বিধানসভা ভোট ঘোষণা হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’র প্রশ্ন উঠে এল সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। অন্য রাজ্যে বিজেপিকে রোখার স্বার্থে এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের মোকাবিলায় কংগ্রেসের হাত ধরার দরজা বন্ধ করছে না সিপিএম। তবে দলের শীর্ষ কমিটিতে দাবি উঠেছে, অবস্থান স্পষ্ট করে কংগ্রেস কোনও বার্তা দিলে তবেই এই বিষয়ে পদক্ষেপ হোক।
কেরলের রাজধানী শহর তিরুঅনন্তপুরমে শুক্রবার থেকে চলছে সিপিএমের তিন দিনের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক। কেরল, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও পুদুচেরির আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কৌশল এবং প্রস্তুতি এ বারে বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য। সূত্রের খবর, পাঁচ রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বই তাঁদের নিজেদের রাজ্যে দলের প্রস্তুতি সংক্রান্ত রিপোর্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে পেশ করেছেন। কেরলে এমনিতেই শাসক সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এলডিএফের সঙ্গে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফের মুখোমুখি লড়াই। তার উপরে কংগ্রেসের উপদেষ্টা সুনীল কানুগোলুর ‘পরামর্শে’ কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন-সহ সিপিমের শীর্ষ নেতৃত্বকে জড়িয়ে এমন ধরনের প্রচার হচ্ছে, যা এই দুই দল আগে পরস্পরের বিরুদ্ধে করেনি বলে কেরল সিপিএমের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তামিলনাড়ুতে শাসক ডিএমকে-র সঙ্গী কংগ্রেস, সিপিএম ও সিপিআই। তাঁরা এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গেই চলার পক্ষপাতী কিন্তু ওই রাজ্যের কংগ্রেসের একাংশ দক্ষিণী তারকা বিজয়ের দল টিভিকে-র সঙ্গে যেতে চাইছে, এই প্রসঙ্গ তুলেছেন তামিলনাড়ুর সিপিএম নেতৃত্ব। অসমে গৌরব গগৈদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ‘বিদ্বেষমূলক’ রাজনীতির বিরোধিতায় কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের অবস্থানের ফারাক নেই, দলীয় নেতৃত্ব ফের তা বুঝিয়ে দিয়েছেন বৈঠকে।
বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতির সূত্রেই পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ঐক্যের কথা এসেছে। সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও অন্তত পাঁচটি রাজ্যের নেতারা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং রাজ্যে এআইসিসি-র পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীরের মন্তব্যের কথা এ বারের বৈঠকে তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্ব লাগাতার বলে চলেছেন, তাঁরা রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই লড়তে চান। দলের শক্তিবৃদ্ধি করতে চান। তাঁরা যদি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পক্ষেও থাকেন, কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রকাশ্য অবস্থানে অন্তত তার কোনও ইঙ্গিত নেই। মনে হচ্ছে, কংগ্রেসের কাউকে প্রয়োজন নেই! তা হলে সিপিএম-ই বা এক তরফা সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এগোবে কেন? রাজ্যের সিপিএম নেতারাও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন, বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ লড়াইয়ে কারা থাকবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। সেই কারণেই বামফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে আসন-রফাও চূড়ান্ত হচ্ছে না। তবে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বিবেচনায় রেখে কংগ্রেসের জন্য দরজা বন্ধ হচ্ছে না, আবার কংগ্রেস কোনও ভাবে ‘হাত’ না-বাড়ালে সিপিএম তাদের দিকে এগিয়ে যাবে না— এই অবস্থানও পরিষ্কার করে দিয়েছেনএ রাজ্যের নেতৃত্ব।
সিপিএমের পলিটব্যুরোর এক সদস্যের কথায়, ‘‘সংগঠনককে শক্তিশালী করতে সব দলই চায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমরা কি বলছি যে, বামফ্রন্টই ২৯৪টি আসনে লড়বে? বিজেপি ও তৃণমূলকে যাঁরা হারাতে চান, সেই সব গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি ও ব্যক্তিকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। বাকিটা কংগ্রেসকে ভাবতে হবে। যেমন কেরলে কংগ্রেসকে ভাবতে হবে, তাদের আচরণ আখেরে বিজেপির রাস্তা প্রশস্ত করছে কি না!’’
এমতাবস্থায় কলকাতায় এসে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে ভোট-প্রস্তুতির আলোচনায় বসতে চলেছেন বি কে হরিপ্রসাদের নেতৃত্বে এআইসিসি-র স্ক্রিনিং কমিটি এবং সুদীপ রায় বর্মণ-সহ নির্বাচনী পর্যবেক্ষকেরা। তার আগে মীরের উপস্থিতিতে প্রদেশ নির্বাচন কমিটির বৈঠকও হওয়ার কথা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)