তিন প্রজন্মের দায়িত্ব থেকে এ বার কি মুক্তি?
জালিয়ানওয়ালা বাগ থেকে ফোনে সুকুমার মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘আমরা তো অনেক দিন ধরেই বলছি, পুরাতত্ত্ব বিভাগ জালিয়ানওয়ালা বাগ দেখভালের দায়িত্ব নিক। কিন্তু পুরাতত্ত্ব বিভাগের যুক্তি ছিল, ১০০ বছরের পুরনো না হলে ওঁরা কোনও সৌধের দায়িত্ব নেয় না। এ বার তো একশো বছর হয়ে গেল। আশা করি, এ বার পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্রুত জালিয়ানওয়ালা বাগ মেমোরিয়ালের দায়িত্ব নেবে।’’
জালিয়ানওয়ালা বাগে ভিআইপি বা আমজনতরা আনাগোনার অলক্ষ্যে গত ১০০ বছর ধরে এক বাঙালি পরিবার এই মেমোরিয়ালের দেখাশোনা করে চলেছে। তিন প্রজন্ম ধরে সুকুমার মুখোপাধ্যায়রা জালিয়ানওয়ালা বাগের দেখাশোনার দায়িত্বে। প্রথমে তাঁর ঠাকুর্দা ষষ্ঠীচরণ। পরে তাঁর ছেলে উপেন্দ্রনারায়ণ। এখন তাঁর ছেলে ৬৫ বছরের সুকুমার। বংশানুক্রমে তাঁরাই ট্রাস্টের সচিব।
ইতিহাস বলছে, আদতে হুগলির বাসিন্দা ষষ্ঠীচরণ মুখোপাধ্যায় ইলাহাবাদে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। মদনমোহন মালব্য ১৯১০-এ কংগ্রেসের অধিবেশনের কাজের জন্য ষষ্ঠীচরণকে অমৃতসরে নিয়ে আসেন। আর ফেরা হয়নি। ষষ্ঠীচরণ স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। সেই সূত্রেই ১৯১৯-এর ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালা বাগের প্রতিবাদ সভায় হাজির হয়েছিলেন তিনি।
দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯
ঠিক একশো বছর আগে আজকের দিনটিতে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে ব্রিটিশ সেনা যখন গুলিবৃষ্টি শুরু করে, মঞ্চের নীচে আশ্রয় নিয়েছিলেন ষষ্ঠীচরণ। প্রাণে বেঁচে যান। তার পর কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনিই প্রস্তাব আনেন, জালিয়ানওয়ালা বাগের স্মৃতি ধরে রাখতে ওই এলাকা অধিগ্রহণ করা হোক। কারণ ব্রিটিশরা দগদগে ইতিহাস মুছে ফেলতে সেখানে জামাকাপড়ের বাজার বসাতে চাইছে। মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী জালিয়ানওয়ালা বাগ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট তৈরির জন্য দেশ জুড়ে চাঁদা সংগ্রহের ডাক দেন। ট্রাস্ট তৈরির পর মালব্য হন তার সভাপতি। আর ষষ্ঠীচরণ সচিব। স্বাধীনতার পরে সরকারি আইন করে ট্রাস্ট গঠন হয়। দেশের প্রধানমন্ত্রীই এই ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হন। মোদী জমানায় আইনে সংশোধন করে ট্রাস্ট থেকে কংগ্রেস সভাপতিকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। লোকসভায় বিল পাশ হলেও রাজ্যসভায় না-হওয়ায়, তা আটকে গিয়েছে। শতবর্ষের আগে অর্থাভাবে জালিয়ানওয়ালা বাগের করুণ অবস্থার অভিযোগও উঠেছে। টাকার অভাবে বন্ধ রয়েছে ‘লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড’ শো। অথচ আজও জালিয়ানওয়ালা বাগকে কেন্দ্র করে পঞ্জাবের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অমরেন্দ্র সিংহের সঙ্গে অকালি দলের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরসিমরত কউর বাদলের তরজা চলেছে।
সুকুমারবাবু বলেন, ‘‘এই মেমোরিয়ালের দেখভাল দরকার। না হলে নতুন প্রজন্ম তো ভুলতেই বসেছে, আমরা কী ভাবে স্বাধীনতা পেলাম। দেশের জন্য কত মানুষ এখানে প্রাণ দিয়েছেন। এখানেও ঠিক রাজঘাটের মতোই শান্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। অনেকে এখানে পিকনিক স্পটের মতো বেড়াতে আসেন। ইতিহাসটুকু পড়েও দেখেন না।’’
এই দায়িত্ব পালনের জন্যই তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ সুকুমার ১৯৮৮ সালে বাবার মৃত্যুর পরে ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে ট্রাস্টের সচিব হিসেবে যোগ দেন। রাজীব গাঁধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সচিব নিযুক্ত করেন। সুকুমারের দুই কন্যাই পেশাগত কারণে অমৃতসরের বাইরে থাকেন। তিন প্রজন্ম ধরে দায়িত্ব পালনের পরে সুকুমার এখন চান, এ বার ভাপ নিক পুরাতত্ত্ব বিভাগ ভার নিক। তারাই জালিয়ানওয়ালা বাগের ঠিক মতো দেখাশোনা করতে পারবে।