উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের গড়া বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) প্রাথমিক রিপোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছিল। ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর এফআইআরে তাঁদের নাম ছিল। তাঁরা সকলেই অযোধ্যার রামমন্দিরে দান হিসেবে পাওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর কোটি কোটি টাকার নগদ ও সোনা আত্মসাতের অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার সেই আট অভিযুক্তের বিস্তারিত পরিচয় এ বার ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে, আর সেই সঙ্গেই তৈরি হচ্ছে নানা জল্পনা।
রামমন্দিরে জমা পড়া প্রণামী নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিট মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। তার পরে ‘সিট’-এর সুপারিশ মেনে বৃহস্পতিবার ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর তরফে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে আট জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন অন্যতম ট্রাস্টি কৃষ্ণ মোহন। তার ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে রাতেই আট অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এঁদের মধ্যে রয়েছেন, রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু, লবকুশ মিশ্র, অনুকল্প মিশ্র, অবিনাশ শুক্ল, মণীশকুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রমাশঙ্কর মিশ্র এবং সুভাষ শ্রীবাস্তব। তাঁদের কয়েক জনের ঠিকানা থেকে ‘হিসাব-বহির্ভূত’ ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাচক্রে ওই গ্রেফতারির পরেই ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেন চম্পত রায়। সেই সঙ্গে তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সদস্য (ট্রাস্টি) অনিল মিশ্রও পদত্যাগ করেন। ঘটনাচক্রে, ধৃতদের একাংশের সঙ্গে দু’জনেরই ‘যোগাযোগ’ সম্পর্কিত তথ্য মিলেছে। শনিবার এনডিটিভি-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ধৃত আট জনের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে ধৃতদের পরিচয় এবং অভিযোগের ফিরিস্তি।
১. রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু— ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের গাড়ির প্রাক্তন চালক। তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর করসেবকপুরমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী কালে চম্পতের উদ্যোগে প্রণামী হেফাজতে রাখার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। টিন্নু এই চুরিকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত মুখ। অভিযোগ, দানবাক্সের চাবি সবসময় টিন্নুর কাছেই থাকত এবং ট্রাস্টের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ভাবে কাজ করতেন। টিন্নু অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে, তিনি নগদ ও সোনাদানা গণনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ‘অজ্ঞাত ও ঈর্ষান্বিতেরা’ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
২. রমাশঙ্কর মিশ্র ওরফে রবি মিশ্র— প্রণামী গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করা ও প্রণামী পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর পুত্র অলুকল্প ও জামাই লবকুশকেও টাকা গণনার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। রমাশঙ্কর ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সদ্য পদত্যাগী সদস্য অনিল মিশ্রের আত্মীয়।
৩. অনুকল্প মিশ্র — এই মামলার অভিযুক্ত রমাশঙ্কর মিশ্রের পুত্র দান গণনার কাজে জড়িত ছিলেন। অনুকল্প মিশ্র পদত্যাগী ট্রাস্টি অনিলের আত্মীয়। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে প্রণামী গণনার সময় সিসিটিভি নজরদারি আড়াল করার অভিযোগ।
৪. লবকুশ মিশ্র— রমাশঙ্কর মিশ্রের জামাই। অভিযোগ, আত্মসাৎ করা প্রণামীর টাকা ও সোনাদানা বাইরে সরানোর দায়িত্ব ছিল লবকুশের উপর। তদন্তের শুরুতে তার বাড়ি থেকে টাকা উদ্ধার হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল।
৫. অবিনাশ শুক্ল— রামমন্দিরের প্রভাবশালী সেবাদার (কর্মচারী)। তিনি অর্থের হিসাবের কারচুপিতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ। দাবি করা হয় যে, তিনি সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। অবিনাশের হেফাজত থেকে পুলিশ ‘হিসাব-বহির্ভূত’ ৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে বলে প্রকাশিত খবরে দাবি।
৬. মণীশ যাদব— ধৃত রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নুর ভাইপো। তিনিও প্রণামী গণনার প্রক্রিয়া এবং দানবাক্স নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন। মণীশের বাড়ি থেকেও চুরি করা টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
৭. সুবাস শ্রীবাস্তব— প্রাক্তন ব্যাঙ্ক কর্মচারী। নগদ গণনা, হিসাব পরীক্ষা এবং ব্যাঙ্কে জমা করার দায়িত্বে ছিলেন।
৮. করুণেশ পাণ্ডে— ভক্তদের প্রণামী অর্থের রসিদ দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। সেখানে কারচুপির অভিযোগে অভিযুক্ত। ঘটনাচক্রে, শুক্রবার শিবসেনা (উদ্ধব)-এর নেতা সঞ্জয় রাউত জানিয়েছেন, তাঁর দল ৪ কেজি রুপোর ইট রামমন্দিরে দান করেছিল। দলনেতা উদ্ধব ঠাকরে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও তার রসিদ মেলেনি!
প্রসঙ্গত, রামমন্দিরে প্রণামী চুরিকাণ্ডে চুনোপুঁটিদের ফাঁসিয়ে দিয়ে রাঘব বোয়ালদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছে বলে ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে, কংগ্রেস, উদ্ধবসেনা, সমাজবাদী পার্টির মতো বিরোধী দলগুলি। উদ্ধবসেনার নেতা সঞ্জয়ের অভিযোগ, রামমন্দির থেকে চুরি করা ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে তৃণমূল ও উদ্ধবের শিবসেনার সাংসদদের ভাঙানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্ত চেয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের বক্তব্য, চুরির অভিযোগ রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের বিরুদ্ধে। সেই ট্রাস্টের দায়ের করা এফআইআর-এর ভিত্তিতে তদন্ত হচ্ছে। তা হলে আসল অপরাধীরা কী ভাবে ধরা পড়বে? ট্রাস্টের পদাধিকারী এবং সদস্যদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দফতরের প্রাক্তন কর্তা তথা রামমন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্রের বিরুদ্ধে তদন্তেরও দাবি তোলা হয়েছে বিরোধী শিবিরের তরফে।