Advertisement
E-Paper

জোড়-বিজোড়ে ভাল সাড়া, তবে বিতর্ক রইল ফল ঘিরে

সকাল ঠিক ৮টা ৩৩। দিল্লিতে যানজটের জন্য কুখ্যাত আইটিও-র মোড়ে দেখা মিলল প্রথম জোড় সংখ্যার গাড়ির। জোড়-বিজোড় নম্বর-প্লেটের বিধিনিষেধ চালু হওয়ার মাত্র ৩৩ মিনিটের মধ্যে।

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:২৯
একই গাড়িতে। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল, পরিবহণমন্ত্রী গোপাল রাই (সামনের আসনে) ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন। ছবি: পিটিআই।

একই গাড়িতে। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল, পরিবহণমন্ত্রী গোপাল রাই (সামনের আসনে) ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন। ছবি: পিটিআই।

সকাল ঠিক ৮টা ৩৩। দিল্লিতে যানজটের জন্য কুখ্যাত আইটিও-র মোড়ে দেখা মিলল প্রথম জোড় সংখ্যার গাড়ির। জোড়-বিজোড় নম্বর-প্লেটের বিধিনিষেধ চালু হওয়ার মাত্র ৩৩ মিনিটের মধ্যে। গাড়ি আটকাতেই লম্বা চুল-দাড়ির সুদর্শন যুবক চারটে পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দিলেন ট্রাফিক পুলিশের দিকে। বিজোড় তারিখে জোড় নম্বর-প্লেটের গাড়ি বার করার জরিমানা।

দু’হাজার টাকা জরিমানা জানা সত্ত্বেও গাড়ি নিয়ে বেরোলেন কেন? যুবকের জবাব, ‘‘কী-ই বা করি? বাড়ি নয়ডা ও গ্রেটার নয়ডার মাঝখানে পারি চকে। সেখান থেকে অফিসে আসার আর কোনও ব্যবস্থা নেই। অফিসের কাজেও চার-পাঁচ জায়গায় যেতে হয়। বাস-মেট্রোর চক্করে পড়লে তো সারা দিন কেটে যাবে!’’

তবে এ দিনই সদর্পে আইন ভেঙেছেন আইনপ্রণেতাদেরই এক জন। তিনি বিজেপি সাংসদ সত্যপাল সিংহ। সাংসদ হওয়ার আগে যিনি মুম্বইয়ের পুলিশ কমিশনার ছিলেন! ইন্ডিয়া গেটে তাঁর গাড়ি আটকায় পুলিশ। সত্যপালের অবশ্য দাবি, পুলিশ তাঁর গাড়ি আটকায়নি। তিনি নিজেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে রাস্তা জানতে গাড়ি থামিয়েছিলেন। এবং তিনি আইনও ভাঙেননি। কারণ, সাংসদ হিসেবে তাঁর গাড়ি ছাড়ের তালিকায় পড়ে। কিন্তু ঘটনা হল, লোকসভা-রাজ্যসভার সাংসদদের জন্য এই নিয়মে ছাড় নেই। ছাড় নেই কেজরীবালেরও। তিনি পরিবহণমন্ত্রী গোপাল রাই এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈনের সঙ্গে একই গাড়িতে দফতরে গিয়েছেন। তাঁর মন্ত্রীরা, যাঁদের গাড়ি জোড় সংখ্যার, কেউ এসেছেন বাসে, কেউ ই-রিকশায়। সত্যপালের গাড়িকে অবশ্য জরিমানা করেনি পুলিশ। নিয়মকানুন লেখা লিফলেট ধরিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। পুলিশ সূত্রের খবর, আজ শ’দেড়েক গাড়ির জরিমানা হয়েছে। দিল্লির গাড়ির সংখ্যার নিরিখে যা নেহাৎই সামান্য। বুঝিয়েসুজিয়ে ছেড়ে দেওয়া গাড়িও তেমন বেশি নয়।

সকালই সাধারণত বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। আজ দিল্লির ক্ষেত্রে অবশ্য সেই আপ্তবাক্য খাটেনি। এ দিন রাজধানীর রাস্তায় জোড় সংখ্যার গাড়ি দেখা গিয়েছে বইকি। দু’-চার জনকে জরিমানা করে বাড়িও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে সবই ব্যতিক্রম। দূষণ কমাতে দু’সপ্তাহের জন্য যে লড়াই আজ শুরু হল, তাতে সাড়া দিল দিল্লি। যা দেখে অভিভূত মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল। তাঁর স্বগতোক্তি, ‘‘ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। জানি না অন্য মন্ত্রীরা কাল রাতে কে ভাল করে ঘুমিয়েছেন।’’ তবে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, আজ মোটের উপরে ছুটির আবহাওয়াই ছিল। ছুটি আগামিকাল, পরশুও। জোড়-বিজো়ড়ের আসল পরীক্ষা হবে সোমবার।

তবে এই প্রক্রিয়ায় দূষণ কমবে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল আগেই। আজ তা আরও জোরদার হয়েছে। দিনের শেষে আপ সরকারের দাবি, গত বছরের প্রথম দিনের থেকে আজ দূষণ কম ছিল অনেকটাই। যদিও কেন্দ্রের এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড ওয়েদার ফোরকাস্টিং অ্যান্ড রিসার্চ (সফর)-এর মতে দূষণ মোটেই কমেনি। উল্টে গত ক’দিন ধরে দিল্লির সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ও হাওয়ার বেগ কম থাকায় দূষণ বেড়েছে। আগামী তিন দিনে যা আরও বাড়বে। আপ শিবিরের পাল্টা দাবি, আজ সকালে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে দূষণের মাত্রা যা ছিল, সন্ধেয় তার থেকে অনেকটাই কমেছে। এবং দু’সপ্তাহ পরে এর আসল ইতিবাচক প্রভাব বোঝা যাবে।


সবিস্তারে পড়তে ক্লিক করুন...

দিল্লির আগে বেজিং, এথেন্স, সান্তিয়াগো, ম্যানিলা বা সাও পাওলোর মতো শহরে যেখানে এই নিয়ম চালু হয়েছে, সেখানেই দূষণ কমা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। দিল্লির ক্ষেত্রেও সেই বিতর্ক প্রত্যাশিত। এবং দূষণে লাগাম টানার ক্ষেত্রে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ যে সবচেয়ে ভাল পথ নয়, সে কথা বলছেন অনেক বিশেষজ্ঞই। কেজরীবালও আজ বলেছেন, ‘‘জোড়-বিজোড়ের এই বিধিনিষেধ পাকাপাকি চালু করা অসম্ভব।’’ তা হলে দু’সপ্তাহের জোড়-বিজোড়ের বিধি চালু করা হল কেন? দিল্লি সরকারের দাবি, দু’সপ্তাহ এই বিধিনিষেধ আরোপ করে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমিয়ে নেওয়া হবে। তার পর জোর দেওয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায়। সেখানে গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেজরী। আপ নেতৃত্বের বক্তব্য, জোড়-বিজোড়ের নিয়ম লম্বা সময় ধরে চালানো সম্ভব নয়। গোড়ায় যতই

উৎসাহ থাক, যত সময় যাবে ততই নিয়ম ভাঙা শুরু হবে। কেউ ভুয়ো নম্বরপ্লেট লাগাবেন, কেউ পেট্রোল গাড়িতেই ‘সিএনজি’-র জাল স্টিকার লাগাবেন। ফলে কোনও লাভ হবে না।

পর্যাপ্ত বাস-অটো-মেট্রো না-থাকায় বহু মানুষই যে গাড়ি ছাড়া কার্যত অসহায়, সে কথাও মানছেন দিল্লির কর্তারা। অসুবিধা তাঁদেরই বেশি যাঁরা গাজিয়াবাদ, নয়ডা, গুড়গাঁওয়ের মতো রাজধানী সংলগ্ন শহরগুলিতে থাকেন। তাই গণপরিবহণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দূষণের অন্যান্য উৎসের উপরে নিয়ন্ত্রণ জারি করা জরুরি বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। তবে একান্ত প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে ফের কিছু দিন গাড়ির উপরে নিয়ন্ত্রণ চালু করা যেতেই পারে, জানাচ্ছেন তাঁরা।

বিতর্ক যা-ই থাক, এ দিন যানজট যে এক ধাক্কায় অনেকটাই কমেছে, তা অবশ্য মানছেন সকলেই। শহরের ব্যস্ততম পয়েন্ট যেমন করোলবাগ, আইটিও, লক্ষ্মীনগর, কনট প্লেস কিংবা রাজপথ এ দিন দৃশ্যতই ছিল অনেক ফাঁকা। ইন্ডিয়া গেটের সামনে কনস্টেবল রবীন্দ্র কুমার বললেন, ‘‘গাড়িও কম। যানজটও কম।’’ কথা বলতে বলতেই জোড় সংখ্যার গাড়ি ধরতে দৌড়ে গেলেন বীরেন্দ্র। ফিরে এলেন নিরাশ মুখে। বললেন, ‘‘সিএনজি গাড়ি। দিল্লিতে যে এত সিএনজি গাড়ি চলে, বোঝা যেত না।’’ (সিএনজি এবং মহিলা-চালিত গাড়ির জন্য ছাড় রয়েছে নতুন নিয়মে।)

দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বসসী বলেন, ‘‘প্রথম দিন আমরা জরিমানার বদলে চালকদের বোঝানোর উপরেই বেশি জোর দিয়েছি।’’ যাঁরা আইন ভেঙেছেন, তাঁদের জরিমানা দেওয়ার থেকেও বেশি অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে হলুদ উর্দিধারী স্বেচ্ছাসেবকদের ‘গাঁধীগিরি’-তে। বিধিনিষেধের পরোয়া না-করার ‘অপরাধ’-এ তাঁরা গোলাপ ফুল উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। দিল্লির সব স্কুলেই শীতকালীন ছুটি থাকায় অনেক ছাত্রছাত্রীও রাস্তায় নেমেছিল। আইন ভাঙতে দেখলেই পড়ুয়ারা গাড়ির চালকের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে এগিয়ে গিয়েছে। তাতে লেখা— ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না!’ অনেকেই ‘সরি’ বলেছেন। আশ্বাস দিয়েছেন, আর হবে না। কেউ লজ্জায় গাড়ির কাচটুকুও নামাননি।

সবিস্তার পড়তে ক্লিক করুন...

কী ভাবে এল এই সাফল্য? বিভিন্ন মহলের বিশ্লেষণে যে বিষয়গুলি উঠে আসছে, তার প্রথমটিই হল সচেতনতা। বায়ুদূষণ সম্পর্কে লাগাতার প্রচারে জনতাকে সচেতন করা গিয়েছে। স্কুলে লাগাতার প্রচার হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীরা সজাগ হয়েছে, তাদের মতামত প্রভাব ফেলেছে পরিবারে। দ্বিতীয় কারণ, জরিমানা। দু’হাজার টাকা গচ্চা দিতে চাননি অনেকে। তার উপরে এক বার ধরা পড়ার দু’ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি না-ঢুকলে দ্বিতীয় বার জরিমানা করা হবে। সেই আশঙ্কাও ফল দিয়েছে। তৃতীয় কারণ, এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা। আম দিল্লিবাসীর অধিকাংশের মতে, দু’সপ্তাহের তো ব্যাপার। দেখাই যাক না নিয়ম মেনে।

তবে এ নিয়ে কংগ্রেস, বিজেপির সঙ্গে একটা পরোক্ষ লড়াইয়ে জড়িয়ে গিয়েছিল আপ। বিরোধী দলগুলি গত কাল পর্যন্ত সংশয়ী ছিল নয়া ব্যবস্থা নিয়ে। কিন্তু আজ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে সুর পাল্টেছে তারা। বিজেপি মুখপাত্র সম্বিৎ পাত্র এ দিন বলেন, ‘‘আমরা প্রথম থেকেই এর পাশে আছি।’’ কংগ্রেসের আনন্দ শর্মা গত কাল বলেছিলেন, ‘‘এই পদক্ষেপ করার আগে পরিকাঠামো গড়ে তোলা উচিত ছিল।’’ আজ কংগ্রেসেরই পি চিদম্বরমের মুখে শোনা গেল, ‘‘আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে।’’

ফলে দূষণের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া শুধু নয়, বিরোধীদেরও চুপ করিয়ে দিতে আজ অন্তত সক্ষম হয়েছেন কেজরীবাল। তাঁর কথায়, ‘‘দিল্লির মানুষ কেন্দ্রকে দেখিয়ে দিয়েছে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy