিযোগ, দানবাক্সের চাবি সবসময় তিনুর কাছেই থাকত এবং ট্রাস্টের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ভাবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনু তাঁর ভাইপো মণীশ যাদবকেও প্রণামী গণনার প্রক্রিয়া এবং দানবাক্স নজরদারির দায়িত্ব পাইয়ে দিয়েছিলেন। মণীশের বাড়ি থেকে চুরি করা টাকার একাংশ উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
কেশবপ্রসাদ অবশ্য সরাসরি ‘ক্লিনচিট’ দিয়েছেন চম্পতকে। তিনি বলেন, “যাঁরা শ্রীরাম জন্মভূমির জন্য মহান তপস্বীদের মতো অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের মধ্যে চম্পত ও অন্যেরাও রয়েছেন। এই ঘটনায় তাঁরা গভীর ভাবে মর্মাহত।” উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রণামী চুরির ঘটনাকে ‘রামভক্তদের ভাবাবেগে গভীর আঘাত’ বলে বর্ণনা করে ইতিমধ্যেই দোষীদের কঠিন শাস্তি দেওয়ায় অঙ্গীকার করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে উত্তরপ্রদেশ বিজেপির অন্দরে ‘যোগী বিরোধী’ হিসাবে পরিচিত কেশবপ্রসাদ বৃহস্পতিবার বলেন “রামমন্দিরে অনুদানের বিষয়টি নিয়ে এত বড় বিতর্ক তৈরি করার কোনও প্রয়োজন নেই।” তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পদত্যাগী চম্পতও বৃহস্পতিবার প্রণামী চুরির ঘটনাকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একদা অনুগতকে বিষয়টি নিয়ে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনু সমাজবাদী পার্টির এক নেতাকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন।’’