পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রত্নভান্ডারের অলঙ্কার ও মূল্যবান সম্পদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হল। আজ দুপুর ১২টা ০৯ মিনিট থেকে ১টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে নির্ধারিত শুভক্ষণে সমীক্ষক দল মন্দিরে প্রবেশ করে। ওড়িশা হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। শেষ বার এই তালিকা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। সরকার জানিয়েছে, এটি কেবল সে বারের তালিকার সঙ্গে বর্তমান সম্পদ মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া। সম্পদের কোনও আর্থিক মূল্যায়ন এখন করা হবে না। এই কাজের জন্য মন্দিরের পুজোয় কোনও ব্যাঘাত হচ্ছে না। ভক্তেরা ‘বাহির কাঠ’ থেকে দর্শন করছেন। শনি, রবিবার এবং উৎসবের দিনগুলিতে কাজ বন্ধ থাকবে।
১৯৭৮ সালে কয়েক মাস ধরে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রত্নভান্ডারের মূল্যবান সম্পদের তালিকা তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ছিল এবং ভান্ডারের সব কক্ষ বা সিন্দুক খোলা সম্ভব হয়নি। কোনও আর্থিক মূল্যায়নও করা হয়নি। সম্ভব হয়নি সম্পদের সঠিক ওজন বা মান যাচাই করাও। সেই তালিকায় রয়েছে ১২৮ কিলো ৩৮০ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার, ২২১ কিলো ৫৩০ গ্রাম রুপোর সামগ্রী এবং হিরে, চুনী, পান্না ও নীলা-সহ প্রচুর দুষ্প্রাপ্য পাথরের কথা। ২০২৪ সালের জুনে ওড়িশা হাই কোর্ট প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি নিরঞ্জন পট্টনায়ক ও বিজেপি নেতা সমীর মোহান্তির জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছিল প্রাক্তন বিচারপতি বিশ্বনাথ রথের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে। ওই বছর ১৪ জুলাই মেরামতি ও সম্পদ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে ‘ভিতর ভান্ডার’-এর তালা ভাঙা হয়।তার পরে চার দিনের মধ্যে ভিতর ও বাহির ভান্ডারের সমস্ত অলঙ্কার মন্দিরের ভিতরে অস্থায়ী স্ট্রংরুমে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
এ বার প্রথমে ‘চলন্ত রত্নভান্ডার’ বা দৈনন্দিন ব্যবহৃত গয়না এবং ‘বাহির ভান্ডার’ যাচাই হচ্ছে। প্রথম দিনে জোর দেওয়া হয়েছে ‘বাহির ভান্ডার’-এর তালিকা তৈরিতে। সোনা হলুদ কাপড়ে, রুপো সাদা কাপড়ে এবং অন্য মূল্যবান সামগ্রী লাল কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হচ্ছে ছ’টি বিশেষ সিন্দুকে। পরে ক্রমশ ‘ভিতর ভান্ডার’-এর সম্পদ গণনা হবে। রত্ন ভান্ডারের মেরামতি না হলে মন্দিরের সার্বিক স্থাপত্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা। এই সমীক্ষায় রত্নভান্ডারের দেওয়াল ও মেঝের স্থায়িত্ব এবং কোনও গুপ্ত কুঠুরি আছে কি না তা দেখতে থ্রিডি ম্যাপিং ও লেজার স্ক্যানিং করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা রক্ষায় পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি করে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ক্যাটালগ তৈরি করা হচ্ছে।
২০১৮ সালে মন্দিরের ‘ভিতর ভান্ডার’-এর চাবি হারিয়ে যাওয়ার খবর সামনে এলে রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সেই সময়ে বিচারপতি রঘুবীর দাস কমিশন গঠিত হলেও তার রিপোর্ট প্রকাশ পায়নি। ২০২৪ সালে ওড়িশা বিধানসভা নির্বাচনে এই বিষয়গুলিকে প্রচারের হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। রত্নভান্ডারের সমীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। এ বারই প্রথম রত্ন বিশেষজ্ঞ এবং মন্দিরের স্বর্ণকারদের সঙ্গে সমীক্ষক দলে রয়েছেন রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি। তৈরি করা হয়েছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়। কর্মকর্তারা প্রথাগত ওড়িয়া ধুতি ও গামছা পরে ভিতরে প্রবেশ করেছেন।
প্রসঙ্গত, হেরিটেজ করিডোর প্রকল্পের জিপিআর সমীক্ষায় মন্দির সংলগ্ন এলাকায় ৪৩টি সম্ভাব্য প্রাচীন কাঠামোর হদিস মিলেছিল। সম্প্রতি জনসমক্ষে আসা সেই খসড়া রিপোর্টে বর্ণিত ভূগর্ভস্থ ধ্বংসাবশেষ ও সুড়ঙ্গ-সদৃশ চিহ্নের কথা রত্নভান্ডার সংক্রান্ত খবরের আবহে নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)