Advertisement
E-Paper

স্মৃতি-সুধায় কোথাও হাসি কোথাও অস্বস্তি

প্রতিবাদী ছাত্রকে শাস্তি দেওয়ার তাগাদা দিয়ে হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আড়াই মাসে পাঁচটি চিঠি লেখেন তিনি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অনাহারে মৃত্যুর বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে তিনি বলেন, কেউ ‘ভারতমাতার অপমান’ করলে সহ্য করবেন না! বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ২০৭ ফুট উঁচু দণ্ডে জাতীয় পতাকা তোলার নিদান তিনিই দেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:১৪
সংসদ থেকে বেরোচ্ছেন স্মৃতি ইরানি। বুধবার। ছবি: প্রেম সিংহ

সংসদ থেকে বেরোচ্ছেন স্মৃতি ইরানি। বুধবার। ছবি: প্রেম সিংহ

প্রতিবাদী ছাত্রকে শাস্তি দেওয়ার তাগাদা দিয়ে হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আড়াই মাসে পাঁচটি চিঠি লেখেন তিনি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অনাহারে মৃত্যুর বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে তিনি বলেন, কেউ ‘ভারতমাতার অপমান’ করলে সহ্য করবেন না! বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ২০৭ ফুট উঁচু দণ্ডে জাতীয় পতাকা তোলার নিদান তিনিই দেন।

সেই স্মৃতি ইরানি আজ সংসদের দুই কক্ষে নাটকীয় ভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠলেন ঠিকই। কিন্তু উল্টে তাঁর ‘সংলাপ’ শুনে হাসির রোল উঠল রাজ্যসভায়! লোকসভায় কখনও রাগে ফেটে পড়ে, কখনও আবেগরুদ্ধ গলায় ৫০ মিনিট বক্তৃতা দিলেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী। কিন্তু সেই বক্তৃতায় নতুন বিতর্কও তৈরি করে দিলেন। স্মৃতি বলে বসলেন, ‘‘রোহিত ভেমুলা লিখে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’’ এমনকী জেএনইউয়ের ছাত্র উমর খালিদকেও কাঠগড়ায় তুলে স্মৃতি বললেন, ‘‘উনি কর্তৃপক্ষকে ভুল পথে চালিত করেছিলেন। বলেছিলেন, ওঁরা কবিতা পাঠের সভার আয়োজন করছিলেন!’’

এক দিকে ছাত্রদের সমালোচনা। অন্য দিকে, বিরোধীদের সামনেও ঠান্ডা মাথায় নিজের যুক্তি পেশ করার রাস্তায় গেলেন না স্মৃতি। উল্টে জারি রাখলেন নির্বিচার গোলাবর্ষণ। যা দেখে তাঁর সতীর্থদের কেউ কেউ একান্তে বলেছেন, এই প্রত্যেকটি ‘মণিমুক্তোই’ স্মৃতি ইরানির ঔদ্ধত্য ও অনভিজ্ঞতার নিদর্শন। যা প্রশ্ন তুলে দেয় মন্ত্রী পদে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে। যার ফল বারবার ভুগতে হয় তাঁর বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারকে।

হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউ-এর ঘটনা নিয়ে আজ বিতর্ক হওয়ার কথা ছিল সংসদে। রাজ্যসভায় প্রবল হট্টগোলে সেই বিতর্ক অবশ্য ভেস্তে যায়। কিন্তু তার মধ্যেও মুখরোচক চর্চার রসদ জোগান দিয়ে আসেন স্মৃতি। বসপা নেত্রী মায়াবতী দাবি তুলেছিলেন, রোহিতের আত্মহত্যার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিতে এক জন দলিতকে রাখতে হবে। বসপা সাংসদেরা স্মৃতির ইস্তফার স্লোগান তোলেন। তখনই আচমকা মায়াবতীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে স্মৃতি বলেন, ‘‘অগর মেরে উত্তরসে আপ সন্তুষ্ট না হো, তো ম্যায় আপনা সর কলম করকে আপকে চরণো মে ছোড় দুঙ্গি!’’ অর্থাৎ ‘‘যদি আমার জবাবে আপনারা সন্তুষ্ট না হন, তা হলে আমি আমার মাথা কেটে আপনাদের পায়ে রেখে দেব।’’

স্মৃতি যখন এই কথা বলছেন, তখন রাজ্যসভায় অনেকেই হাসছেন! বিজেপির দু’এক জনকেও দেখা গেল, প্রাণপণে হাসি চাপছেন। যাঁদের এক জন পরে বললেন, ‘‘এ তো সিরিয়াল! মন্ত্রীকে নিজের ওজনটা মাথায় রাখতে হবে!’’ মায়াবতী সংসদেই বলেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর চেলাচামুণ্ডাদের মানসিকতা ঠিক নয়।’’

এর পর সন্ধে নাগাদ স্মৃতি যখন লোকসভায় জবাবি বক্তৃতা দিতে ওঠেন, তখনও দেখা যায়, রাজ্যসভার ফর্মেই রয়েছেন। এ বার তিনি বলেন, ‘‘আমাকে শূলে চড়ানো হচ্ছে, কারণ (হায়দরাবাদে) চিঠিটা আমার দফতরই পাঠিয়েছিল।’’ বক্তৃতা যত এগোয়, স্মৃতির শরীরী ভাষাও ততই আগ্রাসী হয়ে ওঠে। হাত-পা নেড়ে মন্ত্রী বলতে থাকেন, ‘‘আমি স্মৃতি ইরানি। চ্যালেঞ্জ করছি, আমার জাত জিজ্ঞাসা করুন!’’

সেই সঙ্গে চলতে থাকে ব্যক্তিগত স্তরে নেমে আসা। বক্তৃতার মাঝপথে বাধা পেয়ে স্মৃতি বলেন, ‘‘সঙ্ঘ পরিবার নাকি সংখ্যালঘু-বিরোধী। আমার অতীব সংখ্যালঘু পরিবারে (পার্সি) বিয়ে হয়েছে। আমাকে কেন নিজের কথা বলতে বাধা দেওয়া হবে!’’ কংগ্রেসের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া প্রশ্ন তুলেছিলেন, স্মৃতি কেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয়র চিঠি পেয়ে রোহিতের শাস্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এত বার চাপ দিয়েছিলেন? তার জবাবে ব্যক্তিগত আক্রমণে গিয়ে কংগ্রেসের রঞ্জনা যাদবকে স্মৃতি বলেছেন, ‘‘আপনার সুপারিশ করা চিঠি পেয়ে ছেলেমেয়েদের কোটার বাইরে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছি!’’ এই মন্তব্য ‘অযাচিত’ মনে হয়েছে অনেকেরই। শেষ পর্যন্ত স্পিকার সুমিত্রা মহাজনকে বলতে হয়, স্মৃতি যেন এ সব বিষয়ে না ঢোকেন।

হায়দরাবাদ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কংগ্রেস সহ-সভাপতিকেও ছাড়েননি স্মৃতি। বলেছেন, ‘‘কখনও দেখেছেন রাহুল গাঁধী এক জায়গায় দু’বার যাচ্ছেন? না। উনি এখানে (হায়দরাবাদে) রাজনৈতিক ফায়দা দেখেছেন।’’ স্মৃতি ফের চ্যালেঞ্জ ছোড়েন, ‘‘এখনকার বহু উপাচার্যেরই নিয়োগ হয়েছিল কংগ্রেস আমলে। তাঁদের এক জনও যদি বলতে পারেন আমি (শিক্ষার) গৈরিকীকরণ করছি, আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব!’’ কংগ্রেস অবশ্য আগেই ওয়াকআউট করেছিল।

দিনের শেষে বিজেপি নেতাদের অনেকে বলছিলেন, আগ্রাসনেরও রকমফের হয়। চিৎকার-চেঁচামেচি না করেও কৌশলে আক্রমণের তিরটা বিরোধীদের দিকে কী ভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, খোদ নরেন্দ্র মোদীই তা বারবার দেখিয়েছেন। এক জন মন্ত্রীর বক্তৃতা কখনও বিরোধী সাংসদের মতো হওয়া উচিত নয়। কিন্তু স্মৃতি সেই ভুলটাই করলেন। ফলে কেন্দ্রের অস্বস্তি তো কাটলই না। উল্টে বিরোধীদের চটিয়ে দিলেন স্মৃতি। এবং তাঁর কথা শুনেই বোঝা গেল, কতটা চাপে রয়েছেন তিনি। এক দিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। অন্য দিকে তাঁকে মন্ত্রিপদ থেকে সরানোর গুঞ্জন। নেতারা বলছিলেন, আসলে নিজের গদি বাঁচানোর প্রচ্ছন্ন চেষ্টাটাই আজ হয়তো চালিয়ে গেলেন স্মৃতি ইরানি!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy