যদি লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে ৮১৬ হয়, তা হলে একেক জন সাংসদের পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলার সময় মিলবে না বলে এ বার নতুন অভিযোগ তুলল কংগ্রেস।
নরেন্দ্র মোদী সরকার ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময়ই মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে এখনই আসন পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করে দিতে চাইছে। মোদী সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি রাজ্যের লোকসভার আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ করে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী, লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে ৮১৬ হবে।
কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরমের প্রশ্ন, ‘‘৮১৬ জনকে নিয়ে তৈরি লোকসভা একটা বিরাট, জবরজং সমাবেশে পরিণত হবে। এক এক জন সাংসদ খুব কম বার কথা বলার সুযোগ পাবেন। খুব কম সময় বলতেও পারবেন। যদি কোনও সাংসদ তিন মাসে এক বার সংসদে মুখ খোলার সুযোগ পান, সেটাও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য, তা হলে তিনি কী বলবেন?” কংগ্রেস সাংসদ মণীশ তিওয়ারির প্রশ্ন, ‘‘৫৪৩ জন সাংসদকে নিয়েই লোকসভা ঠিক মতো চালানো মুশকিল হয়, অনেক সাংসদ বলারই সুযোগ পান না। ৮১৬ জন হলে কী হবে?’’ শিবসেনা (উদ্ধব) নেত্রী প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদী আবার বলেছেন, আসন পুনর্বিন্যাস জরুরি। কারণ এক একটি লোকসভা বা বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ চলে এলে উন্নয়ন ধাক্কা খাবে।
মোদী ইতিমধ্যেই মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছেন। প্রথমে কেরলে, তার পরে রবিবার পশ্চিমবঙ্গে ভোটসভায় মোদী বলেন, ২০২৯-এই লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দাবি, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভাল কাজ করেছে। কিন্তু তার জন্য তাদের লোকসভার আসন কমে যাবে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী কৌশলে লোককে বোকা বানাতে চাইছেন। সব রাজ্যের আসন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলেও বড় রাজ্যগুলির আসন যতখানি বাড়বে, ছোট রাজ্যগুলির ততখানি বাড়বে না। ফলে উত্তর ভারতের বড় রাজ্যগুলি লাভবান হবে।
তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ মোদীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘‘আপনার দল আগাগোড়া মহিলা বিরোধী। আপনার দল এমনই যে, তারা ধর্ষকদের গলায় মালা পরায়, যৌন হেনস্থাকারীদের প্রার্থী করে! আপনার নিজের আচরণও চূড়ান্ত মহিলা-বিরোধী।’’
এসপি প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, ২০১১-র জনগণনার পুরনো পরিসংখ্যানের উপরে ভরসা করা হলে মহিলা সংরক্ষণের ভিতটাই নড়বড়ে হবে। তাই আগে জনগণনা করা হোক। অখিলেশ বলেন, ‘‘আমরা মহিলাদের সঙ্গে এই প্রতারণা হতে দেব না। যত ক্ষণ জনগণনা হবে না, তত ক্ষণ মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্কও হবে না।’’ আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা-র বক্তব্য, ‘‘২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে সর্বসম্মতিতে মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ হয়েছিল। তার পরেও মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর না করার জন্য মোদী সরকারের আগে ক্ষমা চাওয়া উচিত। মহিলাদের জন্য কোটার মধ্যেও কোটার দাবি উঠেছে। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ওবিসি-দের জন্য আসন সংরক্ষিত করতে হবে।’’
চিদম্বরম ও মণীশ, দু’জনেরই মত, মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ হোক। এখন লোকসভার যে ৫৪৩টি আসন রয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত করা হোক। মণীশ তিওয়ারির বক্তব্য, ‘‘লোকসভার আকার বাড়াতে গিয়ে তা আদতে চিনের ন্যাশনাল পিপল’স কংগ্রেসে পরিণত হবে। যেখানে কোনও বিতর্ক হবে না, শুধু রাবার স্ট্যাম্পের মতো বিলে সিলমোহর দেওয়া হবে!’’
সাধারণত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে লোকসভার আসন বাড়ার কথা। ১৯৭১-এর জনগণনার পরে সংবিধান সংশোধন করে ২৫ বছরের জন্য লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩টি-তে বেঁধে দেওয়া হয়। ২০০১-এ সংবিধানে ৮৪-তম সংশোধন করে আরও ২৫ বছরের জন্য লোকসভার আসন সংখ্যা একই রাখা হয়। হিসেব মতো ২০২৬-এর জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস হওয়ার কথা। কিন্তু মোদী সরকার ২০২৭-এর জনগণনার অপেক্ষা না করেই আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে। সেই সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে তারা ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল সংসদের অধিবেশন ডেকেছে। চিদম্বরমের বক্তব্য, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে ২৩, ২৯ এপ্রিল ভোট, তামিলনাড়ুতে ২৩ এপ্রিল ভোট। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বিরোধী ২৮ জন সাংসদ, তামিলনাড়ুর ৩৯ জন বিরোধী সাংসদ প্রচারে ব্যস্ত থাকবেন। এই ৬৭ জন সাংসদকী ভাবে সংবিধান সংশোধনী বিলে অংশ নেবেন?”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)