খনিজসমৃদ্ধ ঝাড়খণ্ডকে দেশের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং (উৎপাদন) হাব’ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্রে রূপান্তরের অঙ্গীকার করলেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন, বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে নীতি আয়োগের ১১তম গভর্নিং কাউন্সিলের বৈঠকে তিনি বলেন, ‘‘ঝাড়খণ্ডের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বপ্নপূরণের জন্য আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা চাই।’’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পদমর্যাদা বলে নীতি আয়োগ গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন। তাঁর সভাপতিত্বে আয়োজিত বৈঠকে কংগ্রেসের সহযোগী ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম)-র প্রধান হেমন্ত-সহ মোট ২৮ জন মুখ্যমন্ত্রী যোগ দিয়েছিলেন। বৈঠকে সুসংহত উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বলেন, ‘‘ঝাড়খণ্ডের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ তখনই প্রকৃত অর্থবহ হবে যখন তা মানবসম্পদের সঙ্গে যুক্ত হবে।’’ সেই সঙ্গে আবেদন জানান, ঝাড়খণ্ডকে কেবল খনিজ উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে নয়, বরং দেশের উন্নয়ন যাত্রার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখার জন্য।
নীতি আয়োগের সভায় হেমন্ত দাবি করেন, ঝাড়খণ্ডের সম্পদের সদ্ব্যবহার ঝাড়খণ্ডের মধ্যেই হওয়া উচিত, যাতে উৎপাদন ক্ষেত্রের বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন এবং জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডে বয়নশিল্প, ইলেকট্রনিক্স, দূষণহীন শক্তি, লজিস্টিকস এবং কৃষি-খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে বড় আকারের বিনিয়োগ উৎসাহিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘‘কৃত্রিম মেধা (এআই) ভিত্তিক খনিজ অনুসন্ধান এবং সুস্থিত খনন পদ্ধতি উন্নয়নের কাজ চলছে। আমাদের লক্ষ্য ঝাড়খণ্ডকে শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এই উদ্যোগে কেন্দ্র সরকারের সহায়তা ও দিশানির্দেশ প্রত্যাশা করি আমরা।’’ নীতি আয়োগের ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী মোদী ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার যে লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছিলেন তাকে সমর্থন জানিয়ে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধিকে ‘উন্নয়নের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে’ উল্লেখ করেন।
নীতি আয়োগের বৈঠকে পাশাপাশি হেমন্ত সোরেন এবং ডিকে শিবকুমার। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে।। ছবি: সংগৃহীত।
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত জানান, তাঁর রাজ্যের ৩৮,০০০ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১৫,০০০ কেন্দ্রের এখনও নিজস্ব ভবন নেই। তবে পুষ্টি সূচকে পোষণ অভিযান এবং ‘সামার’ (ইউনিসেফের সহযোগিতায় ঝাড়খণ্ড সরকার রাজ্যে অপুষ্টি এবং রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া মোকাবিলার জন্য এই অভিযানটি চালু করেছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো— অপুষ্টির শিকার শিশু এবং রক্তাল্পতায় ভোগা নারীদের চিহ্নিত করে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা) উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নতি হয়েছে। শিশুদের প্রতিদিন ডিম খেতে দেওয়া হচ্ছে এবং রাজ্য সরকার নিজস্ব সম্পদ থেকে ৫,০০০ নতুন অঙ্গনওয়াড়ি ভবন নির্মাণ করছে। তাঁর সরকার সরকার ৫,০০০ মডেল স্কুল স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে জানিয়ে হেমন্ত ঝাড়খণ্ডে এনসিইআরটি-র একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের আবেদন জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের রাজ্য একটি কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ডেটা ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে এবং একটি ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার নিয়েও কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্র সরকারের কাছে সময়মতো তথ্য আদান-প্রদানের অনুরোধ জানান।
ঝাড়খণ্ডে পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর এক লক্ষেরও বেশি যুবককে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ‘সারথী’ প্রকল্পের অধীনে ৬,৭৬,০০০ যুবক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। কৃত্রিম মেধা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ড্রোন এবং সৌরশক্তির মতো নতুন ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য যুবকদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া ৫৩,০০০ নারীকে আধুনিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর তিনি বলেন যে গ্রামীণ এলাকায় ১,২৭৬টি ওষুধের দোকান চালু রয়েছে। মেডিক্যাল কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম মেধা-ভিত্তিক ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রোফাইল তৈরির কাজও চলছে।
আরও পড়ুন:
ক্রীড়াক্ষেত্রের উন্নয়ন প্রসঙ্গে হেমন্তের দাবি, ঝাড়খণ্ডের ক্রীড়াবিদেরা হকি, ফুটবল এবং অ্যাথলেটিক্সে অসাধারণ পারফরম্যান্স করছেন, যার ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে তাঁদের রাজ্য। তিনি ঝাড়খণ্ডে একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং উৎকর্ষকেন্দ্র (সেন্টার অব এক্সেল্যান্স) প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান এবং ক্রীড়া সংস্থাগুলির সংস্কার ও স্বচ্ছতার উপর জোর দেন। নীতি আয়োগের বৈঠকে জেএমএম প্রধান রাজ্য জুড়ে ১০ লক্ষেরও বেশি পুষ্টি বাগান তৈরির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। জানান, ১ লক্ষ ৫০ হাজার একর জমিতে ফল গাছের বাগান করা হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের আম এখন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে। তিনি ডিবিটি (ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার) ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল প্রতারণা রোধের ব্যবস্থার উপরও জোর দেন। কেন্দ্রের কাছে উত্থাপিত দাবির মধ্যে ‘জল জীবন মিশন’-এর বকেয়া ৬,০০০ কোটি টাকা অবিলম্বে দেওয়া, কয়লা কোম্পানিগুলির কাছ থেকে ১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকার বকেয়া নিষ্পত্তি। ‘ডিস্ট্রিক্ট মিনারেল ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’-এর নিয়মাবলীর সংশোধন, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজতর করার মতো বিষয়ও রয়েছে।