E-Paper

চিন্তা ডলার ভান্ডারে, অর্থনীতিতে উদ্বেগ

রবিবার নরেন্দ্র মোদী তেলঙ্গানার জনসভা থেকে দেশবাসীকে জ্বালানি, ভোজ্য তেল, সোনা কেনায় রাশ টানতে বলেছিলেন। সোমবার বরোদায় পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে ফের তিনি কোভিড পরিস্থিতির তুলনা টেনেছেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৮:১৩

— প্রতীকী চিত্র।

গত আড়াই মাস ধরে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চললেও পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত মোদী সরকার বলে গিয়েছে, ‘অল ইজ় ওয়েল’। পেট্রল, ডিজ়েল, রান্নার গ্যাসের অভাব নেই। তেলের দামও বাড়ছে না। ভোটের সময় জ্বালানির তোয়াক্কা না করে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা দেশ জুড়ে প্রচার, রোড-শো করেছেন। কিন্তু ভোট মিটতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পেট্রল-ডিজ়েল, ভোজ্য তেল কেনা কমাতে বলায় দেশ জুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, এ বার কি মোদী সরকার পেট্রল, ডিজ়েল বা রান্নার তেল বিক্রিতে রাশ টানতে চলেছে? আগামী দিনে কি পাম্পে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল মিলবে না? না কি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের অভাব হবে?

যদিও আজ কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, জ্বালানি বা ভোজ্য তেলের বিক্রিতে রাশ টানা হবে না। একই সঙ্গে তেল মন্ত্রকের কর্তারা মনে করিয়েছেন, বাজার দরের থেকে কম দামে পেট্রল, ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস বা এলপিজি বিক্রি করতে গিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির মাসে ৩০ হাজার কোটি টাকার ‘আন্ডার-রিকভারি’ বা কম আয় হচ্ছে। অর্থাৎ, দিনে ১ হাজার কোটি টাকা কম আয় হচ্ছে। খুব বেশি দিন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে সাহায্য করা সম্ভব নয়।

রবিবার নরেন্দ্র মোদী তেলঙ্গানার জনসভা থেকে দেশবাসীকে জ্বালানি, ভোজ্য তেল, সোনা কেনায় রাশ টানতে বলেছিলেন। সোমবার বরোদায় পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে ফের তিনি কোভিড পরিস্থিতির তুলনা টেনেছেন। তাঁর বক্তব্য, “কোভিড এই শতকের বৃহত্তম সঙ্কট হলে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ এই দশকের বৃহত্তম সঙ্কট। সরকার চেষ্টা করছে, সাধারণ মানুষের উপরে ধাক্কা যাতে না আসে। কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণও প্রয়োজন। দেশের নাগরিক হিসেবে দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতীতেও যখনই বড় সঙ্কট এসেছে, দেশের মানুষ সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন।”

এই পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবির মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী পেট্রল, ডিজ়েলের দাম বাড়ানোর আবহ তৈরি করছেন। তিনি এমন সব ক্ষেত্রে রাশ টানতে বলেছেন যাতে মানুষের মধ্যে লকডাউনের মতো খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কায় আতঙ্ক তৈরি হয়। তার পরে লকডাউন বা জ্বালানি বিক্রিতে রাশ না টেনে পেট্রল, ডিজ়েলের দাম বেশ কিছুটা বাড়ালেও মানুষের ততটা খারাপ লাগবে না। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী থেকে গোটা বিরোধী শিবির একে মোদী সরকারের আর্থিক ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দাবি করেছেন।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদনের ফলে দেশের অর্থনীতির গতি কমে আসবে। কারণ, সাধারণ মানুষ আতঙ্কের ফলে দামি জিনিসপত্র কিনবেন না। সেগুলির বিক্রি কমবে। তার ফলে শিল্পে উৎপাদন কমবে। আর্থিক বৃদ্ধির হার কমে আসবে। তার প্রভাব পড়বে মানুষের আয় থেকে কর্মসংস্থানে। এর উপরে যদি জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়, তা হলে মূল্যবৃদ্ধি লাগামছাড়া হবে। তার ফলেও অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। কারণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও কেনাকাটা কমবে।

কেন প্রধানমন্ত্রীকে রবিবার পেট্রল, ডিজ়েল, ভোজ্য তেল, সোনা কেনা থেকে বিদেশ যাত্রায় রাশ টানার আবেদন করতে হল? অর্থ মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, এর মূল কারণ হল, বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে টান পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাই পেট্রল, ডিজ়েল, সোনা আমদানি এবং বিদেশ যাত্রা কমিয়ে ডলার সাশ্রয়ের কথা বলছেন। গত সপ্তাহেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান জানিয়েছে, দেশের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার ৬৯ হাজার কোটি ডলারের ঘরে চলে এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে তা ৭২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। তার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধের ফলে ডলারের ভান্ডার কমতে শুরু করে। আইএমএফ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিদেশি মুদ্রার লেনদেনের ঘাটতি চলতি বছরে ৮ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। যা জিডিপি-র মাত্র ২ শতাংশ। বিদেশি মুদ্রা লেনদেনে ঘাটতি বাড়ার অর্থ, ডলার বেশি খরচ হচ্ছে, কম আয় হচ্ছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, বর্তমান বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার কাজে লাগিয়ে কার্যত ৯ মাসের মতো আমদানি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

মোদী সরকারকে নিশানা করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল বলেন, “মোদীজি এখন জনতার থেকে আত্মত্যাগ চাইছেন। এটা উপদেশ নয়। ব্যর্থতার প্রমাণ। গত ১২ বছর ধরে দেশকে তিনি এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন যে এখন মানুষ কী কিনবে, কী কিনবে না, তা বলতে হচ্ছে। প্রতি বার উনি দায়িত্ব মানুষের ঘাড়ে ঠেলে দেন। নিজে জবাবদিহি এড়িয়ে যান। আপস করে ফেলা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এখন আর দেশ চালানো সম্ভব নয়।” বিরোধীদের কটাক্ষ, প্রধানন্ত্রী দেশের লোককে পেট্রল-ডিজ়েলের খরচ কমাতে বলে নিজেই গুজরাতের পুর-পঞ্চায়েত নির্বাচনে জয়ের সাফল্যে বরোদায় রোড-শো করেছেন। শুক্রবার তিনি সাত দিনের জন্য বহুদেশীয় সফরে চলে যাচ্ছেন।

সংসদের বাজেট অধিবেশনের সময়েই বিরোধী শিবির সংসদে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছিল। মোদী সরকার এ নিয়ে বিবৃতি দিলেও আলোচনায় যায়নি। এ দিন কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম-সহ অধিকাংশ বিরোধী দল সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার দাবি তুলেছে। তাদের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা সংসদে না করে জনসভায় করছেন কেন? তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, “দেশের সম্রাট দেশকে জরুরি অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে চাইছেন শুধুমাত্র তাঁর কোটিপতি বন্ধুদের সুবিধা করে দিতে। পরিস্থিতি যখন এতই সঙ্কটজনক, তখন সংসদের বি‌শেষ অধিবেশন ডাকা হবে না কেন?”

মোদী সরকারের মন্ত্রীরা সোমবার সারাদিন প্রধানমন্ত্রীর আবেদনের যৌক্তিকতা নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কেন্দ্রীয় তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বণিকসভা সিআইআই-এর সম্মেলনে বলেন, যুদ্ধ এখনও চলছে। শান্তি এখনও অধরা। তাই প্রধানমন্ত্রী বিদেশি মুদ্রার খরচ কমানোর কথা বলেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের নেতৃত্বে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির উপর নজরদারির জন্য তৈরি মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকও ডাকা হয়। সেই বৈঠকে আবার বলা হয়েছে, দেশে ৬০ দিনের অশোধিত তেল, ৬০ দিনের প্রাকৃতিক গ্যাস, ৪৫ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারও এখন ৭০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

আর বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংহ বলেন, “বাষট্টির যুদ্ধের সময় জওহরলাল নেহরু দেশের মানুষকে সোনা দান করতে বলেছিলেন। কারণ, তখন সোনার ভান্ডারে টান পড়েছিল। একে কি নেহরুর ব্যর্থতা বলা যায়?”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Indian Economy US Dollars Economic Growth Narendra Modi

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy